
আজ ছিল এই অভাগার জন্মদিন।
৩৫ এ পা দিলাম। আর ৩৫ বছর কি বাঁচবো? পৃথিবীতে আমার জন্ম না হলেই ভালো হতো। আমি আগাগোড়া একজন ব্যর্থ মানুষ। ঈশ্বর আমার অনুমতি না নিয়েই আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই জন্য আমি ঈশ্বরকে কখনও ক্ষমা করবো না। দরিদ্র মানুষদের জন্য পৃথিবী খুব একটা আনন্দের জায়গা না। প্রতিটা মুহুর্ত লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে। দম বন্ধকর অবস্থা। আমি নিশ্চিত আমার মৃত্যু হবে স্ট্রোক করে। আমার মৃত্যুতে বিপদে পড়বে আমার স্ত্রী, কন্যা। তাদের জন্য কিছুই করতে পারি নি। কিছু জমা করতেও পারি নি। তারা সমুদ্রের গভীরে পরবে।
আমার সব আছে।
তবুও আমি আজ এতিম। মা, বাবা, ভাই, আত্মীয়স্বজন সব আছে আমার। তারপরও আমি এতিম জীবনযাপন করছি। আমি যে বেঁচে আছি, আমি যে এই পৃথিবীতে এখনও টিকে আছি- তা যেন আমার বাপ, মা, ভাই বা আত্মীয়স্বজনরা কেউ জানে না। তারা কেউ আমার খোঁজ নেয় না। আমি যেন অস্পর্শ। আমার ছোঁয়া লাগলে তারা যেন অশুচি হয়ে যাবেন। জন্মদাতা বাপ মা, একই রক্তের ভাই- অথচ তারা আজ কত দূরে! আসলেই দুনিয়ায়তে কেউ কারো না। আমি তো কোনো দিন আমার সন্তানকে ভুলে যেতে পারবো না। বলতে পারবো না 'হাত ধুয়ে ফেলেছি'। জাহান্নামে যাক।
বাপ থেকেও নেই। এরচেয়ে দুঃখের আর কি আছে!
অবশ্য বহু বছর ধরেই বাপের সাথে আত্মিক সম্পর্ক নেই। দেখা সাক্ষাৎও নাই। এখন বছরে একবারও মোবাইলেও কথা হয় না। হয়তো আব্বা আমাকে রাস্তায় দেখলেও চিনতেও পারবে না। মা'র সাথে কথাবার্তা দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ। তাতে মার কিচ্ছু যায় আসে না। যে ছেলের আয় ইনকাম নাই তার কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো। এই ছেলে ভাঙ্গা কূলার ছাই। ভাঙ্গা কূলার ছাই কোনো কাজে লাগে না। ভয়াবহ স্বার্থপর হয়েছে মা। মা যে এরকম হতে পারে তা আমার ধারনার বাইরে। আমি মরে গেলেও তার কিছু যায় আসে না। ভাইদেরও কিছু যায় আসে না। বড় কঠিন সমাজ। বেঁচে থাকাই কঠিন।
ভাইয়েরা ব্যস্ত নিজেদের সংসার নিয়ে।
আমি পড়ে গেছি গ্যাড়াকলে। আমার কথা কেউ ভাবে না। ভাবার সময় নাই। আমার সমস্যা কি কেউ জানতে চায় না। কাজেই আমি ঘোষনা দিয়েছি আমি এতিম। অবশ্য এজন্য এখন আর আমার দুঃখ হয় না। অভ্যাস হয়ে গেছে। আমি আর সুরভি একা একাই থাকি। আমি ভালো আছি কিনা, আমার কোনো সমস্যা আছে কিনা- এই খোজটুকুও বাপ মা বা ভাইয়েরা নেয় না। আত্মীয়স্বজনের কথা না হয় বাদই দিলাম। আজ তো আমার জন্মদিন- আজ কি মা বাবা একটা খোজ নিতে পারতো না! কি অন্যায় করেছি আমি! কোনো অন্যায় তো করি নাই। কোনো আঘাত তো করি নাই। বরং তারা অন্যায় করেছে। তারা আঘাত দিয়েছে।
আজ তো আমার জন্মদিন ছিলো।
মা, বাবা বা ভাইয়েরা একটা ফোন তো অন্তত পক্ষে দিতে পারতো। এক মিনিট সময় কি তারা দিতে পারতো না? জন্ম দিয়েই খালাস! আর কোন দায়দায়িত্ব নেই! কোনো খোঁজ খবর নাই! কি অপরাধ করেছি আমি? যখন চাকরি করতাম। সেলারি পেয়েই সবার আগে মার হাতে খরচের টাকা দিতাম। মাসের পর মাস। এখন দিতে পারি না। তার জন্যই কি আমাকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে? তাদের মনোভাব আমি বুঝে গেছি, তারা চায় আমি বাসা ছেড়ে দেই। তাহলে তারা বাসা ভাড়া দিতে পারবে। সন্তানের চেয়ে টাকা বড়। আমি বাসা খুব শ্রীঘ্রই ছেড়ে দিবো। তারা যা চায় তাই করবো।
আজ ভাবী রান্না করেছেন।
দুপুরে এবং রাতে ভাবীর ঘরেই খেয়েছি। দুপুরে মুগডাল দিয়ে খিচুরী। সাথে গরুর মাংস আর ইলিশ মাছ ভাজা। সন্ধ্যায় চিকেন ফ্রাই করেছেন। কেক কেটেছি সন্ধ্যায়। অবশ্য গতকাল রাতেও একটা কেক কেটেছি। কেক কে এনেছে জানি না। রাতে ভাবি পোলাউ রান্না করেছেন। আর মূরগীর মাংস। অবশ্য রাতে আমার ভাত খেতে ইচ্ছা করছিলো- আলু ভাজি, ডাল আর ডিম ভাজা দিয়ে। কারন আজ খুব বেশি গরম পড়েছে। আমার ঘরে এসি নাই। ভাবীর ঘরের এসিটা সেই রকম মুহুর্তেই পুরো ঘর ঠান্ডা হয়ে যায়। ফোন করে অনেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ফেসবুকেও অনেকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কয়েকজন বন্ধু ফোন করেছিলো বাইরে তাদের সাথে দেখা করার জন্য কিন্তু যাই নি। যেতে ইচ্ছা করে নি। তারা গাল ফুলিয়েছে।
কাছের দূরের সবাইকে জানাই অনেক ধন্যবাদ।
এবং একটি কবিতার দু'টি লাইন- ''হয়তো এই পাহাড় সমান উঁচু হতে চায় কেউ, আমি মাটিতে মেশা ঘাস হতে ভালোবাসি, যার মাড়িয়ে যাওয়ার সে মাড়িয়ে যাক ঘাস- তবু ঘাসের বুকেই জমে শিশিরবিন্দু।'' সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। করোনা ভাইরাস থেকে সাবধান থাকুন। বাইরে গেলে মাস্ক মাস্ট এবং ঘরে বাইরে যেখানেই থাকুন একটু পরপর হাত ধুয়ে নেবেন। জীবন হোক আনন্দময়। আমি সবাইকে ভালোবাসি। বাবা মা, ভাই, আত্মীয়স্বজন। এমন কি রাস্তায় যে লোকটা ভ্যান গাড়িতে করে ডাব বিক্রি করে তাকেও আমি ভালোবাসি। আমার ব্যলকনি থেকে যে হুজুরটাকে দেখা যায়। সারাদিন বাসায় একা থাকে। সারারাত জেগে বসে থাকে তাকেও আমি ভালোবাসি।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ১২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

