somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভাবছি ব্যবসা করবো। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

রামমোহন রায়

২২ শে মে, ২০২০ রাত ১১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



অস্থির ভাবে পায়চারি করছিলেন রাজা।
কিছু কিছু বিষয় মানতে তার কষ্ট হয়। তার মন ভালো নেই। তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হছে। বড় হতাশ লাগছে তাঁর। মানুষই যদি বিরোধিতা করে, তাহলে তিনি লড়বেন কাদের নিয়ে? আর করবেনই বা কাদের জন্য? ধুস, আর লড়াই করে লাভ নেই।

এমন সময় দাড়োয়ান এসে বলল একজন গেঁয়ো ব্রাহ্মন দেখা করতে চাইছেন।
একটু বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, এখন আমার সময় নেই বলে দে।
দারোয়ান বলল, বলেছি। কিন্তু উনি যেতে চাইছেন না।
তখন রাজা বললেন, আচ্ছা পাঠিয়ে দে।
এক ব্রাহ্মন ঘরে ঢুকলো। খাটো ধুতি, গায়ে ফতুয়া, মাথায় টিকি। টিকি দেখলেই রাজার মাথাটা যায় গরম হয়ে। রুক্ষ স্বরে বললেন কী চাই? ব্রাহ্মন বলতে শুরু করলেনঃ

আমি নদীয়া জেলার পালপাড়া গ্রাম থেকে এসেছি। আমার নাম মহাদেব ভট্টাচার্য। থামলেন একটু, বোধহয় গুছিয়ে নিলেন একটু। আবার শুরু করলেন। জানেন, সেদিন ছিল বৈশাখ মাস। বাইরে থেকে ফিরতেই আদরের কন্যা অপর্ণা এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো কোলে। জল দিলো, গামছা দিলো, বাতাস দিলো, পাখা দিয়ে বাতাস করে দিলো। আমার জন্য তার যতো চিন্তা। বাপে মেয়েতে খুব গল্প করলাম। তখন ওর মা ডাকলো ঘর থেকে। ভেতরে যেতে বলল, মেয়ের তো সাত বছর বয়স হলো। আর কতদিন ঘরে বসিয়ে রাখবে? পাড়ায় যে কান পাতা দায়।
আমি বললাম, পাত্র পাচ্ছি কই? যার কাছেই যাই। ১০০০ টাকার কমে পন নেবেনা কেউ।
মন্দিরা ফিসফিস করে বলল, সবার তো কপাল সমান হয়না। কিন্তু জাত ধর্ম তো রাখতে হবে। কাল নদীপথে একজন কুলীন ব্রাহ্মন এসেছেন। বয়সটা বেশি। ৭০ এর ঘরে। কিন্তু বংশ উঁচু। ৫০ টাকায় কন্যা উদ্ধার করেন তিনি। আমাদের অপুকে ওর হাতে গৌরি দান করো।
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, না না এ হবেনা। কিন্তু সমাজের চাপতো বুঝি। বুঝি সংসারের চাপও। নিজের সঙ্গে অনেক লড়াই করে অপুর সাথে বিবাহ দিলাম। লাল চেলি, গয়না, আলতা, সিঁদুরে মেয়েকে আমার দেবীর মতো লাগছিলো। সে যে কী রূপ কী বলবো!! বোধয় বাপের নজরটাই লেগেছিল সেদিন।

পরদিনই মেয়েকে ছেড়ে জামাই বাবাজী আবার পাড়ি দিলেন নদীপথ। আরও কারোর কন্যা উদ্ধার করতে। বলে গেলেন আবার আসবো পরের বৎসর।

আমাদের বাপ মেয়ের আনন্দের জীবন চলছিলো বেশ। সারাক্ষন আমার পিছনে। সব কাজ শিখে গেলো। পারতো না শুধু রান্না। একদিন হাতে ফোস্কা পড়ে কী অবস্থা। আমি ওর মা কে বলে দিলাম, ওকে রান্নার কাজে লাগাবে না। আগুনে ওর কষ্ট হয়। কী খুশি সেদিন মেয়ে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কতো আদর।

আশ্বিন মাস গড়িয়ে যায়।
পুজো আসছে, চারদিকে সাজো সাজো রব। আমি হাট থেকে মেয়ের জন্য লাল টুকটুকে শাড়ি, আলতা সব নিয়ে এলাম। মেয়ে খুব খুশি। বলল ওঃ!! কখন যে পড়বো এইসব। বাবা, আমাকে রানীর মতো লাগবে, বলো? আনন্দে আমার চোখ ভিজে উঠলো। অভাবী সংসারে খুশি উপচে পড়লো।

ঠিক তার পরের দিন, জানেন ঠিক পরের দিন।
সকাল দশটা হবে। মেয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে লোক এলো পত্র নিয়ে। গতকাল নারায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় দেহ রেখেছেন। যথাবিহিত বিধি অনুসারে কন্যাকে সতী করার নির্দেশ দিয়েছেন তারা। ভেবেছিলাম, পত্র ছিঁড়ে ফেলবো। কিন্তু পত্রবাহক গ্রামের মাতব্বরদের জানিয়েই এসেছেন আমার বাড়ি। কোন উপায় ছিল না। রাজা বলে উঠলেন তারপর?

তারপর মেয়েকে সাজালাম।
নতুন লাল রঙ্গের শাড়ি, গয়না, আলতা, সিঁদুরে মেয়ে সেদিন অপরূপা। গ্রামে উৎসব, ঢাক বাজছে। সবাই ওর মাথার সিঁদুর, ওর আলতা নিচ্ছে। আর ও নিজে কী খুশি সেজেগুজে। ওর পছন্দের দধি মিষ্টান্ন এসেছে ঘর ভরে। জানেন, তার মধ্যেও ও সেসব আমাকে খাওয়াবে বলে ব্যস্ত।
কথা বন্ধ হয়ে আসে ব্রাহ্মনের। চোখটা মুছে আবার শুরু করেন। খালি সে বুঝতে পারেনি উৎসবটা কিসের।

এরপর খবর এলো নদীর তীরে চিতা সাজানো সমাপ্ত।
সতীমাতাকে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন কুলীন সমাজ। মেয়েকে কোলে নিয়ে চললাম। কাঁদিনি একটুও। ওকে বুঝতে দিতে চাইনি কিছুই। চিতার পাশে সমস্ত আনুষ্ঠানিক কাজ মিটলো। মেয়ে অবাক হয়ে দেখছিল সব। আগুন দেওয়া হোল চিতায়। দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো চিতা।
মেয়ে বলল বাবা, বাড়ি চলো। আগুনে আমার বড় ভয়।
আমি বললাম, আমার গলাটা একবার ছাড় মা। কচি হাত দুটো গলাটা ছাড়তেই ছুঁড়ে দিলাম অগ্নিকুণ্ডে। আগুনের মধ্যে থেকে একটা রিনরিনে গলা পাওয়া গেল, বাবাআআআআআআআআ।

সেই ডাক আমি ভুলতে পারিনি।
তারপর থেকে একদিনও রাত্রে ঘুম হয়নি। উঠতে বসতে খেতে শুতে শুধু এক আওয়াজ। বাবাআআআআআআআ। আমি পারিনি তাকে বাঁচাতে। আপনি পারেন। পায়ে ধরি আপনার। মেয়েগুলাকে বাঁচান। কতো মেয়ে গ্রাম ঘরে আপনার মুখ চেয়ে আছে। আছি আমরা, মেয়ের বাপ মা'রা। বলতে পারিনা সমাজের ভয়ে। কিন্তু আপনি পারবেন।

উঠে দাঁড়ালেন রাজা রামমোহন রায়।
বললেন, আমায় আপনি শক্তি দিলেন। পারতে আমাকে হবেই। এখানে না হলে ব্রিটেন যাবো। প্রিভি কাউন্সিলে দরবার করবো। কথা দিলাম আপনাকে।

বাকিটা ইতিহাস। সেই যুগে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই লড়াই কতোটা কঠিন ছিল বলে বোঝানো যাবে না। কলকাতার রাজ পরিবার থেকে ভারতের পণ্ডিত সমাজ সকলে ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কম নিন্দা অপমানের ঝড় বয়নি তাঁর ওপর দিয়ে। কিন্তু বটবৃক্ষের মতো অটুট ছিলেন তিনি।

রামমোহন রায়।
ভারতের 'প্রথম আধুনিক মানুষ'। আজ ২২ মে তাঁর জন্মদিন।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০২০ রাত ১১:০৩
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ ও জঙ্গি নারী

লিখেছেন সোহানাজোহা, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২০ রাত ২:০০



যেসব মেয়েরা জীবনে প্রচুর পাপ কাজ করেন তারা তাদের পাপ মোচনের জন্য জঙ্গি পথ ও জঙ্গি স্বামী বেছে নেন। বিয়ের আগের জীবন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এই মেয়েরা ফেসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

গতকাল ছিল প্রিয় ব্লগার জনাব গিয়াস উদ্দিন লিটনের জন্মদিন

লিখেছেন আবুহেনা মোঃ আশরাফুল ইসলাম, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২০ সকাল ১০:০৯


সামহোয়্যার ইন ব্লগের খ্যাতিমান ব্লগার জনাব গিয়াস উদ্দিন লিটনের শুভ জন্মদিন ছিল গতকাল। তাঁর জন্মদিনে ফেসবুকে অনেকেই শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁর প্রিয় সামহোয়্যার ইন ব্লগের অনেকেই হয়তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিহত সংলাপ : ০৬-১৫

লিখেছেন বিজন রয়, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২০ সকাল ১০:১১


০৬.
আগামীকাল মরে গিয়েছিলাম, গতকাল মারা যাবো, আজ নির্বোধ ও প্রশ্নাতীত।

০৭.
যিনি ঘোষণা দিয়ে বিখ্যাত হতে চান তিনি আসলেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র।

০৮.
মিলনের উল্টোপথে উভয়ের যোগাযোগ প্রয়াশই অবিমিশ্র সঙ্গম।

০৯.
মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

করোনায় একজন প্রবাসী ।

লিখেছেন নেওয়াজ আলি, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২০ বিকাল ৩:২৮




অনেক লম্বা সামনাসামনি দুইটা দালান । মাঝখানে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ফাঁকা গলি । একটা দালান গুদাম ঘরের মত আরেকটা শ্রমিক শ্রেণী লোকদের আবাস স্থল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যুরোক্রেটরা শেখ হাসিনাকে অবশেষে বেগম জিয়া বানায়ে ছাড়লো?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২০ বিকাল ৩:৪২



শেখ হাসিনা করোনার মাঝে ৫০০০ কোটী টাকা দিয়ে ২৫০০০ শ্রমিককে এভাবে বরখাস্ত না করে, রাস্তায় না নামিয়ে, এই টাকা দিয়ে, শ্রমিকদিগকে কারখানার ৫০ ভাগ শেয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×