
ঢাকা শহরের সবচেয়ে ছোট বাড়ি আমাদের।
ছোট হলে কি হবে, একটা বারান্দা আছে। এই বারান্দায় আমি বসে থাকি। অনেক কিছু দেখি! খবরের কাগজ পড়ি। চা খাই। আকাশ দেখি। বারান্দা দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকে ঘরে। এত বাতাস যে শীতকালে বারান্দার দরজা লাগিয়ে রাখতে হয়। তবে সবচেয়ে অবাক বিষয় আমাদের ঘরে কোনো মশা নেই। গত ছয় বছরে মশারি টানাতে হয়নি। মশার কয়েল জ্বালাতে বা স্প্রে করতে হয়নি। ছোট বাড়ি হলেও শান্তি আছে। সবচেয়ে বড় শান্তি মাস শেষে ভাড়া দেওয়ার চিন্তা নাই। তবে ভাড়া দিতে না হলেও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল দিতে হয়। আরো দিতে হয়, ময়লার টাকা, ডিশ বিল, ইন্টারনেট বিল। শহরের মানুষের খরচের শেষ নেই। খরচ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নাই। শহরের মানুষের দিন দিন খরচের মাত্রা বাড়ে।
যাই হোক, বলছিলাম বারান্দার কথা।
বারান্দায় বসে থাকি। ছোট্র এই বারান্দা থেকে না চাইলেও অনেক কিছু দেখা যায়। আমি দেখি। দেখতে আমার ভালো লাগে। এক হিন্দু মহিলা সারাদিন কাজ করে। প্রতিদিন অনেক গুলো করে কাপড় ধোয়। কাপড় গুলো ছাদে মেলে দেয়। মহিলা ছাদের ছোট রুমে থাকে। মহিলার এক বাচ্চা মেয়ে আছে। কিন্তু মহিলার স্বামীকে কখনো দেখি নি। হয়তো স্বামী নাই অথবা বিদেশ থাকে। মহিলার ছোট মেয়ে সারাদিন ছাদে খেলো। খাচার মধ্যে দুটা মূরগী আছে তাদের। ছোট বাচ্চাটা সারাদিন মূরগীর সাথে খেলে। মূরগীকে খাবার দেয়। বাচ্চার মা সারাদিন ঘরের কাজ করে বিকেলে ছাদে হাঁটে। তখন সে ফিটফাট থাকে। মাঝে মাঝে সে আর তার ছোট মেয়ে মিলে চা খায়। এই হিন্দু মহিলা প্রতিদিন দুপুরে কাকদের ভাত খেতে দেয়। অসংখ্য কাক আসে। দৃশ্য দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।
আরেক বিল্ডিং এ দেখা যায়-
এক মহিলা সারাদিন বিছানায় শুয়ে টিভি দেখে। সন্ধ্যায় তার স্বামী ফিরে এলে দুজনে মিলে বিছানায় শুয়ে টিভি দেখে। মাঝে মাঝে মহিলা তার স্বামীর গায়ে দু পা উঠিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে মহিলা রান্না ঘরে এসে বাটিতে করে যেন কি নিয়ে যায়। দুজন খেতে খেতে টিভি দেখে। আমার ধারনা বাটিতে চানাচূর থাকে। আমি এদের জন্য মনে মনে প্রার্থনা করি। তারা ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক। তাদের ঘরে সন্তান আসুক। সারাদিন শুয়ে বসে টিভি দেখতে কার এত ভালো লাগে! সংসারে একটা বাচ্চা এলে মহিলা নিশ্চয়ই বাচ্চার দেখভাল বাদ দিয়ে টিভি দেখবে না। মহিলার মনে হয় বই পড়ার অভ্যাস নেই। আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে বাসায় গিয়ে মহিলাকে কিছু বই দিয়ে আসি। বলি, এত টিভি দেখবেন না। টিভির চেয়ে বই পড়া অনেক ভালো।
আমার বারান্দা থেকে একদম সোজা একটা ঘর দেখা যায়।
এই ঘরে এক লোক থাকে। সে হুজুর। তার সম্ভবত করোনা হয়েছে। সারাদিন হুজুর একা থাকে। ঘরে আর কেউ নাই। মাস্ক পড়ে থাকে ঘরের মধ্যে। হুজুর সারারাত ঘুমায় না। বিছানার উপর অসংখ্য কাগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিসের যে হিসাব নিকাশ করেন। একটু পর পর ফ্লাস্ক থেকে চা অথবা গরম পানি ঢেলে খায়। হুজুর বাসায় খালি গায়ে থাকে। লুঙ্গি পরে। মাথায় থাকে সাদা টূপি। একসময় এই ঘরে বেশ কিছু ছোট ছোট বাচ্চা দেখেছি। মনে হয় হুজুরের করোনা হওয়ার কারন সে তার স্ত্রী কন্যাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। হুজুরটার জন্য আমার মায়া লাগে কত দিন ধরে সে একাএকা আছে। নিজে রান্না করে খায়। অথচ তার স্ত্রী আছে, কন্যারা আছে। আমার ইচ্ছা আছে একদিন হুজুরের বাসায় যাব। জিজ্ঞেস করবো সারা দিনরাত কি এত হিসাব করেন!
আমাদের বাসার পাশের বিল্ডিং এ বাতেন নামে একলোক থাকে।
বাতেন ঘর জামাই। কোনো কামকাজ করে না। সে তাদের পুরো ছাদ গাছপালা দিয়ে ভরে ফেলেছে। ছাদে পা রাখার জায়গা নাই এমন অবস্থা। এমন কোনো গাছ নাই যে সে ছাদে লাগায় নি। গেন্ডারি গাছ পর্যন্ত আছে। পুঁইশাক, লাউ শাক, পেয়ারা, আম, আঙ্গুর, মালটাসহ আছে নানান ফুলের গাছ। বাতেন ভাই একা একা কোনো ফিল খায় না। সব কিছুর ভাগ আমাদের দেয়। এই তো সেদিন সুরভি আম ডাল রান্না করলো। আমটা দিয়েছেন বাতেন ভাই। এই বাতেন আমাকে খুব যন্ত্রনা করে। সে ভোর পাঁচ টা থেকে ছাদে খুট খুট করতেই থাকে। তার খুট খুট শব্দে আমার ঘুমের খুব সমস্যা হয়। তখন মনে মনে বাতেনকে আমি গালি দেই। এই বাতেন ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ইটালী এবং সৌদি গিয়েছে। তিন মাস থেকে চলে এসেছে।
আমাদের বাসার উলটো দিকের ছাদের ঘটনা।
এই বাড়িতে একজন সরকারী কর্মকর্তা থাকেন। তার সম্ভবত অনেক টাকা। উনি উনার ছেলেকে একটা বাইক কিনে দিয়েছেন। ছেলেটা সারাদিন বিকট শব্দে বাইক চালায়। বাইকে হয়তো এক্সট্রা কিছু যন্ত্র লাগিয়েছে। যা বিকট শব্দ সৃষ্টি করে। সেই ছেলে ছাদে কবুতর পালে। মাঝে মাঝে আমার সাথে দেখা হয়। তখন ছেলেটা আমাকে বলে, মামা আমার চল্লিশ হাজার টাকার কবুতর মরে গেছে। আমি বললাম, কিভাবে মরলো? ছেলেটা বলে, না খেয়ে মরছে। বেড়াতে গিয়েছিলাম ঢাকার বাইরে। কবুতরের খাবার টাবার কিচ্ছু দিয়ে যেতে মনে ছিলো না। সতের দিন পর ফিরে এসে দেখি- সব গুলো মরে উলটে আছে। এরকম ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটেছে। এবার আমি আশি হাজার টাকার কবুতর কিনেছি মামা। খুব যত্ন নিচ্ছি। ছাদে সিসি ক্যামেরাও লাগিয়েছি। ভাবছি একজন লোক রেখে দিবো কবুতরের দেখাশোনা করার জন্য।
একটা হাদীস আছে। খুব কঠিন হাদীস।
হাদীসটা এই রকমঃ এক লোক নতুন বিয়ে করেছে। কিন্তু পাশের বাসার কুদ্দুস তাদের ঘরে উঁকি দেয়। প্রতিদিন রাতে কুদ্দুস এই কাজ করে। লোকটা বিরক্ত হয়ে এবং কোনো উপায় না দেখে নবিজির কাছে যায়। নবিজিকে বলে, হে আল্লাহর রাসূল- আমি নতুন বিবাহ করিয়াছি। কিন্তু কুদ্দুস রোজ আমার ঘরে উঁকি দেয়।
নবিজি বললেন, কুদ্দুসকে বুঝিয়ে বলো। ভদ্রলোক চলে গেলো এবং কুদ্দুসকে বুঝিয়ে বলল। ভাই কুদ্দুস আমি নতুন বিয়ে করেছি। দয়া করে আমার ঘরে উঁকি দিও না। এটা ঠিক না। কুদ্দুস বলল, ঠিক আছে। ঠিক আছে বললেও সে আবার উঁকি দিলো। ভদ্রলোক আবার নবিজির কাছে গেলো। নবিজিকে বলল, হে আল্লাহর রাসূল আমি কুদ্দুসকে বুঝিয়ে বলেছি। কিন্তু সে আবার উঁকি দিয়েছে।
নবিজি হাসলেন এবং বললেন, তুমি বোধহয় ঠিক মতো বুঝাও নাই। যাও, তাকে আবার ভালো করে বুঝাও। ভদ্রলোক চলে গেলে এবং কুদ্দুসকে সুন্দর করে বুঝালো। সোনা ভাই আমার, মিয়াঁ ভাই আমার প্লীজ আমাদের ঘরে উঁকি দিও না। আল্লাহর দোহাই লাগে। কুদ্দুস বলল, ওকে। কিন্তু কুদ্দুস আবার উঁকি দিলো।
ভদ্রলোক এবার রেগে আবার নবিজির কাছে গেলে। বলল, হে পেয়ারা নবি, হে আল্লাহর রাসূল দুইবার সুন্দর করে বুঝিয়ে বলার পরও কুদ্দুস আবার আমার ঘরে উঁকি দিয়েছে। এবার নবিজি প্রচন্ড রেগে গেলেন। বললেন, খেজুর কাটা দিয়ে ওর চোখ উপড়ে ফেলো।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

