
চ্যাংড়া বয়সে মনের মধ্যে নানান রকম ভাব আসে।
এরকম ভাব সুমনের মধ্যেও এসেছিলো। সুমন ঠিক করলো- সে কিছুদিনের জন্য দূরে কোথাও যাবে। একদম অজানা, অচেনা কোনো জায়গায়। বাসায় কিছু বলে যাবে না। বাসার লোকজন চিন্তা করলে করুক। সুমন ব্যাগ গুছানোর সময় কি মনে করে তার পাসপোর্ট আর ক্যামেরাটা সাথে নিয়ে নিলো। ভারতের ভিসা লাগানো আছে। সুমনের ইচ্ছা সে যাবে কোনো সুন্দর গ্রামে। মাটির পথ দিয়ে সে হাঁটবে। গ্রামের মানুষ গুলো হবে সহজ সরল। সুমন কমলাপুর রেলস্টেশনে চলে এলো। যে ট্রেনটা সবার আগে ছাড়বে সেটাতেই টিকিট কেটে উঠে পড়বে, এরকমই তার ইচ্ছা।। ট্রেন চলছে। তার খুব ভালো লাগছে। চলতি ট্রেন থেকে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে কি যে ভালো লাগে! সুমনের মনে হচ্ছে সে সব কিছু ফেলে রেখে দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে!
সুমন জানে না ট্রেন কোথায় গিয়ে থামবে।
ট্রেন থামলো বেনাপোল। সুমন ট্রেন থেকে নেমে কিছু খেয়ে নিলো। সে ক্ষুধা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। বেনাপোল সুমনের ভালো লাগছে না। সে পাঁচ শ' টাকা ভ্রমন কর দিয়ে ইন্ডিয়া ঢুকে গেলো। বনগাঁ রেলস্টেশনে সুমন দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশন ভরতি মানুষ আর মানুষ। একটা ছোট ট্রেন এলো। স্টেশনের সমস্ত লোকজন সেই ট্রেনে উঠতে চেষ্টা করছে। এমন ধাক্কাধাক্কি করে সুমনের পক্ষে ট্রেনে উঠা সম্ভব না। সে একটা বাসে উঠে পড়লো। বাস কোথায় গিয়ে থামবে সে জানে না। জানার দরকারও নেই। টানা দুই, আড়াই ঘন্টা বাস চললো। বাসের সব যাত্রীর সাথে সুমন নদীয়া জেলায় নামলো। চারিদিকে গ্রাম আর গ্রাম। প্রচুর গাছপালা। প্রচুর ধানী জমি। খাল-বিল, পুকুর সবই আছে। একদম আদর্শ গ্রাম। আসলে গ্রাম মানুষদের অদৃশ্য ভাবে টানে।
বিকেল হয়ে গেছে। কৃষকরা ঘরে ফিরছে।
সুমন বড় রাস্তায় বসে আছে। পড়ন্ত বিকেল তার কাছে ভালো লাগছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। সে এর আগে কখনও নদীয়া জেলায় আসেনি। একজন ভ্যান নিয়ে সুমনের কাছে এসে থামলো। লোকটা বলল, আসুন আমার সাথে। আমি আপনাকে নিয়ে যাবে। সুমন বলল, আপনি কে? আমার নাম আলী। আমি ভ্যান চালাই। সুমন ভ্যানে উঠে বসলো। মাটির রাস্তা দিয়ে ভ্যান চলছে। ভ্যান চালক আলী বলল, আমাদের গ্রামখানি আপনার খুব ভালো লাগবে। একদম ছবির মতো সুন্দর আমাদের গ্রাম। এ গ্রামের কেউ ঝগড়া করে না। এ গ্রামে সবাই সবাইকে ভালোবাসে। সুমন বলল, আপনাদের গ্রামের নাম কি? আলী বলল, আমাদের গ্রামের নাম আনন্দপুর। এই গ্রামে মানুষের কোনো দুঃখকষ্ট নেই।
একটা ছোট বাড়িতে সুমন উঠলো।
সবে সন্ধ্যা অথচ চারিদকে গাঢ অন্ধকার। বিদ্যুৎ নেই। হারিকেন'ই ভরসা। সমানে ঝিঝি পোকা ডাকছে। সুমন চাপকল চেপে বালতি ভরলো। সেই পানিতে অনেক সময় নিয়ে গোছল করলো। চাপকলের পানি অনেক ঠান্ডা হয়। কারন এই পানি আসে মাটির গভীর থেকে। গোছল শেষ করে সুমন উঠানে বসলো। ভ্যানচালক আলী তাকে বাতাসা আর মুড়ি খেতে দিলো। বলল, রাতের খাবার দেরী হবে। আপাতত এগুলো খান। রান্না বসিয়েছি মাটির চুলায়। সাদা ভাত আর মূরগী। দেশী মূরগী। বাতাসা, মুড়ি খেয়ে বেশ আরাম পেলো সুমন। পিতলের গ্লাসে পানি খেলো। তার পেট ভরে গেছে রাতে না খেলেও চলবে। গতকাল সে ছিলো নিজের ঘরে। আর আজ সে হাজার মাইল দূরে। সম্পূর্ন অপরিচিত জায়গায়। অপরিচিত মানুষজন। তার মন্দ লাগছে না।
খুব ভোরে সুমনের ঘুম ভাঙ্গলো।
রাতে চমৎকার ঘুম হয়েছে। আনন্দপুর গ্রামে সুমন হাঁটতে বের হলো। সাথে ক্যামেরা নিতে ভুললো না। অতি চমৎকার গ্রাম। একদম খাটি গ্রাম। কি সুন্দর মাটির রাস্তা। রাস্তার দু'পাশে বিশাল বিশাল ধানক্ষেত। এত বড় বড় ক্ষেত যে ক্ষেতের শেষ মাথা আর দেখা যায় না। কৃষকরা তাদের গরু নিয়ে বের হয়ে গেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। কয়েকজন বুড়ো লোক হাঁটতে বের হয়েছেন। একটা চায়ের দোকান মাত্র'ই খুলল। চায়ের দোকানদার হাসিমুখে বলল, বাবু বাড়ি ফেরার পথে চা খেয়ে যাবেন। আমি চা খুব ভালো বানাই। এই অঞ্চলে আমার চায়ের ব্যাপক সুনাম আছে। সুমন মাথা নাড়লো। সুমনের দারুন লাগছে। এর মধ্যেই সুমন অনেক গুলো ছবি তুলে নিলো। সুমনের ধারনা ছবি গুলো খুব ভালো হয়েছে। একটা ভালো ছবি তুলতে পারলে মনটা খুশিতে ভরে যায়!
সুমনের সাথে রাস্তায় একটা মেয়ের সাথে দেখা হলো।
মেয়েটা দারুন সুন্দরী। সহজ সরল সুন্দর। মেয়েটা একটু সাজেনি। চোখে কাজলও দেয়নি। গ্রামের সহজ সরল একটা মেয়ে। অতি সাধারণ একটা নীল সেলোয়ারকামিজ পরে আছে। তবে ওড়নাটা হলুদ রঙের। মেয়েটার মাথা ভরতি চুল। হাতে বেশ কয়েকটা কাঁচের চুড়ি। সুমন মুগ্ধ হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে! মেয়েটা বলল, এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? এর আগে কি কোনো মেয়ে দেখেন নি। সুমন বলল, অনেক মেয়ে দেখেছি। তবে তারা তোমার মতো সহজ সরল সুন্দর নয়। এই যে তুমি পাউডার মাখনি, চোখে কাজল দাওনি, ঠোঁটে লিপস্টিক দাওনি অথচ তোমাকে দেবীপ্রতিমার মতো লাগছে। গ্রামের সমস্ত সরলতা, সৌন্দর্য তোমার মধ্যে চলে এসেছে। তাই তোমার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। তোমাকে দেখে মন ভরছে না। স্বাদ মিটছে না।
মেয়েটা সুমনের কথা শুনে খিল খিল করে হাসছে।
সুমন বলল, তোমার হাসিটাও সুন্দর। খুব সুন্দর। আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি, জীবনে কোনো পাপ তোমাকে স্পর্শ করেনি। তোমার চোখে মুখে স্বচ্ছতা আর পবিত্রতা খেলা করছে। মেয়েটা সুমনকে অবাক করে দিয়ে সুমনের ঠোটে চুমু দিয়ে বসলো। সুমন বলল, তোমার চুমুর স্বাদও ভীষন মিষ্টি। সুমন বলল, আমাকে বিয়ে করবে? মেয়েটা বলল, বিয়ে করতে পারি, তবে একটা শর্ত আছে। বিয়ের পর তুমি আমার সাথে এই আনন্দপুরেই থেকে যাবে। সুমন বলল, তা তো সম্ভব না। আমার বাবা মা আছেন। ভাইবোন আছে। তাদের ছেড়ে থাকাটা সম্ভব নয়। তোমাকে বিয়ে করে শহরে নিয়ে যেতে পারি। মেয়েটা বলল, আমি কখনও আনন্দপুর ছেড়ে কোথাও যাবো না। নো নেভার। সুমন চিন্তায় পরে গেলো!
(দ্বিতীয় পর্ব আগামীকাল)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ৩:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

