
আমার জন্ম ঢাকায়, বড় হয়েছি ঢাকায়।
নিজের শহরটাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি তাই যখন কাউকে দেখি কেউ রাস্তায় ময়লা ছুড়ে ফেলছে ভেতরটাতে একটা কামর দেয়। রাস্তায় কেন ময়লা ফেললেন, বলতে গেলে তেড়ে মারতে আসে। আমার জীবনে আমি দুটা কাজ কখনও করতে পারি নি। এক, রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্বাব করা। দুই, গলির মোড়ে ময়লা ফেলা। আমাদের এলাকায় যে ছেলেটা ময়লা নিতে আসে সে প্রায়ই আসে না। তখন অনেককে দেখি, নিজের বাসার গলির সামনেই ময়লা ফেলে যায়। আমি ময়লা নিয়ে পনের মিনিট হেটে ময়লার স্তূপে গিয়ে ময়লা ফেলি।
শুধু ঢাকা শহর নয় আমার কাছে সমগ্র বাংলাদেশকেই প্রচন্ড ব্যয়বহুল মনে হয়। আমার কাছে অবাক লাগে এই শহরের মানুষ কিভাবে খেয়েপরে বেঁচে আছে! সাধারণ মানুষের বার্ষিক গড় আয়ের বিবেচনায় এদেশে জীবনযাপন বেশ কঠিন। সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশের মানুষের লোভ বেশি, নৈতিক মূল্যবোধ একেবারে দুর্বল, নিয়ম শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ খুব বেশি কম, প্রচন্ড অমানবিক, একজন মানুষ ঘর থেকে বাইরে বের হলেই কেমন অমানবিক হয়ে যায়। অমানুষ হয়ে যায় অথচ ঘরে তার মমতাময়ী স্ত্রী আছেন। আছে আদরের সন্তান। এই শহরের মানুষ নিজেকে জাহির করার আগ্রহ বেশি।
এই শহরের ব্যবসায়ীরা ভয়ংকর সুযোগ সন্ধানী।
ঈদ, রোজা, পূজা, শীত, বর্ষা, গরম যে কোন উপলক্ষ্যেই ওনারা জিনিস-পত্রের দাম বাড়িয়ে দিতে ওস্তাদ। ব্যবসায়ীরা মনে করে মানুষকে ঠকাতে পারলেই যেন জিতে গেলাম। আমাদের এলাকায় তিনটা মাংসের দোকান আছে। প্রচুর প্রতিদন্ডিতা তাদের মধ্যে। তারা ব্যানার ঝুলিয়ে রেখেছে, ৬০০ টাকা কেজি। তা দেখে অন্য দোকান করেছে ৫ শ' টাকা কেজি। আরেক দোকান করেছে ৪৫০ টাকা কেজি। ৪৫০ টাকা দেখে আমি গেলাম গরুর মাংস কিনতে। কিন্তু আমার কাছে দাম রাখলো ৬০০ শ' টাকা। আমি বললাম, ব্যানারে লিখে রেখেছেন ৪৫০ টাকা? দোকানি বলল, ওটা বিকেলের দিকে। সকালে ৬০০ শ' টাকা করেই বিক্রি হয়। এরপর আমি বিকেলে মাংস কিনতে গেলাম। তখনও দাম রাখলো ৬ শ' টাকা। আমি বললাম, বিকেলে না ৪৫০ টাকা করে বললেন, তখন দোকানি বলল, না না সকালে। এই হলো ব্যবসায়ীদের মানসিকতা।
মধ্যবিত্ত পরিবারের কোন সদস্য অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে ডাক্তারের ভিজিট, টেস্ট, ঔষধ মিলে মোটামুটি কান্নাকাটির অবস্থা তৈরী হয়ে যায়। খুব বেশি খরচ। আবার চিকিৎসার মানও ভালো না। নার্স আয়াদের ব্যবহার অতি বাজে। এবং ডাক্তাররা নিজেদের অন্য গ্রহের প্রানী বলে মনে করেন। যাদের প্রচুর টাকা আছে, তারা চিকিৎসা করাতে বিদেশ চলে যায়। আমাদের দেশের মন্ত্রী, এমপি, সচিব, এবং তাদের ছত্রছায়ায় থাকা লোকজনেরা অনেক টাকার মালিক। তারা চিকিৎসা করান বিদেশে। এইজন্য মানুষজন রাজনীতিতে ঝুকে। নিত্য পণ্যের বাজার সারা বছরই চড়া থাকে, খাদ্য দ্রব্যের দাম বেশি, বাসা ভাড়ার হার বেশি, শিক্ষা ব্যয় বেশি। যাদের উপরি আয়ের ব্যবস্থা আছে তাদের কথা ভিন্ন, কিন্তু বাদবাকী সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয় আয়-ব্যয়ের হিসেব মিলাতে, চাওয়া পাওয়ার যন্ত্রনা লুকাতে।
আমাদের অনেকের না চাইতেও ঢাকায় প্রতিনিয়ত বসবাস করতে হচ্ছে। এই শহরে পিৎজা, বার্গার, চিকেন ফ্রাই এবং জুস জাতীয় খাবারের দাম ইউরোপ, আমেরিকার চেয়ে বেশী। কফির দাম ইউরোপের সমান সমান। ঢাকায় জমি ও বাড়ির দাম ইউরোপ ও আমেরিকার চেয়ে সম্ভবত ১০ গুনের বেশী। ঢাকায় জমির দাম পৃথিবীর সবচেয়ে দামি নিউয়র্কের ম্যানহাটানের চেয়েও বেশী। ঢাকার বাড়ির দাম হলিউডের চেয়েও বেশি। ঢাকায় বিয়ের খরচ অনেক। আমি একটা বিয়েতে গিয়েছিলাম। সেই বিয়েতে তিন কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিলো। শুধু মাত্র স্টেজ করেছিলো ২৫ লাখ টাকা দিয়ে। ঢাকার বিয়ের খরচ দিয়ে ইউরোপ ১০ টি বিয়ে হয়। ঢাকায় কিছু মানুষের কাছে অজস্র টাকা। সীমাহীন টাকা। এতো টাকা যে ইউরোপ আমেরিকায় কেউ কল্পনাও করতে পারে না। ঢাকার মানুষ কোটি কোটি টাকা নগদে দিয়ে গাড়ি বাড়ি কেনে। কোপেনহেগেনে সব কিছু কিস্তিতে কিনতে হয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৩:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


