
আমাদের মহল্লায় একজন ভাবী আছেন।
তিনি দেখতে খুব সুন্দর। সব সময় খুব হাসিখুশি। ভীষন চটপটে। তার জীবন সহজ সরল সুন্দর। কোনো জটিলতা নেই। তিনি যখন আমাদের এলাকায় আসলেন আমার সাথে বেশ ভালো খাতির হয়ে গেলো। ভাবী আমাকে ডাকেন নিমাই বলে। কারন একদিন ভাবীকে কিছু নিমপাতা এনে দিয়েছিলাম। মহল্লার সব মানুষ ভাবীকে পছন্দ করে। এলাকায় কোনো অনুষ্ঠান হলে সবাই আগে ভাবী দৌড়ে আসেন। খুব সুন্দর গান করেন ভাবী। ভালো নাচতেও পারেন। হাসি তামাশা আর রসিকতায় ওস্তাদ ভাবী। মুহুর্তের মধ্যে ভাবী সবাইকে আপন করে নিতে পারেন। যার সাথেই কথা বলেন আন্তরিকভাবে কথা বলেন। ভাবীর মধ্যে কোনো জটিলতা নেই। হাসি, আনন্দে আর গল্পে ভাবীর জুড়ি নেই।
ভাবীর স্বামী হচ্ছেন সাজু ভাই।
সাজু ভাই ভালো চাকরী করেন। তাদের দুই ছেলেমেয়ে। আমি প্রায়ই ভাবীর কাছে যাই। ভাবী আমাকে নুডুলস রান্না করে খাওয়ান। চা খাওয়ান। ভাবীর রান্নার হাত অনেক ভালো। ভাবীর হাতের সামান্য মুড়িমাখাও খেতে অসাধারন লাগে। কিছু খেতে মন চাইলেই ভাবীকে বলি। ভাবী তৈরি করে বাসায় পাঠিয়ে দেন। কোনদিন দেখি নাই ভাবীকে গীবত করতে। ভাবী কারো সাথেপাচে নাই। এই শপিং এ যাচ্ছেন, এই রান্না করছেন, এই অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাচ্ছেন, এই ১৬ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছেন। এই বারবিকিউ পার্টি নিয়ে আলোচনা করছেন। সুমির বিয়েতে ভাবী নাচবেন, সেই নাচ প্যাকটিস করছেন দলবেঁধে। সবাইকে নিয়ে ভাবী বেশ মেতে আছেন। ভাবীর আশেপাশে থাকা মানে আনন্দে থাকা। দায়িত্ব নিতে ভাবী ভয় পান না।
ভাবী দারুন কেক বানান।
আমাদের বাসার প্রত্যেকের জন্মদিনে ভাবী নিজের হাতে কেক বানিয়ে দেন। ঠিক রাত বারটায় কেক নিয়ে এসে হাজির হোন। জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী বা যে কোনো উৎসবে ভাবী নিজের হাতে বিরানী রান্না করেন। আমার বিয়ের সময় ভাবী খুব খাটাখাটনি করেছিলেন। গান গেয়েছেন, নেচেছেন। যেন আমি তার আপন ভাই। যাইহোক, এই ভাবী একদিন বদলে গেলেন। অনেকখানি বদলে গেলেন। এখন সে জন্মদিনের কেক বানান না। এবং সে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, আমি আর কোনোদিন জন্মদিনের কেক বানাবো না। এবং কোনোদিন কেক কাটাকাটির মধ্যে আমি নেই। নাচ গান করবো না। হই হুল্লোড় করবো না। এগুলো করা পাপ। আমাদের ধর্মে নিষেধ আছে। এতদিন আমি ভুলের মধ্যে ছিলাম। এখন আল্লাহ আমাকে হেদায়েত করেছেন। লাখো শুকরিয়া আল্লাহর দরবারে।
ভাবী এখন নিজের বাসাতেও হিজাব পড়েন।
বাইরে গেলে বোরখা পড়েন। তিনজন মহিলার কাছে আরবী পড়েন। একজন বাসায় এসে পড়ান। বাকি দুইজন অনলাইনে আরবী শেখান। তার আরবী আপা বলেছেন, কবরের আযাব থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে বারবার সূরা মূলক পড়া। এই সূরা কবরের আযাব থেকে বাঁচাবে। ভাবী অনেক গুলো ধর্মীয় বই কিনেছেন। ঘরর কাজ সেরে ভাবী দিনরাত ধর্মীয় বই পড়েন। হাদীসের বই গুলো ভাবীর খুব বেশী পছন্দ। ভাবীর বাসায় গেলে ভাবী এখন আমার সামনেও হিজাব পড়ে আসেন। আগের মতো সেই ঝলমলে ভাব ভাবীর মধ্যে আর নেই। আমার কন্যার জন্মদিনে ভাবী এসেছিলেন কিন্তু কেক কাটার সময় সামনে ছিলেন না। বেদাত কাজে ভাবী আর নাই। থাকবেন না। এতদিন ভাবী ভুলের মধ্যে ছিলেন। এখন লাইনে এসেছেন। এখন তিনি বারবার আল্লাহর কাছে অতীতের জন্য ক্ষমা চান। জায়নামাজে বসলেই তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে।
হঠাত করে যারা ধার্মিক হয়ে যায়-
এদের বিষয়ে সাবধান হতে হয়। নব্য ধনী এবং নব্য ধার্মিকরা ভয়ঙ্কর হয়। এরা সমাজের জন্যও খারাপ। ধর্ম আমাদের হাসিখুশি ভাবীকে বদলে দিলো। প্রত্যকে বছর ভাবী ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের জন্য খিচুরী রান্না করতেন। নিজের হাতে সবাইকে বেড়ে দিতেন। নানান রকম গল্প করতেন। এখন ভাবী দূরে দূরে থাকেন। ছাদে আর বারবিকিউ পার্টি করেন না। এলাকার কোনো বিয়ে সাদীর অনূষ্ঠানে নাচ গান করেন না। স্যোসাল মিডিয়া ব্যবহার করেন না। নাটক সিনেমা দেখা বাদ দিয়ে দিয়েছেন। এমনকি ভাবী তার ছেলেমেয়েদের কে পর্যন্ত কোরআন হাদীস পড়ান। নামাজ পড়ান। ছেলেকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে মাদ্রাসায় দিয়েছেন। মেয়েকে ক্যাডেট মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন। ধর্ম আমাদের ভাবীকে বদলে দিলো। ভাবীর এরকম বদলে যাওয়া আমার মোটেই পছন্দ হয়নি।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০২৩ বিকাল ৩:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




