
কবিরা সাধারণত হয়ে থাকেন সমাজের সবচেয়ে শান্ত, নিরীহ, ভাবুক এবং নির্জীব মানুষ। সে হিসেবে নজরুল কবির সেই কবিত্বকে ভেঙ্গেচুরে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন একটি শোষিত, শাসিত, নিগৃহীত, নির্যাতিত, পরাধীন জাতির দু:খ বয়ানে এবং সেই পরাধীনতাকে স্বাধীনতায় রুপ দিতে।
যে শতকে কবি জন্মেছিলেন (১৮৯৯) এর পরপরই উনিশ শতকের জন্ম। যে শতকে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছিলেন, হিটলারের মৃত্যু হয়েছিল, দুটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল, ভারত স্বাধীন হয়েছিল, পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। অনেকেই বলে থাকেন, নজরুল ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন। ভুল ধারণা। নোবেল পুরষ্কার দিয়ে নজরুলের ওজন মাপা যেত না। নোবেল পুরষ্কার নজরুলের ভার বহন ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় নি। তিনি ছিলেন কবিদের কবি, কবিকূল শিরোমণি। সাহিত্যের ধ্রুবতারা, ইতিহাসের ইতিহাস। সাম্যের প্রকৃত উদাহরণ। স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক। বিদ্রোহের আগুন। দুখু মিয়া।
একবার কাজী নজরুল ইসলামকে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কবি বলায়, নজরুল এক ব্যক্তির মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন।
কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী'।
সাপ্তাহিক 'বিজলি'তে প্রকাশিত হয়। ঐ সংখ্যাটি বেরুবার দিন নজরুল সম্পাদক অবিনাশ চন্দ্র ভট্রাচার্যের কাছ থেকে চার কপি কাগজ নিয়ে বললেন, 'গুরুজী'র কাছে নিয়ে যাচ্ছি'। নজরুল দ্রুত চলে গেলেন। বিকেলে এসে সে কাহিনী শোনালেন সবাইকে।
নজরুল তার বাড়িতে গিয়ে গুরুজী গুরুজী বলে চেচাতে থাকেন।
ওপর থেকে রবীন্দ্রনাথ বললেন, কী কাজী অমন ষাড়ের মতো চেচাচ্ছ কেন? কী হয়েছে?
নজরুল বললেন- আপনাকে হত্যা করবো। গুরুজী আপনাকে হত্যা করবো।
রবীন্দ্রনাথ বললেন- হত্যা করবো, হত্যা করবো কি, এসো, উপরে এসে বোস।
নজরুল বললেন, হ্যাঁ সত্যিই আপনাকে হত্যা করবো।
রবীন্দ্রনাথ বললেন আগে বোস- চা পান খাও।
নজরুল রবীন্দ্রনাথের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত নেড়ে নেড়ে 'বিদ্রোহী' কবিতাটি শোনালেন। রবীন্দ্রনাথ স্তব্ধ বিস্ময়ে নজরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে কাজীকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন- হ্যাঁ, কাজী তুমি আমায় সত্যিই হত্যা করবে। আমি মুগ্ধ হয়েছি তোমার কবিতা শুনে। তুমি যে বিশ্ববিখ্যাত কবি হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
রবন্দ্র্নাথ ঠাকুর বলেছেন- নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে তোমাদের মনে যেন কিছু সন্দেহ রয়েছে। নজরুলকে আমি “বসন্ত” গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেছি। জানি, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা অনুমোদন করতে পারোনি। আমার বিশ্বাস, তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছ। আর পড়ে থাকলেও রূপ ও রসের সন্ধান করোনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।
কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এসব তোমাদের আবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি! আমি যদি আজ তরুণ হতাম তাহলে আমার কলমেও ঐ সুর বাজত।”
(ইচ্ছা আছে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামু ব্লগে ১০০ পর্বের একটা ধারাবাহিক পোষ্ট দিব। এর আগে আমি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ১০০ পর্বের ধারাবাহিক পোষ্ট দিয়েছিলাম।)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০২০ বিকাল ৪:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


