
আমি একজন সুখী মানুষ।
তবে অনুভব করি মোটামটি আমি একজন দুঃখী মানুষ। কিছু দুঃখ আমার আছে। যা আমৃত্যু আমাকে বহন করে যেতে হবে। তবে আমার দুঃখগুলো গভীর গোপন। ইচ্ছা করেই আমি গোপন রাখি। কাউকে জানতে দেই না। বুঝতে দেই না। ছোটবেলায় আমি যখন একটা ইংলীশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হই, তখন আমাদের ক্লাশে একটা মেয়ে ছিলো। মেয়েটার নাম ছিলো সুকন্যা। দেখতে একদম পুতুলের মতোন সুন্দর। মেয়েটা এখন কোথায় আছে আমি জানি না। সুকন্যাকে আমার প্রায়ই দেখতে ইচ্ছা করে। মেয়েটা তার টিফিন আমাকে খাওয়াতো। আমিও খুব আগ্রহ করে খেতাম। অথচ মেয়েটাকে আমি কোনো দিন কিছু খাওয়াতে পারি নি। সেই মেয়েটার কথা মনে পড়লে আমার খুব দুঃখবোধ হয়। বুকের মধ্যে হাহাকার করে। যদি একবার মেয়েটার সাথে দেখা হতো। আচ্ছা, মেয়েটার সাথে এখন দেখা হলে কি চিনতে পারবো?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালে পড়ার আমার খুব ইচ্ছা ছিলো।
আমার বড় ভাই সেখানেই পড়েছে। কিন্তু আমার ভাগ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুটেনি। এমন কি আমার ক্যাডেট কলেজে পড়ার খুব ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু চান্স পাইনি। ক্যাডেট কলেজ সুযোগ পাওয়ার জন্য ক্যাডেল ভর্তি কোচিং করেছি। আমার মনে আছে, সে সময় খুব মন দিয়ে পড়েছিলাম। যাই হোক, মাস্টার্স শেষ করে ইচ্ছা ছিলো আমেরিকা গিয়ে পিএইচডি করবো। কিন্তু হলো না। জীবনটা ছ্যাড়াবেড়া হয়ে গেলো। পোড়া কপাল আমার। কোনো ইচ্ছাই আমার পূরন হলো না। অথচ সময় কত দ্রুত ফুরিয়ে গেলো। দুনিয়াতে যদি আরেকবার আসি, তাহলে আমার জন্য ভালো হবে। ইচ্ছা গুলো পূরন করার সুযোগ পাবো। এবার আর ভুল করবো না। আমার বাবার আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিলো। আমি হতভাগা আমার বাপের কোনো স্বপ্ন পূরন করতে পারি নি। অথচ আব্বা কোনো দিন আমকে কিছু বলে নি। বরং
বলেছে, তুমি যেমন আছো, ভালো আছো।
আমার একটা শিল্প কারখানা দেওয়ার ইচ্ছা ছিলো।
হাজার হাজার শ্রমিক আমার কারখানায় কাজ করবে। আমার কারখানায় নানান রকম পণ্য উৎপাদন হবে। সারা দেশে ছড়িয়ে যাবে আমার উৎপাদিত পণ্য। এমন কি বিদেশেও রপ্তানি হবে আমার পণ্য। একটা গার্মেন্টস দেওয়ার ইচ্ছা ছিলো। আমার ফ্যাক্টরীতে বানানো কাপড় যাবে আমেরিকা, ফ্রান্স আর জার্মানী। সেই স্বপ্নও আমার পূরন হলো না। এজন্য আমার গভীর গোপন দুঃখ বুকে বাজে। বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়! যা আমাকে যন্ত্রনা দেয়। একটা লাইব্রেরী করার ছিলো। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মতো। সেটাও হলো না। অবশ্য লাইব্রেরী করার সময় এখনও আমার আছে। নিজেকে নিজে বুঝ দেই- দেরী হোক, যায়নি সময়। নিজেকে যতই বুঝ দেই- আমি বুঝি সময় খুব দ্রুতই যাচ্ছে। একটা প্রকাশনী দেওয়ার ইচ্ছা আমার দীর্ঘদিনের। সেটা আজও করা হলো না। প্রকাশনী করতে টাকাও বেশি লাগে না। কিন্তু করা হচ্ছে না। সময় চলে যাচ্ছে। আমি তো অলস নই।
বাসা থেকে বের হলেই অসংখ্য দরিদ্র মানুষ দেখি।
চারিদিকে এত এত দরিদ্র মানুষ কিন্তু কারো জন্যই কিছু করা হয় না। রাস্তায় বের হলে অসংখ্য ভিক্ষুক হাত পাতে। কয়জনকে দেওয়া যায়? অথচ সবাইকেই দিতে ইচ্ছা করে। সবাইকে দিতে না পারার জন্য আমার মন খারাপ হয়। দুঃখ লাগে। আমার ইচ্ছা আছে একদিন এক বস্তা টাকা নিয়ে বের হবো। যত গরীব মানুষ দেখবো সবাইকে দিবো। কাউকে ফিরিয়ে দিবো না। একটা ফোটোগ্রাফী স্কুল খোলার ইচ্ছা আছে। দরিদ্র পিতা মাতার সন্তানের জন্য একটা স্কুল দিবো। সেখানে ছেলেমেয়েরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। একটা হাসপাতাল দেওয়ার ইচ্ছা আছে। আসলে এগুলো শুধু ইচ্ছা না, এগুলো আমার স্বপ্ন। এখনও কত কিছু করার বাকি, কত কিছু করার ইচ্ছা। অথচ জীবনের পয়ত্রিশ বছর পার করে ফেলেছি। আর কত দিন বাঁচবো। স্কুল, লাইব্রেরী, ফ্যাক্টরী কিছুই কি করা হবে না? এসব না করে মরে গেলে, মরেও তো শান্তি পাবো না।
আমি আমার পরিবার নিয়ে আমেরিকা চলে যাবো।
পরীকে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। পরী যাবে কানাডা। বড় ভাই, ভাবীর সাথে থাকবে। সুরভি, ফারাজা আর আমি যাবো আমেরিকা। কারন এই দেশে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব না। আমাদের দেশের মানুষ গুলো বড় বেশি বদ। কেউ কেউ একেবারে অমানুষ। এই দেশে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা যায় না। রাস্তায় বের হলেই ভিক্ষুক। মানুষ গুলো বড় বেশি জটিল আর কুটিল। এরা নিজেরাও ভালো থাকবে না, অন্যকেও ভালো থাকতে দিবে না। বিশেষ করে ঢাকা শহর হলো গজবের শহর। এই শহরে আমি থাকবো না পরিবার নিয়ে। এই শহরের মানুষ গুলো একজন আরেকজনকে ঠকাতে পারলেই খুশি হয় এবং ঠকিয়ে নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবে। সব কিছু মিলিয়ে আমি একজন মোটামোটি দুঃখী মানুষ। চাওয়া গুলো পাওয়া হয়নি। এই না পাওয়াই আমাকে দুঃখ দেয়। যন্ত্রনা দেয়। তাই মৃত্যুর আগে সমস্ত ইচ্ছা গুলো পূরন করতে হবে আমাকে। করতেই হবে। আমি একা ভালো থাকতে চাই না। আমি চারপাশের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। সেটাই আমার আসল আনন্দ।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ১২:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



