
কাঁচের মতো স্বচ্ছ রোদ উঠেছে! কড়া রোদ, কঠিন রোদ! চামড়া পুড়ে যায়, জ্বলে যায়। অথচ চলছে বর্ষাকাল। ক্ষনেক্ষনে বৃষ্টি হওয়ার কথা। আকাশে কালো মেঘ থাকার কথা অথচ আকাশ হয়ে আছে শরতের আকাশ। মানুষের অত্যাচারে প্রকৃতি নিষ্ঠুর হয়ে গেছে। আজ যদি দেশে প্রচুর গাছপালা থাকতো। তাহলে প্রকৃতি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারতো না। এজন্য আমরা মানুষরা'ই দায়ী। বড় ধরনের একটা ভূমিকম্প দিয়ে প্রকৃতি আমাদের উচিত শিক্ষা দিবে। আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, বাংলাদেশে যত ধরনের মেলা হয় তার মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মেলা হচ্ছে- 'বৃক্ষ মেলা'। আর সবচেয়ে ফালতু মেলা হচ্ছে বানিজ্য মেলা। আসলে প্রচন্ড গরমে মাথা আউলায়ে গেছে। তাই হয়তো আবোল তাবোল বকছি। যারা এসি রুমে বসে থাকে, তারা গরমের কষ্ট বুঝবে না। ঘরে বাইরে কোথাও শান্তি নাই। থাকি ছয় তালায়, রাত দু'টায় দেয়ালে হাত দিলে টের পাই দেয়াল গরম হয়ে আছে। কলের পানিও গরম।
শাহেদ কে দেখা যাচ্ছে, অফিসের জরুরী কাগজপত্র নিয়ে বনানী ১১ নম্বরের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার সারা শরীর ঘামে ভেজা। চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, তার গরমে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গত পরশু থেকে তার কোমরের ব্যাথাটা খুব বেড়েছে। মেরুদন্ডের হাড় বাঁকা হয়ে গেছে। এমন কড়া রোদ উঠেছে-আকাশের দিকেও তাকানো যায় না। শাহেদের গলা শুকিয়ে কাঠ। আশে পাশে কোনো দোকান দেখা যাচ্ছে। গরমে এমন অবস্থা হয়েছে, সে এখন এক বালতি পানি খেয়ে ফেলতে পারবে। প্রচন্ড রোদের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে আছে। আশে পাশে কোনো গাছ নেই যে সে ছায়ায় দাঁড়াবে। শাহেদের ইচ্ছা করছে নীলার কাছে চলে যেতে। নীলা তাঁকে দেখেই ঠান্ডা এক গ্লাস লেবুর সরবত বানিয়ে দিবে। পরম মমতায় শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে দিবে। এই পৃথিবীতে মা আর নীলা ছাড়া তার আর এমন কেউ নেই যে শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরবে।
এক রিকশাওয়ালা তিনজন যাত্রী নিয়ে অতি কষ্টে রিকশা টেনে নিয়ে যাছে। বুঝাই যাচ্ছে রিকশাওয়লার বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। রিকশাওয়ালার ছেঁড়া শার্ট ঘামে ভিজে একাকার। যাত্রী তিনজনেরও মনে হয় খুব কষ্ট হচ্ছে, তারা রিকশার হুড মেলতে পারছে না। ঠিক এমন সময় একটা মেয়ে ছাতা মেলে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল রিকশায় থাকা তিন যুবক কুৎসিত ভাবে চেয়ে থাকলো। একজন হয়তো কোনো বাজে মন্তব্য করলো মেয়েটিকে নিয়ে। তারা তিনজন হো হো করে হেসে উঠলো। অতি কুৎসিত হাসি। আজ শাহেদের গুলশান-বনানী এলাকায় যে কাজ আছে, সেগুলো শেষ করতে করতে বিকাল তিনটা পার হয়ে যাবে। সমস্যা হলো খুব ক্ষুধা পেয়েছে। আজ সকালে নাস্তাও খাওয়া হয়নি। শাহেদ ঠিক করলো আজ এখন স্টার কাবাবে যাবে। পেট ভরে খাবে। পকেটে পর্যাপ্ত টাকা আছে, কোনো চিন্তা নাই। রেস্টুরেন্টের সামনে এক ভিক্ষুক শাহেদকে বলল, ভিক্ষা দেন। শাহেদ বলল, ভিক্ষা দিতে পারব না। যদি খেতে চাও আমার সাথে খেতে পারো। ভিক্ষুক বলল, আমার খাবারের অভাব আছে নাকি? রেস্টুরেন্ট থেকেই আমাকে দুইবেলা নিয়মিত খাবার দেয়।
শাহেদ সুভাস্তু টাওয়ারের সাত তালা 'বি ক্রিয়েটিভ' অফিসের রিশিপশনে বসে আছে। এই অফিসে তার কোনো কাজ নেই। এসির ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগাতে এসেছে। রিসিপশনিস্ট মেয়েটি তার পরিচিত। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকলেও মেয়েটি কিছু বলে না, বিরক্তও হয় না। বরং একটু পরপর মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করে শাহেদ চা কফি কিছু খাবে? এসি রুমে বসে কফি খেতে বড় ভালো লাগে শাহেদের। ভাইরে চান্দিফাটা রোদ অথচ ভিতরের কি ঠান্ডা! মন জুড়িয়ে যায়। রিসিপশনিষ্ট মেয়েটির নাম ঝর্না। সে ঝর্নার মতোই সুন্দর। ঝর্নাকে শাহেদ'ই এই অফিসে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তারা এক'ই কলেজে লেখাপড়া করেছে। শাহেদ লক্ষ্য করে দেখেছে বড় বড় অফিস গুলোর রিসিপশনিষ্ট গুলো খুব সুন্দরী হয়। তাদের একটু পরপর ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে দেখা যায়। ঝর্নার হাসি খুব সুন্দর। সুন্দর হাসি দেখলে মন ভালো যায়। ঠিক করেছি ঝর্নার হাসি মোবাইলে ভিডিও করে নিবো। মন খারাপ হলে ঝর্নার হাসি দেখব।
দুপুর তিনটা শাহেদের মেজাজ প্রচন্ড খারাপ। কে যেন ফোন করেছিল, তারপরও থেকেই মেজাজ গরম হয়ে আছে। শাহেদ মেয়র সাঈদ খোকনের বাড়ির লেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে চাকরি ছেড়ে দিবে। মনে মনে বেশ কয়েকবার সে বলল, ''চাকরির মায়রে বাপ।'' হাতের কাগজ গুলো ছুড়ে ফেলল লেকের নোংরা পানিতে। সে এমনটা একটা চাকরি খুঁজে নিবে- সে চাকরিতে সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতে হবে না। এসি রুমে বসে থাকবে। সারাদিন নরম চেয়ারে বসে ফাইল দেখবে। রুমে অবশ্যই এসি থাকবে। সে সারাক্ষন ফুল স্প্রীডে এসি ছেড়ে রাখবে। তার ব্যাক্তিগত পিয়ন থাকবে। সে বেল টিপা মাত্র পিয়ন দৌড়ে এসে সামনে দাড়বে। শাহেদ তখন বলবে, পুরো ঘর তো খুব ঠান্ডা হয়ে আছে। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি। যাও কড়া করে এক মগ কফি বানিয়ে নিয়ে এসো। শাহেদ লাফ দিয়ে চলতি একটা বাসে উঠলো। তার ভাগ্য ভালো সে বসার জন্য সিট পেয়ে গেল। পিচ্চি কন্টাকটর হলুদ দাঁত বের করে বলল, মামা ভাড়া দেন। শাহেদ মনে মনে ভাবল এই কন্টাকটর কি সারাদিনে একবারও সিটে বসার সুযোগ পায়?
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০১৮ বিকাল ৫:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




