
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার পাশে একটি মেয়ে শুয়ে আছে! মেয়েটির মুখে এক আকাশ মায়া। মেয়েটিকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে- খুব আরাম করে সে ঘুমাচ্ছে। মাথা ভর্তি চুল। ফ্যানের বাতাসে কিছু চুল উড়ছে। কে এই মেয়ে? কোথা থেকে এলো? আবার আমার খাটে দিব্যি শুয়ে আছে! কিন্তু কেন জানি মেয়েটিকে দেখে খুব মায়া লাগছে। মনে হচ্ছে- এত আরাম করে সে অনেক দিন ঘুমায়নি। আমার অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছে- তাই আমি মেয়েটির ঘুম না ভাঙ্গিয়ে- আস্তে ধীরে দাঁত ব্রাশ করলাম- গোছল করলাম, আয়রন করে শার্ট প্যান্ট পড়লাম, জুতো পড়লাম, জুতায় ব্রাশ ঘষলাম। ক্যামেরার ব্যাগটি কাধে নিতেই- মেয়েটি পেছন থেকে বলল- টেবিলে নাস্তা দিয়েছি- নাস্তা খেয়ে যাও। আমি লক্ষ্মী ছেলের মতন- অনেকদিন পর বাসায় আরাম করে নাস্তা খেলাম। মেয়েটি আমাকে সুন্দর এক কাপ চা বানিয়ে দিল। চা মুখে দিয়েই মনটা অজানা খুশিতে ভরে গেল। আমি বের হওয়ার সময় মেয়েটি বলল- বিকেলে বাসায় ফেরার পথে বেলী ফুলের মালা নিয়ে এসো তো!
আমি অফিসে এসে- মেয়েটির কথা ভাবছি। খুব ভাবছি। কে এই মেয়ে? আমার কি হয়? আমার কাছে কি চায়? আমার সাথে তো কোনো মেয়ের প্রেম ভালোবাসা সম্পর্ক নেই। আমি ভয়াবহ আজব বনে গেলাম। আমার মাথা ব্যাথা করতে শুরু হয়েছে। আমি বেল টিপে পিয়নকে বললাম কড়া করে একটা চা দিতে। আচ্ছা, আমার কি হেলুসিয়েশন হচ্ছে? আমি মদ্যপান করি না- সহজ সরল জীবন যাপন করি। রাত এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। অবসর সময়ে প্রিয় বই গুলো পড়ি, প্রিয় মুভি গুলো দেখি। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। ঠিক মধ্যদুপুরে মোবাইলে একটা ম্যাসেজ এলো- "এখন লাঞ্চ টাইম- দয়া করে খেয়ে নাও।" আমি বিড় বিড় করে বললাম- ‘মানুষ অলৌকিক কিছু খোঁজে, খোঁজে বিস্ময়, চমকের আশায় থাকে। যদিও সবচেয়ে বড় বিস্ময়, সবচেয়ে বড় অলৌকিকতা, সবচেয়ে বড় চমক আসলে খুঁজে পাওয়া যায় মানুষের হৃদয়ে'ই'। মেয়েটির কথা মাথা থেকে পুরোপুরি ফেলে দিলাম। এটা আসলে আমার মনের ভুল।
আমি বিকেলে অফিস থেকে বের হয়ে ঠিক করলাম- আজ পুরান ঢাকা যাবে আড্ডা দিতে। অনেক দিন আড্ডা দেওয়া হয় না। পুরান ঢাকা যাওয়ার পথে শাহবাগ থেকে কি মনে করে অনেক গুলো বেলী ফুলের মালা কিনলাম। অনেকদিন পর অনেকক্ষন আড্ডা দিলাম পুরোনো বন্ধুদের সাথে। ফিরে আসার সময় বন্ধুরা বলল- আর একটু থাক, বাসায় তো তোর বউ নেই, সমস্যা কি? তখন হঠাৎ আমার সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ল। বাসায় ফিরেই দেখি মেয়েটি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি ওয়াশরুম থেকে ফ্রেস হয়ে বের হলাম। বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরাতেই মেয়েটি বলল- এখন সিগারেট খাবে না। আজ আমি তোমার প্রিয় খাবার রান্না করেছি। খেতে আসো। আমি বললাম কি রান্না করেছো? মেয়েটি বলল- বাধা কপি দিয়ে গরুর মাংস, ইলিশ মাছের ডিম দিয়ে করলা ভাজি আর ডাল, ডালে টোমেটো দিয়েছি। আমি অনেকদিন পর খুব আরাম করে খেলাম। বারান্দায় গিয়ে বসে খুব আরাম করে সিগারেট খাচ্ছি। তখন মেয়েটি আবার আমার কাছে আসলো। খুব আদরে গলায় বলল- আমার বেলী গুল কই? তখন আমি পকেট থেকে বেলী ফুল বের করে মেয়েটির হাতে দেই এবং দেখলাম- মেয়েটির চোখের কোনায় এক ফোটা পানি! তখন মেয়েটি বলল- আমাকে একটা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও না প্লীজ। আমি কবিতা আবৃত্তি করলাম- "
মাছরাঙা চ'লে গেছে -- আজ নয় কবেকার কথা;
তারপর বারবার ফিরে এসে ডানাপালকের উজ্জলতা
ক্ষয় ক'রে তারপর হয়ে গেছে ক্ষয়।
মাছরাঙা মানুষের মতো সূর্য নয়?
কাজ করে কথা ব'লে চিন্তা করে চলেছে মানব;
যদিও সে শ্রেষ্ঠ চিন্তা সারাদিন চিন্তানাশা সাগরের জলে
ডুবে গিয়ে নিঃশব্দতা ছাড়া আর অন্য কিছু বলে?
গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। মেয়েটি তার একটি হাত আমার বুকের উপর রেখেছে। আমি এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে মেয়েটির মুখে তাকালাম। কি সুন্দর মায়াময় একটি মুখ। শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে! হঠাৎ করে খুব ইচ্ছা করলো- মেয়েটিকে অনেক গুলো চুমু দেই। গভীর ভালোবাসা নিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি। মেয়েটির কপালে একটা ছোট্র চুমু দিয়ে আমি বেলকনিতে এসে দাড়াই।
এলোমেলো অনেক কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ করে আব্রাহাম লিংকনের একটা কথা মনে পড়ল-“মানুষ যতটা সুখী হতে চায়, সে ততটাই হতে পারে। সুখের কোনো পরিসীমা নেই। ইচ্ছে করলেই সুখকে আমরা আকাশ অভিসারী করে তুলতে পারি”। হঠাৎ দেখি মেয়েটি আমার কাঁধে হাত রেখে বলল- কখন তোমার ঘুম ভাঙ্গল? আমাকে ডাকনি কেন?
ঘরে এলাম আমরা। মেয়েটি বলল আমার কোলে মাথা রাখো- আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি। মেয়েটির কোলে মাথা রাখতেই গুন গুন করে গান গাইল- " তুমি মোর নয়নে তুমি মোর স্বপনে/ যে ছবি এঁকেছো সে তো শুধুই রবে গোপনে/ এ হৃদয় অহঙ্কারে দিলে ভরিয়ে।" গানটি শেষ করে বলল- আমি কখনও সমুদ্র আর পাহাড় দেখিনি, আমাকে সমুদ্র আর পাহাড় দেখাবে?
আজ শুত্রবার। আমার অফিস ছুটি। আজ সারাদিন শুধু মুভি দেখব। মেয়েটি বলল- ইংলীশ ছবি আমার ভালো লাগে না। আসো, সত্যজিতের "বাক্স বদলঃ মুভিটা দেখি। খুব মন দিয়ে বাক্স বদল মুভিটা দেখলাম। বাদাম খেলাম, চানাচূর খেলাম এবং দারুন এক মগ চা। রাতের খবার খেয়ে- একটি কোরিয়ান মুভি দেখলাম- "More than Blue" মুভিটি দেখে- মেয়েটি অনেকক্ষন কাঁদল। আমি মেয়েটির চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম- কাঁদে না কাঁদে না। তারপর একটি ইরানী মুভি " Children Of Heaven" দেখে মধ্যরাত্রে ঘুমাতে যাই।
মেয়েটির বুকে মাথা রাখতেই আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই। মনে হয় এই ররকম আনন্দময় ঘুম অনেকদিন ঘুমাইনি। তখন আসেপাশে কোথাও হয়তো গান বাজছিল- "And when the night is cloudy,/ there is still a light,/ that shines on me,/ shine until tomorrow, let it be./ I wake up to the sound of music, /mother Mary comes to me,/ speaking words of wisdom,/ let it be."
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০১৮ রাত ৯:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




