
ব্লগার চাঁদগাজী মাঝে মাঝে নিজের ছোটবেলার কথা লিখেন।
গ্রামের কথা লিখেন। তার আত্মীজীবনী মূলক ছোট পোষ্ট গুলোতে অনেক চরিত্র উঠে আসে। উঠে আসে তখনকার গ্রামীন জীবনযাপন। অভাব, দারিদ্রতা। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা। বিভিন্ন পোষ্টে শ্রদ্ধেয় চাঁদগাজীর বেশ কয়েকটা কিশোরী মেয়ের নামসহ আরো অনেকের নাম উঠে এসেছে। সে নাম গুলো আমার এখনও মনে আছে। যেমন আনু, মালতী, মাদরাসার দরিদ্র ছাত্র আবদুল করিম, হাসিনা চৌধুরী, শতাব্দী রায়, হাবাধন, লালু কাকা এবং তার স্ত্রী। তার আত্মজীবনী মূলক লেখাগুলো আমার ভীষন ভালো লাগে। আমি খুব আনন্দ নিয়ে পড়ি। পড়ে আনন্দিত হই, ব্যথিত হই। তার লেখা গুলো পড়ে আমি আমার ছেলেবেলার অনেক ভুলে যাওয়া ঘটনা মনে পড়ে যায়। আজ সেরকম একটা ঘটনা বলবো।
ছোটবেলায় আব্বার সাথে গ্রামে যেতাম।
আমাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ। বিক্রমপুর। শ্রী নগর থানা। এখন গ্রামে যেতে মাত্র দেড় ঘন্টা সময় লাগে। কিন্তু ছোটবেলা গ্রামে যেতে সময় লাগতো ৭/৮ ঘন্টা। কিভাবে যেতে হতো একটু বলি। আমার এখ্নও স্পষ্ট মনে আছে। প্রথমে বেবীটেক্সী বা রিকশা করে সদরঘাট যেতে হতো। তারপর সদরঘাট থেকে লঞ্চ অথবা ইঞ্জিনওয়ালা নৌকা করে পদ্মা নদী দিয়ে বিক্রমপুর। নদী পথ যেন শেষ আর হয় না। নৌকা চলছে তো চলছেই। লঞ্চ বা ইঞ্জিনওয়ালা নৌকা থেকে নেমে অনেকখানি প্যাক কাদা পাড়িয়ে পাড়ে আসতে হতো। খুব নরম মাটি ছিলো বলে হাটু পর্যন্ত পা ডেবে যেত। চাপকল থেকে পানি তুলে পা ধুতে হতো। হেঁটে হেঁটে আসতে হতো কামার গা বাজার পর্যন্ত। তারপর রিকশা। ইঞ্জিনওয়ালা নৌকায় আমার খুব কষ্ট হতো। ইঞ্জিনের ভটভট শব্দে মাথা ব্যথা করতো। নৌকা থেকে নেমে অনেকক্ষন কানে কিছু শুনতাম না। শুধু কানে বাজতো ভটভট।
গ্রামে আমাদের দু'টা বাড়ি ছিলো পাশাপাশি।
একটা পাকা দোতলা বাড়ি। জমিদার বাড়ি। আমার দাদার বাপ জমিদার ছিলেন। উনার নাম ছিলো মোহর খা। যাই হোক, এখন অবশ্য পাকা বাড়ি অনেকখানি ভেঙ্গে পড়েছে। আমাদের আরেকটা বাড়ি হলো কাঠের দোতলা বাড়ি। বিক্রমপুরে আগে সব বাড়িঘর গুলো কাঠের ছিলো। গ্রামে বেশ মজা হতো। আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশি খুব খাতির যত্ন করতো। আর কোথাও গেলে আব্বা ঢাকা থেকেই সব রকম খাবার কিনে নিতো আমাদের জন্য। এর মধ্যে আমার প্রিয় ছিলো আলুর চিপস আর ফানটা। তখন কোক ফানটা ইত্যাদি সব কাচের বোতলে বিক্রি হতো। আমি ঊঠানে হেঁটে হেঁটে ফানটা আর চিপস খেতাম। আশে পাশের সমস্ত পোলাপান আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতো। আমি খুব ভাব নিতাম। শহর থেকে এসেছি বলে। অবশ্য সব পোলাপান আমাকে সমীহ করতো শহরের ছেলে বলে। আমি দেখতে বেশ সুন্দর ছিলাম।
সুকন্যা নামে একটা মেয়ের সাথে আমার খুব ভাব হয়ে গেল।
মেয়েটা দেখতে বেশ। মাথা ভরতি চুল ছিলো। চোখ দু'টা ভীষন মায়া মায়া। আমি আর সুকন্যা মিলে সারাদিন খেলি। মেয়েটা লতাপাতা দিয়ে নানান রকম জিনিস রান্না করে আমাকে খাওয়ায়। তখন আমি থ্রি বা ফোরে পড়ি। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ি। আমার মনে আছে আমি গাছে উঠতে পারি না বলে সুকন্যা খুব অবাক হতো। সুকন্যা মুহুর্তের মধ্যে যে কোনো গাছে উঠে পড়তো। সুকন্যা এত সাহসী ছিলো যে গাছে উঠে নিচে পুকুরে লাফ দিতো। আমার এত সাহস নেই। আমি তো পুকুরে গোছলও করতে পারি না। পুকুরের মাটি থাকে নরম। নরম মাটিতে আমি দাড়াতেই পারি না। পা পিছলে পুকুরে ডুবে যাই। সুকন্যার বাবা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। উনার হাতে সব সময় একটা ছাতা দেখেছি। ছাতা ছাড়া উনি ঘর থেকে বের হতেন না।
একদিন সুকন্যা বলল, আমি নাকি প্রচন্ড ভীতু।
গাছে উঠতে পারি না। পুকুরে গোছল করতে পারি না। গরু হাত দিতে ধরতে সাহস পাই না। সুকন্যা আমাকে যতই ধমক দিক, ভীতু বলুক তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। কারন মেয়েটাকে আমার প্রচন্ড ভালো লাগে। মেয়েটা যতক্ষন আমার পাশে থাকে ততক্ষন দুনিয়াটা আমার থাকে। গ্রামের দিন গুলো সুকন্যার জন্য আনন্দময় হয়ে উঠতো। শহরে ফিরতে চাইতাম না। একদিন সুকন্যাকে সাহস করে বলেই ফেললাম, আমি তোমাকে বিয়ে করবো। সুকন্যা বলল, সত্যি? আমি বললাম, তিন সত্যি। সুকন্যা বলল, মনে থাকে যেন। সুকন্যাকে আমার বিয়ে করা হয়নি। সুকন্যা এখন তার স্বামীর সাথে আমেরিকার ফার্গো শহরে থাকে। গত ২৭ বছর সুকন্যার আছে আমার কোনো দেখা সাক্ষাত বা কোনো রকম যোগাযোগ নেই। তবে আমি জানি সে স্বামী সংসার নিয়ে ভালো আছে। তার দু'টা ছেলে। আমি প্রায়ই সুকন্যার কথা ভাবি। সুকন্যা কি আমার কথা ভাবে?
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০২০ রাত ৮:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




