
ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে কিশোর গ্যাং রয়েছে।
এই কিশোর গ্যাং ছাত্রলীগের মতোই ভয়ঙ্কর। প্রতিটা ছোট বড় শহরে এমনিতেই সমস্যার শেষ নেই। জলাবদ্ধতা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সমস্যা, চুরী ছিনতাই, রাজনৈতিক সমস্যা, খেলার মাঠ গুলো দখল হয়ে গেছে। সব সমস্যাকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে- কিশোর গ্যাং সমস্যা। বাংলায় একটা কথা আছে, 'পীপিলিকার পাখা গজায়, মরিবার তরে'। এইসব গ্যাং নানান অপকর্ম করে বেড়ায়। তারা গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খায়। গাজা খায়, ইয়াবা খায়। ফেনসিডিল খায়, মদ খায়। এবং বিশেষ দিন গুলোতে একটা মেয়ে ভাড়া করে নিয়ে আসে সারারাত ফুর্তি করে। এদের মূখের ভাষা অতি কুৎসিত। এদের জামা কাপড় আর মাথার চুলের স্টাইল বিশ্রী। এরা কেউ কেউ বিকট শব্দে বাইক চালায়। মেয়েদের বিরক্ত করে। মেয়েদের স্কুল কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। শপিং মল গুলোতে সুযোগ পেলেই মেয়েদের গায়ে হাত দেয়। এই সব গ্যাং এ অনেক কিশোরী মেয়ে সদস্যও আছে। মেয়ে গুলোও নেশা করে। এই কিশোর গ্যাং' এর সদস্যদের দেখলেই চেনা যায়।
দুই হাজার সালের পর থেকেই এ সমস্ত গ্যাং সৃষ্টি হতে শুরু করে।
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় দুটি অ্যাপস টিকটক (TikTok)। প্রতিটা কিশোর গ্যাং এর সদস্যদের এখানে একাউন্ট আছে। তারা তাদের সমস্ত প্রতিভা এখানে ব্যয় করে। এই অ্যাপস গুলো চাইনিজ কোম্পানি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পৃথিবীর অনেক দেশেই এই অ্যাপস গুলো ব্যান করা হয়েছে। অ্যাপস গুলো মানুষের মস্তিষ্কে এমন ভাবে প্রভাব ফেলে যা তার অরিজিনাল ক্রিয়েটিভিটিকে নষ্ট করে দেয়। অনেক ডাক্তার, ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী, গৃহীনি, দোকানদার, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে টোকাই, রিকশাচাক এবং সবজি বিক্রেতা সবাই টিকটক করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছে। কিছুদিন পরপর তারা সবাই মিলে একসাথে দেখা করে, আনন্দ করে।
জ্ঞানহীন, বিবেকহীন, নষ্টামি জাতীয় ভিডিও বানিয়ে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে শুধুমাত্র সামান্য একটু ফেমাস হওয়ার আশায়। এই এপ্স গুলোকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে কিশোর গ্যাং। চায়নাতে এই অ্যাপস গুলো তৈরি হলেও সে দেশে ব্যান (নিষিদ্ধ)। কারণ তারা জানে এইগুলা মানুষের মস্তিষ্কে বিকৃতি সৃষ্টি করে। জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য মেয়েরা এখানে ভয়াবহ নোংরামি করছে। বুক বের করে রাখে, পেট বের করে রাখে, হিন্দি সিনেমার আইটেম গার্লদের থেকেও খারাপ আচরন করছে। আমি ভেবে পাই না, এদের বাপ মা এদের খোজ খবর রাখছে না কেন?
বাংলাদেশের সব এলাকাতে যেমন মাদক পাওয়া যায়-
তেমনি সমস্ত বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং আছে। এই কিশো গ্যাং গুলো ছিনতাই করে। তারা খুবই নির্দয় এবং বেপরোয়া। সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি দেখে তারা অনেক কিছু শিখে এবং সে মোতাবেগ জীবনযাপন করতে চেষ্টা করে। এরা লেখাপড়া করে না। করলেও তাদের লেখাপড়ায় মন নেই। এদের বাপ মা এদের খোজ খরব রাখেন না। ধরুন আপনি- স্ত্রী, বান্ধবী বা কোনো মেয়ে বন্ধুর সাথে রেস্টুরেন্ট বা পার্কে গেলেন। হঠাৎ দেখবেন আপনার চারপাশে একদল ছেলের আবির্ভাব। এরা কিন্তু একটা গ্যাং। দেখবেন আপনাদের নিয়ে নানান রকম আজেবাজে কথা বলছে, বাজে ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসলে ওরা চাইছেই আপনাকে উত্তেজিত করে একটা ঝামেলায় পাকাতে। এতে ওদের লাভ। সেটা কিরকম? ধরা যাক, আপনি মাথা গরম করে ঝামেলায় জড়ালেন। ওরা আপনাকে অপমান করেছে বলে আপনি পাল্টা কিছু বললেন বা করলেন। এই পেয়ে গেলো সুযোগ। ওরা তখন বাইরে থেকে নেতা গোছের কাউকে ধরে আনবে। যিনি এসেই আপনাকে আপনার বান্ধবীর সামনেই নানান রকমভাবে জেরা করবে। তারপর বিচারে আপনাকেই দোষী বানিয়ে দেবে। অত:পর মিটমাট করার নাম করে আপনার কাছ থেকে জরিমানা বাবদ টাকা পয়সা কিংবা দামী ঘড়ি, ফোন অথবা ল্যাপটপটা রেখে দেবে। প্রতিদিন ঢাকা শহরে কোথাও না কোথাও এরকম ঘটনা ঘটছেই।
বর্তমানে কিশোর গ্যাং একটা ট্রেন্ড।
সবাই গুন্ডামি করছে, গ্যাং বানাচ্ছে, দেয়ালে দেয়ালে স্প্রে দিয়ে গ্যাংয়ের নাম লিখছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেয়ালে দেয়ালে অনেক কিশোর গ্যাংয়ের নাম লেখা গ্রাফিতি চোখে পড়বে। ধানমন্ডি আর পুরান ঢাকায় আমি বেশ কয়েকটি সড়কে অন্ততঃ ২০টি কিশোর গ্যাংয়ের নাম দেখতে পেয়েছি। স্কুলে পড়তে গিয়ে কিংবা এলাকায় আড্ডা দিতে গিয়ে শুরুতে মজার ছলে এসব গ্যাং তৈরি হলেও পরে একসময় মাদক, অস্ত্র এমনকি খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়ছে। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। সামাজিক অবক্ষয়, সমাজ পরিবর্তন এবং সমাজের নানাবিধ অসঙ্গতি এবং অস্বাভাবিকতায় খেই হারিয়ে ফেলছে সমাজের কিশোর এবং তরুণেরা। বিগ বস, নাইন এমএম, নাইন স্টার, ধর, ডিসকো বয়েজ, লাগা, লাভার, দেশী বয় ইত্যাদি নামে গড়ে তুলছে অদ্ভূত এবং মারাত্মক ‘কিশোর গ্যাং’। একটি বাচ্চা অসৎ পথে যাওয়ার পেছনে সম্পূর্ন দায়ভার অভিভাবকের। জন্ম দিয়ে বাপ মা ছেড়ে দিয়েছে। এদের সবার আগে বাপ মায়ের শাস্তি হওয়া উচিত। জন্ম দিয়েছে কিন্তু মানুষ করেনি বলে। আরে জন্ম তো কুত্তাও দেয়। তুমি সন্তানকে মানুষ করতে পারবে না তাহলে জন্ম দিলে কেন? এখন তোমকে শাস্তি পেতে হবে।
সেদিন পত্রিকাতে পড়লাম- 'নারায়ণগঞ্জে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং'।
নারায়ণগঞ্জের ইস্পাহানি ঘাট এলাকায় দুটি কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষের সময় পানিতে ডুবে মারা যায় দুই কিশোর ছাত্র, একজন দ্বাদশ শ্রেণির, অন্যজন নবম শ্রেণির। এই বয়সেই কিশোর গ্যাং এর সদস্যদের বাইক আছে। এবং এই বাইক তারা সুন্দরভাবে চালায় না। এক বাইকে তিনজন উঠে এবং চিৎকার চেচামেচি করতেই থাকে। সমাজে ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না, ইভটিজিং- এর শাস্তি হয় না, মাদক সম্রাট দেশ দরদি আখ্যা পায় সেই সমাজে অপরাধ বাড়বেই এইটা স্বাভাবিক। একজন শিশু, শিশু বয়স থেকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, খেলাধূলা, থিয়েটার, সংগীত, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত থাকে, যদি তার মনস্তাত্ত্বিক জায়গা বুঝে তাকে গড়ে তোলা হয়, তবে তার কৈশোর ভালো কাটবে, আর কৈশোর ভালো কাটলে তার তারুণ্য হবে সবচেয়ে ফলপ্রসূ। দেশজুড়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে এই গ্যাং কালচার। এরা ভবিষ্যতে ছাত্রলীগকে ছাড়িয়ে যাবে। আগে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরগুলোতে এই কালচার থাকলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে ছিমছাম-নিরব জেলা উপজেলা গুলোতেও।
এই ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২০০ কিশোর গ্যাং রয়েছে।
ফেসবুকে তারা উদ্ভট উদ্ভট সব নাম দিয়ে খুলেছে নানান রকম গ্রুপ। এই সমস্ত কিশোর গ্যাং এর সদস্যরা ১০০% বখাটে। কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে এখন বড় ভয়ঙ্কর অবস্থা। আগে তারা বখাটেপনা বা মেয়েদের উত্যক্ত করত। এখন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আগে অপরাধ করলে অপরাধীরা ভয়ে থাকত। আর এখন অপরাধীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ ভয়ে থাকে। আমিও তো একসময় কিশোর ছিলাম। ভয়ঙ্কর তো ছিলাম না। সকালে স্কুলে যেতাম। দুপুরে ভাত খেয়ে ঘুমাতাম। বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলতে যেতাম। আমি ফুটবল খুব ভালো খেলতাম। একবার আমার পায়ে বল আসলে, আর রক্ষা নাই। নিশ্চিত গোল। আবার আমি গোলকিপার থাকলেও জীবন দিয়ে দিতাম কিন্তু গোল হতে দিতাম না। যতই খেলাধূলা করি না কেন মাগরীবের আযানের সাথে সাথে বাসায় চলে আসতাম। হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসতাম। পড়ার কথা বাপ মাকে বলতে হতো না।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৫:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

