
ঢাকা শহরের মানুষ কিভাবে বেঁচে আছে!
বাজারে আগুন। প্রতিটা জিনিসে দাম বেশি। অনেক বেশি। ডিম ডজন ১১০ টাকা। আগে ছিলো ৮০ বা ৯০ টাকা। একটা লাউ ৮০ টাকা। আগে ছিলো ৩০/৪০ টাকা। বাজারে যে কোনো সবজি ৮০ টাকার উপরে। পেঁয়াজ ৯৫ টাকা। আলু ৪০ টাকা। আলু সব সময় কিনতাম ২০ টাকা করে। এখন ডবল দাম। বাজার ভর্তি চাষের মাছ। খেতে একটুও স্বাদ না। তবু সেই চাষের মাছের দামও ৫ শ' টাকার উপরে কেজি। চিংড়ি মাছ কিনতাম ৫ শ' টাকা কেজি। এখন ৬৫০ টাকা। বাজার ভর্তি ইলিশ মাছ কিন্তু অনেক দাম। এত দাম দিয়ে মানুষ কিভাবে কেনাকাটা করছে, আমি ভেবে পাই না! বাজারে গেলে আমার হিমসিম খেতে হয়। দম বন্ধ হয়ে আসে। চোখে অন্ধকার দেখি। শেষমেষ মন খারাপ করে বাসায় ফিরি।
এই শহরের মানুষ কিভাবে খেয়েপড়ে বেঁচে আছে!
বিরাট এক রহস্য। এই রহস্য আমি বের করতে পারছি না। রাস্তার বের হলেই আমি হাঁ করে মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। এই শহরে যাদের টাকা আছে, তাদের প্রচুর টাকা আছে। আর যাদের টাকা নেই, একেবারেই নেই। একসময় শুধু ঈদের সময় শহরে ভিক্ষুক বেড়ে যেত। এখন করোনাকাল আসার পর থেকে শহরে ভিক্ষুক অনেক বেড়ে গেছে। ভিক্ষুকদের ভিক্ষা চাওয়ার স্টাইল অনেক বদলে গেছে। একটা বোরকা পরা মহিলা ছয় সাত মাসের বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ফুটপাতে। লোকজনদের বলে আমাকে এক কেজি ভাতের চাল কিনে দেন। অথবা বলে আমাকে একটা পাউয়া রুটি কিনে দেন। আবার একটি পরিবারের বাবা মা আর দুই ছেলেমেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে, বলে- গ্রামে যাব টাকা নাই আমাকে নওগা যাওয়ার ভাড়া দেন। সব মিলিয়ে শহরের বেশির অর্ধেক লোক ভালো নেই। তারা চুল করে আছে। আড়ালে হয়তো কাঁদেও।
আমি গত চার দিন ধরে পকেটে তিন হাজার টাকা নিয়ে ঘুরছি।
প্রতিদিন বাজারে যাই। কিছু না কিনে বাসায় ফিরে আসি। সুরভি যে লিস্ট দিয়েছে তাতে দশ হাজার টাকার বেশি লাগবে। বাসায় ফিরলে সুরভি বলে বাজার কই? আমি বলি- আজ বাজারে যাই নি। বৃষ্টি হয়েছে। বাজারে অনেক প্যাঁক কাঁদা, পরে। আগামীকাল যাব। এই করতে করতে পকেটে থাকা তিন হাজার টাকা শেষ। মাছের বাজারে গিয়ে দেখি কিছু লোকজন পাগলের মতো মাছ কিনছে। তারা কোনো দামদরও করছে। এক লোক তিন হালি ইলিশ কিনলো তেরো হাজার টাকা দিয়ে। যে লোক বারোটা ইলিশ মাছ কেটে দিলো তাকে এক হাজার টাকা দিয়ে দিলো। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি। কিছু মানুষের এত টাকা কেন? শীত শুরু হয়নি কিন্তু বাজারে টমেটো, শিম, ফুলকপি আর বাধাকপি পাওয়া যাচ্ছে। শিম আর টমেটো ১২০ টাকা কেজি। ইলিশ মাছ, শিম টমেটো ইত্যাদি জিনিস কিনতে একজন মানুষের প্রতিমাসে অনেক টাকা ইনকাম করতে হবে।
রেস্টুরেন্ট গুলোতে ভরা মানুষ।
রেস্টুরেন্ট গুলো দেখলে মনে হয়- এই শহরে কোনো গরীব মানুষ নেই। লোকজন পাগলের মতো খাচ্ছে। সেদিন কেএফসি গেলাম গিয়ে দেখি বসার জায়গা নেই। পুরান ঢাকায় বিরানী খেতে গিয়েও একই অবস্থা, বসার জায়গা নেই। বংশালের আল রাজ্জাক হোটেলে যখনই যাই দেখি মানুষ গিজ গিজ করছে। অর্থ্যাত এক শ্রেনী ইচ্ছা মতো খাচ্ছে, ইচ্ছা মতো কেনাকাটা করছে, আরেক শ্রেনী রেস্টুরেন্টের আর বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছে। এক শ্রেনীর ঘর ভর্তি খাবার, আরেক শ্রেনী না খেয়ে আছে। এক শ্রেনীর পকেট ভর্তি টাকা আরেক শ্রেনীর পকেট ফাঁকা। যাদের টাকা নাই, যারা না খেয়ে আছে তাদের নিয়ে ঈশ্বর বা সরকার চিন্তিত নয়। আমার দুঃখ লাগে একদম পিচ্চি পিচ্চি পোলাপান ভিক্ষা করছে। এটা প্রচন্ড দুঃখজনক। একটা ৫/৭ বছরের বাচ্চা ছেলেমেয়ে হাত পাতছে। আমার খুব কষ্ট হয়। এখন তাদের পুতুল নিয়ে খেলার কথা।
ঢাকা শহরে অনলাইন মার্কেটিং বেশ জমজমাট হয়েছে।
প্রচুর ছেলেমেয়ে এবং ঘরের বউরা অনলাইন মার্কেটিং করছে। অনেক চাকরীজীবিও অনলাইন ব্যবসা করছে। তাদের বেশ লাভও হচ্ছে। ফেসবুকে অনলাইন ব্যবসার পেজের অভাব নাই। আমি সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মন দিয়ে দেখি। এক মেয়ে পত্রিকা অফিসে চাকরি করে, ফাঁকে ফাঁকে সে ইলিশ মাছও বিক্রি করে অনলাইনে। তার প্রচুর লাভ হচ্ছে। সে নিজেই তা স্বীকার করছে। এক মহিলা মধু বিক্রি করছে। ফেসবুকে তার পেজ আছে। সে বেশ ভালো বিক্রি করছে। এত এত অর্ডার পাচ্ছে যে রীতিমত মধু ডেলিভারী দিতে তাকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এক হুজুর বিক্রি করছে চা পাতা। তার ব্যবসাও ভালো হচ্ছে। একমেয়ে রান্না করা খাবার বিক্রি করছে। সে প্রচুর অর্ডার পাচ্ছে। আমার এক বন্ধু বিক্রি করছে ফিল্টার পানির মেশিন। সে আবার অটবি ফার্নিচারে চাকরিও করছে। তার সেলারিও ভালো। আমার এক বন্ধুর ওয়াইফ বিক্রি করছে লিপস্টিক, মেকাপ বক্স আর ফ্রেশ ওয়াশ। তার পেজে মেম্বার আছে সাত হাজারের উপরে। সবাই কাম কাজ নিয়ে ভয়াবহ ব্যস্ত। আর আমি নালায়েক খা খা করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। শহরের ধূলাবালি গায়ে মাখাছি। আর বলছি জীবনটা মন্দ নয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


