
আমি বেশ ভালো আছি।
বিনা দ্বিধায় বলা যায়- আমি সব কিছু মিলিয়ে ভালো আছি। ঢাকা শহরে নিজেদের একটা ছয় তোলা বাড়ি আছে। মাস শেষে বাড়ি ভাড়ার কথা ভাবতে হয় না। বলতে লজ্জা নেই- আমাকে মোটামোটি ধনী মানুষ বলা যেতে পারে। বাবা-মায়ের যতটুকু সম্পত্তি আছে বা পেয়েছি তাতে আমার জীবনটা হাসিখুশি ভাবে পার করে দেওয়া সম্ভব। হ্যাঁ পায়ের উপর পা তুলে নিশ্চিন্ত মনে এই জীবনটা পার করে দিতে পারি। অর্থের চিন্তা আমাকে না করলেও হয়। কিন্তু আমি পরিশ্রমী মানুষ। অলসভাবে জীবন কাটাতে চাই না। তাই আমি চাকরী করছি। মুরুব্বীরা বলেন, বসে খেলে রাজার ধনও ফুরিয়ে যায়। তবে বাবা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সম্পদ দিয়ে আমার একটা জীবন সুন্দর চলে যাবে। তিনবেলা প্রিয় খাবার গুলো সামনে নিয়েই খেতে বসি।
বাজার করতে আমি পছন্দ করি।
নিজের পরিবারের জন্য আমি সব সময় বাজারের সেরা জিনিসটাই কিনি। দুই হাত ভর্তি করে বাজার করতে আমার খুব ভালো লাগে। প্রতিটা ফল আমি বেছে বেছে কিনি। ভোরবেলা টাটকা শাক সবজি কিনি। এমন কি ভালো মাছের সন্ধানে এক বাজার থেকে আরেক বাজারে ঘুরে বেড়াই। গরুর মাংসের কেজি ৬০০ শ' টাকা। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যদি গরুর মাংসের কেজি দুই হাজার টাকাও হয় তাতেও আমার কিছু যায় আসে না। মাংস খেতে ইচ্ছা করলে আমি কিনবো। টাকা কোনো সমস্যা নয়। আমি অভাবী মানুষ নই। আমি আমাকে নিয়ে ভাবি না। আমি ভাবি দেশের সাধারণ মানুষের কথা, দেশের দরিদ্র মানুষের কথা। তাঁরা কি পারবে দুই হাজার টাকা দিয়ে এক কেজি মাংস কিনতে? দরিদ্র মানুষের কথা ভেবে ভেবে আমার মন খারাপ হয়।
আমি একজন সুখী মানুষ।
আমার ছোট কন্যা ফারাজা। তাকে যখন কোলে নিই- আমি অনুভব করি আমি একজন সুখী মানুষ। এবং আমার আর কিছু চাওয়া- পাওয়ার নেই। কন্যাকে নিয়ে আমি আমার একটা জীবন সুন্দর ভাবে পার করে দিতে পারবো। ফারাজা আমার পাশেই ঘুমোয়। বাম পাশ ফিরে, বাম হাত বাম গালের উপর রেখে। কি যে মায়া লাগে তখন কন্যার জন্য। অজানা ভুবনের এক আনন্দে আমার চোখে পানি চলে আসে। যখন অফিস থেকে বাসায় ফিরি- কখনও খালি হাতে বাসায় ফিরি না। পরিবারের জন্য কিছু না কিছু কিনে দুই হাত ভরে বাসায় ফিরি। আজ কিনলাম ফল। ফারাজা নিয়মিত আপেল আর নাসপাতির জুস খায়। সুরভির জন্য কিনলাম আলুর বিস্কুট। আলুর বিস্কুটটা সুরভি খুব পছন্দ করে। পরীর জন্য কিনলাম মালটা। আমার জন্য নিলাম- চকলেট বিস্কুট।
আমাদের একটা গাড়ি আছে।
আমি সাধারনত গাড়ি ব্যবহার করি না। তবে সুরভিদের বাড়ি গেলে গাড়ি নিয়ে যাই। কারন বাচ্চাদের নিয়ে বাসে বা সিএনজি'তে যাওয়া নিরাপদ নয়। আমি একা গেলে ৩০ টাকা দিয়ে আয়াত বাসে করে মিরপুর চলে যেতাম। সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ছোট কন্যার কপালে একটা চুমু দিয়ে বের হই। বাসায় ফিরেই ফ্রেশ হয়ে ফারাজাকে কোলে নিই। ফারাজা খুশিতে লাফাতে থাকে। শক্ত করে আমাকে ধরে রাখে। পরীর সাথে অনেকক্ষন গল্প করি। রাতে ঘুমানোর আগে চায়ের মগ হাতে নিয়ে সুরভির সাথে ব্যলকনিতে বসে অনেকক্ষন গল্প করি। শুক্রবার ছুটির দিনে সুরভিকে নিয়ে বাসার কাছেই ফুসকা খেতে যাই। ফুসকা খেয়ে আধা ঘন্টা দুজন মিলে হাটাহাটি করি। বাসায় ফেরার আগে দুজন মিলে চকবার আইসক্রীম খাই। মোটামোটি জীবনটা হেসে খেলে আনন্দ নিয়েই পার করছি। আমার জীবনটা সুন্দর হয়েছে সুরভির জন্য। জীবন সঙ্গিনী ভালো হলে জীবন সুন্দর হয়।
করোনা কালের শুরুতে আমার চাকরী চলে গেলো।
তাতে আমার কিছুই হয়নি। বরং পরিবারকে বেশি সময় দিতে পেরেছি। আমি সারা জীবন চাকরী না করলেও আমাকে একবেলা না খেয়ে থাকতে হবে না। আমাকে মোটামোটি একজন ধনী মানুষ বলা যেতে পারে। করোনা কালে আমি বহু অসহায় আর দরিদ্র মানুষদের সাহায্য সহযোগিতা করেছি। পরিচিত মানুষদের মধ্যে যারা বিপদে পরেছে আমি তাদের নিজ থেকেই সাহায্য করেছি। দরিদ্র মানুষদের সাহায্য সহযোগিতা করা এটা আমাদের বংশগত। আমার দাদা গ্রামের অসংখ্য মানুষকে ঘরবাড়ি করে দিয়েছেন। বহু মানুষকে জমি দান করেছেন। গ্রামের বহু দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। দাদার পাসপোর্টে লেখা ছিলো ল্যান্ড লর্ড। আমার আব্বাকে দেখেছি কারো বিপদে সব সময় এগিয়ে যেতে। আমি তো আমার বাপেরই সন্তান। জমিদারের রক্ত আমার শরীরে। মানুষের জন্য কিছু করতেই ভালো লাগে।
দয়া করে কেউ ভাববেন না আমি অহংকার দেখাচ্ছি।
অহংকার এক জিনিস যা আমার মধ্যে ছিটাফোটাও নেই। আমি মানুষকে ভালোবাসি। মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসা মাদার তেরেসার চেয়ে কম নয়।। ফুটপাতে এক জুতো বিক্রেতার সাথে আমার বেশ ভালো খাতির। প্রতি শুক্রবার সে আইডিয়াল স্কুলের কাছে ফুটপাতে জুতো বিক্রি করে। আমি তার কাছে মাসে একবার যাই। ফুটপাতের এক কোনায় বসে তার সাথে চা খাই, টুকটাক নানান বিষয় নিয়ে আলাপ করি। ভালো লাগে। ব্যাংকের এক এমডি আছেন। আমার সাথে বেশ ভালো খাতির। উনি বেশির ভাগ সময়ই দেশের বাইরে থাকেন। দেশে এলে আমাকে ফোন করে ডাকেন। আমি যাই তার সাথে গল্প করতে। এই অভ্যাসটা পেয়েছি আমি আমার আব্বার কাছ থেকে। আব্বা মারা গেছে। আর দুই মাস পর এক বছর হয়ে যাবে। আব্বা বেঁচে থাকাকালীন আমার কোনো ভয় ছিলো না। আব্বা মারা যাওয়ার পর আমি অনুভব করি- আমার মাথার উপর থেকে আকাশ সরে গেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ১২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



