
আমার কোনো অসুখ বিসুখ হয় না।
কিন্তু চারিদিকে কেউ ভালো নেই। সবারই নানান রকম সমস্যা। ডাক্তার হাসপাতাল নিয়ে ভয়াবহ ব্যস্ত। ফার্মেসী গুলোতে সব সময় ভিড় থাকেই। আমার মা গত ত্রিশ বছর ধরে অসুস্থ। প্রতিদিন সে অনেক গুলো করে ওষুধ খায়। গত ত্রিশ বছর ধরেই দেখছি। প্রতিমাসে মা তিনবার ডাক্তার দেখাবেই। এবং বছরে একবার ১০/১৫ দিন হাসপাতালে থাকবেই। গত ত্রিশ বছর ধরে এরকমই দেখে আসছি। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমার মা'র হবি হচ্ছে, ওষুধ খাওয়া এবং ডাক্তার দেখানো। আমার মা ওষুধ, ডাক্তার আর হাসপাতাল করতে করতে বিরাট অভিজ্ঞ হয়ে গেছে। সে হাসপাতালের নাম দিয়েছে বাপের বাড়ি। আমাদের বাসায় গেস্ট এলে মাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে- কেমন আছেন? তখন মা তার ওষুধের বাক্স দেখিয়ে বলে- এবার বুঝেন আমি কেমন আছি। তখন মার চোখমুখ চকমক করে! এই করোনা কালে মা টানা তিনমাস ডাক্তারের কাছে যায় নি। মার কোনো সমস্যাও হয়নি।
আমার বাপকে আমি কোনোদিন ডাক্তার দেখাতে দেখি নি।
বিনদাস চলেছে। আমোদ ফুর্তি করেছে। চাকরি করেছে, ব্যবসা করেছে। গর্জন করেছে। এই শেষ বয়সে এসে আব্বার অবস্থা খুব বেশি খারাপ হয়েছে। এখন আব্বার অবস্থা খুব বেশি খারাপ। প্রতিমাসে এক দুইবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এবং হঠাত হঠাত সে কাউকে চিনতে পারে না। এলোমেলো কথা বলে। আব্বার বয়স ৬০/৬৫ হবে। একদিন আমি বারডেম হাসপাতালে আব্বাকে দেখতে গেলাম। বললাম, কেমন আছো? আব্বা বলল, ভালো আছি। আমি বললাম, তুমি নাকি মাঝে মাঝে কাউকে চিনতে পারো না? আব্বা বলল, কে কয় এসব? এগুলো ভুল কথা। যাই হোক, বাদ দে। চা খাবি?
আমি হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছি। বেশিক্ষন হাসপাতালে থাকলে ধম বন্ধ হয়ে আসে আমার। আব্বা বলল, আমি তোর সাথে নিচে যাব।
আমি বললাম, কেন? আব্বা বলল, সিগারেট খাবো। ওরা আমাকে সিগারেট খেতে দেয় না।
ফুপু বললেন, দাদা রোগী বাইরে যাওয়া নিষেধ। তাছাড়া ডাক্তার আপনাকে সিগারেট খেতে সম্পূর্ন নিষেধ করেছেন। (ফুপু'ই এখন হাসপাতালে থাকেন। আব্বাকে দেখাশোনা করেন। এগারো ভাই বোনের মধ্যে আমার আব্বা'ই সবচেয়ে বড়। তাই তাকে তার ভাই বোনেরা সবাই দাদা বলে ডাকে।) আমি আব্বাকে পাঁচ টা বেনসন লাইট সিগারেট কিনে দিলাম। বললাম, ওয়াশরুমে ঢুকে ঝটপট দুটা টান দিয়ে ফেলে দিও। পুরোটা খাওয়ার দরকার নাই। ফুপু আমার উপর খুব রেগে গেলেন।
ত্রিশ বছর পর্যন্ত আমার তেমন অসুখ বিসুখ হয়নি।
বেশ ভালোই ছিলাম। ইদানিং আমি অসুস্থ বোধ করছি। প্রেশার বেড়ে যায় আমার। প্রচন্ড মাথা ব্যথা হয়। চোখেও সমস্যা হচ্ছে। এবং পা চাবায়। সম্ভবত বাতের ব্যথা। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তো আছেই। গতকাল সন্ধ্যায় হঠাত আমার প্রেশার বেড়ে গেলো। প্রেশার মাপলাম। সুরভি আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তেঁতুল খেলাম, লেবু খেলাম। মাথায় পানি দিলাম। লম্বা সময় পর্যন্ত মাথা ব্যথা করলো। প্রচন্ড মাথা ব্যথার কারনে দুইটা নাপা খেয়ে ফেললাম। এটা সত্য মাথা ব্যথা হলে নাপা খেলে আমার মাথা ব্যথা কমে যায়। আমার শরীর খারাপ করলে আমি সুরভিকে সাধারনত বলি না। বেচারি মন খারাপ করবে। এদিকে সুরভির শরিরও ভালো না। সুগারের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাছাড়া থাইরয়েডের সমস্যা তো আছেই।
গতকাল গিয়েছিলাম বাজারে।
সুরভি অনেকদিন ধরে বাজারের লিস্ট দিয়ে রেখেছিলো। নয় দিন পার হয়ে গেছে। এরকম কখনও হয়নি। যাই হোক, বাজার করতে গিয়ে বুঝলাম শরীরটা খারাপ লাগছে। বেশ খারাপ লাগছে। আমার চেনা একজন কুলি আছে। ওকে বললাম, বাসায় বাজার গুলো দিয়ে আসো। সে খুশি মনে চলে গেলো।
এই কুলির নাম রমিজ।
সে আমাকে আর সুরভিকে খুব পছন্দ করে। একদিন সামান্য বাজার করেছি। রমিজ বলল, স্যার আমি বাজার বাসায় দিয়ে আসি। আমি বললাম, অতি সামান্য বাজার। কুলি লাগবে না। তুমি ৫০ টা টাকা রাখো। রমিজ বলল, কাজ না করে আমি টাকা নিই না। বাজার বাসায় দিয়ে আসি। তারপর না হয় টাকা টা দিবেন। রমিজকে নিয়ে বাসায় এলাম। সুরভি রমিজকে দেখে বলল, হায় হায় ছেলে তো ঘেমে গেছে। সুরভিকে রমিজকে বসিয়ে লেবুর সরবত বানিয়ে খাওয়ালো। একটা আপেল দিলো, দুটা শার্ট দিলো, একটা গেঞ্জি দিলো। রমিজের চোখে পানি চলে এলো। এরপর রমিজ কথা দিয়েছে, সে সব সময় আমার বাজার বাসায় দিয়ে আসবে এবং এজন্য সে কোনো টাকা নিবে না। রমিজের জন্য আমার খুব মায়া হয়। আমি ব্যবসা শুরু করলে রমিজকে সাথে রাখবো।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

