
'চক্র' উপন্যাসটি লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন দূর্দান্ত লেখক। তার সব লেখাই আমার ভালো লাগে। এর আগে তার জনপ্রিয় উপন্যাস 'দূরবীন', 'মানবজমিন', এবং 'পার্থিব' পড়েছি। খুব ভালো লেগেছে। উপন্যাস পড়ে মন আনন্দে ভরে গেছে। আমার মনে হয় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন যাদুকর। তার লেখা পড়তে শুরু করলে, শুধু পড়তেই ইচ্ছা করে। এত এত মোটা মোটা বই অথচ পড়তে একটুও বিরক্ত লাগে না। তার বইয়ে অনেক গুলো চরিত্র থাকে। এবং প্রতিটা চরিত্রের একজনের সাথে আরেকজনের কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ থাকে। এই লেখকের জন্ম হয়েছিলো আমাদের ময়মনসিংহে। দেশ ভাগের সময় তারা কোলকাতায় চলে যায়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বর্তমানে আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
'চক্র' দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসটি ৫১৬ পৃষ্ঠা। খুব ছোট ছোট করে লিখা। ঢাকা থেকে এই বই বের হলে ১০০০ হাজার পৃষ্ঠার উপরে হতো। বাংলাদেশের প্রকাশকেরা বড় বড় ফন্ট ব্যবহার করে। কোলকাতার প্রকাশকেরা ছোট ছোট ফন্ট ব্যবহার করে। এত মোটা বই, ছোট ছোট ফন্টে লেখা কিন্তু আমার পড়তে একটুও বিরক্ত লাগে নি। বরং বারবার মনে হয়েছে আহারে বইটা কত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই বই আমি আগে আরো দুইবার পড়েছি। ইদানিং করোনার কারনে ঘরে বন্দি। হাতে অঢেল সময়। হাতের কাছে নতুন কোনো বই নেই। তাই আবার নতুন করে পড়া শুরু করেছি। মাত্র সাত দিনে বইটা শেষ করে ফেললাম। পড়া বই অথচ আবার নতুন করে পড়তে একটু বিরক্ত লাগে নি। আমি মনে করি ভালো বই বা ভালো মুভি সবার দুই তিনবার করে পড়া উচিত। কোলকাতার সুনীল, সমরেশ এবং শীর্ষেন্দু এই তিনজন খুব শক্তিশালী লেখক। এদের মতোন লেখক আমাদের দেশে কেউ নেই।
'চক্র' উপন্যানের কাহিনি বলি।
আসলে এই উপন্যাসের কাহিনি বলে বুঝা্নো যাবে না। অনেক গুলো চরিত্র। তাদের সবার সমস্যা আছে, দুঃখ কষ্ট আছে। আনন্দ আছে। পাওয়া না পাওয়া আছে। উপন্যাসের নায়ক অমল। সে খুব ভালো ছাত্র ছিলো। পুরো গ্রামে তার মতো বিলিয়ান্ট ছাত্র আর একজনও নেই। সে জীবনে সাফল্য পেয়ে যায়। লন্ডন, আমেরিকা চলে যায়। অনেক বছর পর সে বুঝতে পারে সব পেয়েও যেন সে জীবনে কিছুই পায়নি। অমলের স্ত্রী মনা। দারুন সুন্দরী। তাদের এক ছেলে বুড্ডা ও এক মেয়ে সোহাগ। সোহাগের বিরাট সমস্যা। একবার আমেরিকাতে সে বিরাট বিপদে পড়ে এরপর তার জীবন বদলে যায়। তার বাপ-মা তাড়াতাড়ি আমেরিকা থেকে কোলকাতা চলে আসে। মাঝে মাঝে অমল তার পরিবার নিয়ে গ্রামে বেড়াতে আসে। বর্ধমানের কাছে তাদের গ্রাম। কোলকাতা থেকে বর্ধমান আসতে সময় বেশি লাগে না। সোহাগের গ্রাম খুব ভালো লেগেছে যায়। ভালো লেগে যায় গ্রামের মানূষ গুলোকে।
পারুল নামের একটা মেয়ে আছে গ্রামে।
খুব সুন্দরী। অমল তাকে ভালোবাসতো। কিন্তু অমলের ভুলের কারনে পারুল তাকে বিয়ে করে নি। একদিন অমল পারুলের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলো। বলা যায় তাকে ধর্ষন করেছিলো। পরে শোনা যায়, অমল বেশ্যাবাড়িতেও যেত। শেষমেষ পারুলের বিয়ে হয় এক বড় ব্যবসায়ীর সাথে। পারুলের স্বামী ভালো মানুষ। অমলের পরিবার গ্রামে এলে পারুলের সাথে দেখা হয়। কথা হয়। গ্রামে এসে অমল কেমন পাগল পাগল হয়ে যায়। উপন্যাসের শুরু হয় একটা বাস্তু সাপ দিয়ে। উপন্যাস শেষও হয় বাস্তু সাপ দিয়ে। উপন্যাসটা আমার কাছে ভালো লেগেছে। একবারও মনে হয়নি আমার সময়ের অপচয় হচ্ছে। মাঝে মাঝে উপন্যাস পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে লেখক নিজেই যেন উপন্যাসটি লিখে দারুন আনন্দ পেয়েছেন। পাঠক হিসেবে আমি নিজেও দারুন আনন্দ পেয়েছি। এত বড় বিশাল উপন্যাস বাংলাদেশের কেউ লিখতেও পেরেছে আজও?
'চক্র' উপন্যাসে অনেক গুলো চরিত্র।
প্রায় সব চরিত্র গুলোই আমার কাছে ভালো লেগেছে। বেশি ভালো লেগেছে ধীরেন কাষ্ঠ চরিত্রটি। ধীরেন কাষ্ঠ খুব দরিদ্র মানুষ। তার ঘর সংসার আছে। বয়স প্রায় আশি। সে প্রতিদিন গ্রামের স্বচ্ছল পরিবার গুলোর কাছে যায়। কেউ কেউ তাকে সকালের নাস্তা খেতে দেয়। সে খুব আরাম করে খায়। এজন্য তার স্ত্রী তাকে অনেক আ্কথা কুকথা বলে। ধীরেনের জীবন ইতিহাস লেখক বিস্তারির বলেছেন। ধীরেন মাঝে মাঝে অমলদের বাড়ি যায়। অমলের বাবা মহিম। মহিম তা্কে কফি খাওয়ায়। মহিমের কাছে ধীরেন প্রশ্ন করে- 'আচ্ছা এই স্ট্রোক জিনিসটা ঠিক কেমন? জানলে মরার সময় কিভাবে মরছি, শরীরে কেমন করছে সেটা বেশ বুঝতে বুঝতে মরতে পারতাম।' আবার কখনও প্রশ্ন করে 'খুব জানতে ইচ্ছা করে মানুষের আত্মাটা শরীরের ঠিক কোথায় থাকে?' ধীরেনের দুই ছেলে। তারা নেশা করে। বখাটে। ধীরেন চরিত্রটা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
আরেকটা চরিত্র আছে 'মরন' নামে।
মরন এর বয়স বারো বছর। সে মুহুর্তের মধ্যে যে কোনো গাছে উঠে যায়। দারুন সাতার পারে। মরন আবার দেবতা শিব এর ভক্ত। সে শিবের কাছে অনেক কিছু চায়। শিব তাকে দেয়ও। মরনের বাপ 'রসিক বাংঙ্গাল'। খুব ভালো মানূষ। দারুন হৃদয়বান একজন মানুষ। সমস্যা হলো তার দুটা বউ। একটা শহরে। একটা গ্রামে। মরনের মায়ের নাম বাসন্তি। খুব ভালো মানূষ। একজন সহজ সরল ভালো মানুষ। মরনের দাদী আছে। জিজিবুড়ি নাম, বিরাট দুষ্ট মহিলা। তার কথার ধার আছে। যাই হোক, সব মিলিয়ে উপন্যাসটা যে পড়বে তার ভালো লাগবে। আমার ভালো লেগেছে। এত বড় উপন্যাস এক মুহুর্তের জন্য বিরক্ত লাগে নি। আর এত এত চরিত্র অথচ এক মিনিটের জন্যও কোথাও জট পাকায় নি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

