
১৯৭৯ সালের জানুয়ারী মাস।
আমি তখন প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে চাকুরী করি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাষ্টার্সে অধ্যায়নরত একই সাথে সেন্ট্রাল ল' কলেজে এলএলবি'র ছাত্র। অর্থাৎ নৈশ ক্লাশে দু জায়গায় পড়ি। হঠাৎ একদিন আমার ভগ্নিপতি আবুল হাসেম সাহেব আমার ঢাকার বাসায় এসে হাজির হয়ে বললেন, বাবা খুব অসুস্থ। তোমাকে দেখতে চান। আমি তার কথায় বিশ্বাস করে ওনার সাথে বাড়িতে যাই। যেয়ে দেখি, বাবা তেমন অসুস্থ নন, বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা।
আমার বাবা আমাকে কিছু না বলে আমার মাষ্টার চাচা আঃ ওহাব কাকার কাছে পাঠালেন। তিনি বললেন- শোন, মিয়া ভাইয়ের অনেক বয়স হয়েছে, কখন কি হয়! তিনি চান তোমাকে বিয়ে করাতে। আমি বললাম, আমার পড়ালেখাই তো শেষ হয়নি সুতরাং বিয়ের বিষয় এখনই চিন্তা করছি না। ওনারা আমার কোন কথা শুনলেন না। ঘটক ডাকলেন। ঘটক সাহেব তার ভাগ্নির কন্যাকে দেখানোর জন্য আমাদের বরিশাল শহরে নিয়ে গেলেন।
আমার মনের মধ্যে অন্য চিন্তা মেয়ে যদি অপ্সরাও হয় তবুও না বলব। আমার সঙ্গীদের সবার মেয়ে দেখে পছন্দ হলো। আমি পথে ফিরতে ফিরতে সফর সঙ্গীদের বললাম, মেয়ে আমার পছন্দ নয়। বাড়িতে ফিরেও আমার মাকে বললাম, মেয়ে আমার পছন্দ হয়নি। মা বললেন, তোমাকে এই মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে। আমার মাকে আমার এক চাচিমা এই মেয়ে সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়ায় আমার মা এই মেয়েকেই ছেলের বউ করার সিদ্ধান্তের কথা আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল। আমি মাকে বললাম, মেয়ে যদি অন্ধও হয়- যেহেতু তুমি বলেছ, তাই তাকেই আমি বিয়ে করব।
এই মেয়েটি আর কেউ নন- তিনি হলেন, আমার জীবন সঙ্গী।
আমার ৩০ বছরের দাম্পত্য জীবনের সুখ দুঃ খের অংশিদার সুরাইয়া জাহান রুনু। ও তখন চাখার কলেজের একাদশ শ্রেনীর ছাত্রী। আমাকে সে পাগলের মত ভালবাসত। তখন তো মোবাইলের যুগ ছিলো না। পত্রালাপই ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। আমি খুব ছোট্ট চিঠি লিখতাম, যা ওকে অতৃপ্ত রাখত, দেখা হলে আমাকে সে বলত, এতো ছোট্ট চিঠি কেন লিখি। তোমার চিঠি আমার বান্ধবীদের দেখাতে পারি না। বলে রাখা ভালো, কলেজের ঠিকানাতেই চিঠি লিখতাম। আমাকে যখন ও কাছে পেত তখন কতশত অনুযোগ করত, যা আজকাল যুগলদের দেখা যায় না। এখন সবই রাসায়নিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সে আমার মাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা ও ভালবাসত। আমার মা শেষ জীবনে অসুস্থতার কারনে দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। আমার স্ত্রী মায়ের শিয়রে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন কাটিয়েছে। কখনো তার চোখমুখে অস্বস্তিকর ভাব আমি দেখিনি, যা আমাদের সমাজে একেবারে দুর্লভ।
আজ আমি বড্ড অসহায়।
আমার প্রেরণা, আমার সুখ দুঃখের সাথী- ২০০৮ সালে ৮ ই নভেম্বর, ক্যান্সারের কাছে হার মেনে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে জীবন যুদ্ধে হেরে গিয়ে আমাকে সুখ স্মৃতিতে ভাসিয়ে চলে গেছে। আমি আমৃত্যু ওকে ভুলবো না, ভোলা যাবেও না। তুমি শান্তিতে থেকো।
(লেখাটি আমার নয়। আমার শ্বশুর সাহেবের লেখা। উনি আমার অনুরোধে ইদানিং লেখালেখি শুরু করেছেন।)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৫:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


