
ছবিটি মোহনার। মোহনা পাঠিয়েছে।
আমি মোহনাকে দেখতে চেয়েছিলাম। মোহনা এই ছবিটি পাঠিয়েছে। ছবিতে মোহনাকে দেখা যাচ্ছে না। মোহনা ইচ্ছা করেই এমন ছবিটা দিয়েছে। সে চায় না, আমি তাকে দেখি। মোহনা আমাকে শাস্তি দিচ্ছে। সতের বছর আগে মোহনাকে শেষ দেখেছিলাম। ঈশ্বর মোহনাকে সব কিছুই দিয়েছিলেন- রুপ, গুন। কিন্তু সুখ দেন নি। যেটার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো মোহনার। আমি শুধু এটুকুই জানি এখন মোহনা টরন্টো থাকে। একা। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই কোনো চাকরি করছে। দেশে তার কেউ নেই, তাই বাকি জীবনটা সে টরন্টোতে কাটিয়ে দেবে। হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষেরা আসলে হারিয়ে যায় না। তারা ফিরে ফিরে আসে। এই ফিরে আসাটা ভালো না মন্দ তা আমি জানি না।
একবার আমরা কুয়াকাটা গিয়েছিলাম।
ঢাকা থেকে দুরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার। অবশ্য বরিশাল থেকে খুব কাছে মাত্র ১০৮ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে আমি আর মোহনা বাসে করে গিয়েছিলাম। তখন রাস্তাঘাট খুব উন্নত ছিলো না। ১৪ ঘন্টার বেশি সময় লেগেছিলো। আমি মোহনাকে বলেছিলাম, চলো লঞ্চে করে যাই। লঞ্চ নাকি তার ভালো লাগে না। আমি বলেছিলাম কেবিন নিবো। কেউ বিরক্ত করতে পারবে না। মোহনা আমার কথা শুনে নি। বাসে মোহনা আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। তখন আমার নিজেকে রোমের সম্রাট বলে মনে হয়েছিলো। আমার মনে আছে- হোটেল নীলাঞ্জনায় উঠেছিলাম আমরা। রুমের জানালা দিয়ে সমুদ্র সৈকত দেখেছিলাম আমরা। কি বাতাস ছিলো সেদিন! তিনদিন ছিলাম আমরা একসাথে ছিলাম। প্রায় পুরো কুয়াকাটা ঘুরে বেরিয়েছি। বৌদ্ধ মন্দির, মিষ্টি পানির কূপ, ঝাউ বন, বার্মিজ মার্কেট, শুটকি পল্লী, ঝিনুক বীচ সবই দেখে ফেলেছি। কিছুই বাদ দেইনি।
মোহনা ছিলো বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান।
আমার ধারনা মোহনার মায়ের জন্য তার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। মোহনার মা জোর করে মোহনার বিয়ে দিয়ে দেয় এক দুষ্টলোকের সাথে। সেই বিয়ে এক বছরও টিকে নি। মোহনা বিয়েটা করতে চায় নি। কারন তখন তার লেখাপড়া শেষ হয় নি। মোহনার স্বামী ছিলো বিরাট বদ। মদ খেতো, আবার মদ খেয়ে মোহনাকে খুব মারতো। মোহনা নিজে আমাকে একদিন কাঁদতে কাঁদতে এই কথা বলেছিলো। সেদিন আমার ইচ্ছা করছিলো- মোহনার বদমাইশ স্বামীকে খুন করে ফেলি। সেদিন মোহনা আমার বুকে তার মাথা রেখেছিলো। আমি মোহনাকে আশ্রাস দিয়েছিলাম, আমি আছি তোমার সাথে। তোমার কোনো ভয় নেই। অথচ আমি কথা রাখতে পারি নি। মোহনার বিপদের সময় তার পাশে থাকতে পারি নি।
প্রথমে মারা গেলেন মোহনার মা।
তার এক বছর পর মোহনার বাবা মারা গেলেন। তারপর মোহনা কানাডা চলে গেলো। এবং আমার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখলো না। আমি অনেক চেষ্টা করেও মোহনার সাথে যোগাযোগ করতে পারি নি। খুব অভিমানী একটা মেয়ে। এই অভিমানী মেয়েটাকেই আমি জীবনে প্রথম চুমু খাই। তার বুকে মাথা রাখি। মেয়েটা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেছিলো আমাকে। মেয়েটা নিজেকে সম্পূর্ন মেলে দিয়েছিলো আমার কাছে। আমিও আমার স্বচ্ছ পবিত্র ভালোবাসা আর সমস্ত মেধা, সমস্ত ভালোত্ব দিয়ে মোহনাকে কাছে টেনে নিয়েছিলাম। আমরা দুজন দুজনের মধ্যে ডুবে ছিলাম দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী। কত না আনন্দময় সময় কাটিয়েছি একসাথে। অথচ সেইসব দিন গুলোর কথা বেমালুম ভুলে গেছি আজ। যোগাযোগ করার কত রকম মাধ্যম আছে, অথচ মোহনা ইচ্ছা করেই হারিয়ে গেলো। এতকাল পরে সে কেন যোগাযোগ করলো!
গতকাল সারারাত মোহনার কথা ভেবেছি।
অথচ সুরভি আমার পাশে। স্ত্রীকে পাশে রেখে অন্য মেয়ের কথা ভাবা নিশ্চয়ই পাপ। মাঝে মাঝে পাপ করতে ইচ্ছা করে। পৃথিবীর আসল মজাই পাপে। এত বছর পর গতকাল মোহনা আমার সাথে যোগাযোগ করেছে। বহু বছর আগের কথা সব ছবির মতো স্পষ্ট মনে পড়ে গেলো আমার। বুকের মধ্যে কি উথালপাতাল! কি ঝড়! মোহনা কেন এত বছর পর যোগাযোগ করতে গেলো! সে তো ইচ্ছা করেই হারিয়ে গিয়েছিলো। আমি মোহনাকে বলেছি, আমি আসবো তোমার সাথে দেখা করতে। সে মানা করেছে। যতই মানা করুক আমি যাবো। কাছে গেলে ফিরিয়ে দিতে পারবে না, জানি আমি। সেই সাহস বা শক্তি মোহনার নেই। আমি জানি। সুরভি মোহনার কথা কিছুই জানে না। আমি জানতে দিবোও না। সেটা ভালো দেখায় না। কিছু কিছু ঘটনা গোপন রাখলেই সংসারে শান্তি থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ডিসেম্বর, ২০২০ দুপুর ২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


