
লঞ্চে করে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি।
আমি আর আব্বা। ডিসেম্বর মাস বার্ষিক পরীক্ষা শেষ আমার। হাতে অনেক সময়। আব্বা বললেন, চল ঘুরে আসি। অনেকদিন তোর দাদা দাদীকে দেখি না! আমার অন্য ভাইরা গেলো না। কারন গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। এখন আমাদের গ্রামের বাড়ি যেতে দেড় ঘন্টা সময়ও লাগে না। চমৎকার রাস্তা হয়েছে। কিন্তু সেই সময় ৬/৭ ঘন্টা সময় লাগতো। ছোট একটা লঞ্চ। লঞ্চ ভরতি নানান রকম মানুষ। নানান রকম হকার। কেউ ডিম সিদ্ধ বিক্রি করছে, কেউ বাদাম, কেউ ঝালমুড়ি। একজনকে দেখলাম লঞ্চে দুটা ছাগল নিয়ে উঠেছে। আব্বা আমাকে নিয়ে লঞ্চের ছাদে গেলেন। একটা পরিস্কার চাদর পেতে দিলেন। আব্বা চাদরে বসে বললেন, তুই আমার কোলে মাথা রেখে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে থাক। আকাশ দ্যাখ।
বিশাল পদ্মা নদী।
ছোট্র একটা লঞ্চ ধীরে ধীরে, দুলে-দুলে চলছে। হঠাত আকাশ কালো করে মেঘ জমতে শুরু করলো। মুহুর্তে চারিদিক অন্ধকার হয়ে এলো। নদী উথালপাতাল করছে খুব। মনে হচ্ছে যেন লঞ্চ ডুবে যাবে। লঞ্চের সারেং বলছে ঝড় শুরু হবে। বিরাট ঝড় হবে। সবাই আল্লাহকে ডাকেন। আমার কিচ্ছু করার নাই। লঞ্চের মধ্যে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেলো। কেউ কেউ নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো। কেউ কেউ চিৎকার করে আল্লাহ আল্লাহ করছিলো। আমার আব্বা আমাকে কোলে নিয়ে বিভিন্ন মানুষজনের কাছে গিয়ে বলছে, আমার ছেলেটাকে বাচান। আমি সাঁতার জানি না। কেউ আমাকে নিতে রাজী হলো না। প্রচণ্ড বিপদের সময় কেউ কাউকে সাহায্য করে না। বিপদের সময় নিজে বেঁচে থাকাটাই বড় কথা।
আব্বা যাকে সামনে পাচ্ছে, বলছে- আমার ছেলেটাকে বাঁচান।
আব্বার অস্থিরতা দেখে এক হুজুর এসে বললেন, আমি সাঁতার জানি ভাইসাহেব। আপনি আপনার ছেলেকে আমার কাছে দেন। আপনাকে কথা দিলাম- এই ঝড়ে যদি লঞ্চ ডুবে যায়, আমি আপনার ছেলেকে বাঁচাবো। আমি যেভাবেই হোক সাঁতার কেটে তাকে তীরে পৌছাবো। আব্বা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে হুজুরের কোলে তুলে দিলেন। আমার কপালে চুমু দিলেন। আব্বা হুজুরকে বললেন, আমার বাড়ি কামার গাঁ। খান বাড়ি। হুজুর বললেন, আমি পৌঁছে দিবো। কথা দিলাম।
আজ সকালে গ্রামে গেলাম।
আব্বার কবরটা দেখে এলাম। কবরের পাশে কিছুক্ষন বসে থাকলাম। আব্বাকে কি আমাকে দেখতে পেয়েছেন? আগামী শুক্রবার গ্রামের বাড়িতে দোয়া মাহফিল হবে আব্বার জন্য। সমস্ত গ্রামের মানুষকে বলা হয়েছে। আমাদের এলাকায় চারটা এতিমখানা আর মাদ্রাসা আছে। ওদের সবাইকে আসতে বলা হয়েছে। ওরা কোরআন খতম দিবে। মানে ধর্মীয় যেসব নিয়ম কানুন আছে- সবই পালন করা হবে। মোট দুই হাজার মানুষের খাবারের আয়োজন করা হবে। ঢাকা থেকে বাবুর্চি যাবে। রান্না কোথায় হবে, সামিয়ানা কোথায় হবে, চেয়ার টেবিল কোথায় বসবে সব দেখিয়ে দিলাম।
সব কাজ দেখাশোনা করবেন আমার চাচা ফুপুরা।
গতকাল মিটিং হয়েছে। আব্বার কাছে চারজন লোক টাকা পায়। সব মিলিয়ে দুই লাখ টাকার মতোন। শুক্রবার তাদের আসতে বলা হয়েছে। তাদেরকে টাকা দিয়ে দেওয়া হবে। অনেকে জানিয়েছেন- তারা আব্বার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। আমরা বলেছি, সেই টাকা ফেরত দিতে হবে না। আব্বার জন্য দোয়া করে দিবেন। গতকাল মিটিং এ জানতে পারলাম আব্বার সাভার এবং মানিকগঞ্জে কিছু জমি আছে। আমরা চাচাদের বলে দিয়েছি- আমাদের কিচ্ছু লাগবে না। শুক্রবারের অনুষ্ঠানের জন্য চাচাদের হাতে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি যা লাগবে চাচা ফুপুরা দিয়ে দিবেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


