somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায় কণ্ঠস্বর

০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১৯৮৫ সালের গোড়ায় যাদবপুর থেকে অর্থনীতি পড়া এক তরুণ কলকাতার রেসপন্স নামের বিজ্ঞাপন সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে ঢুকলেন। সংস্থার মালিক রাম রায়। সেই সময় কলকাতার বিজ্ঞাপন জগতে ক্যাম্পেইন লেখা হতো ইংরেজিতে বা হিন্দিতে, তারপর বাংলায় অনুবাদ করা হতো। অর্থাৎ বাঙালি ক্রেতা যে বাক্য শুনতেন, সেটা তাঁর নিজের ভাষায় ভাবাই হয়নি। রাম রায় এই প্রথা বদলাতে চাইছিলেন, আর ঋতুপর্ণ ঘোষের মধ্যে তিনি এমন একজনকে পেলেন যিনি বাংলায় সরাসরি ভাবতে পারেন।

ঋতুপর্ণ দশ বছর ওই অফিসে কাটালেন। বরোলিনের জন্য তিনি লিখলেন "বঙ্গ জীবনের অঙ্গ"। শারদ সম্মান, মার্গো, পিয়ারলেস, ফ্রুটি, একের পর এক ক্যাম্পেইন। সহকর্মীদের স্মৃতিতে যে ঘটনা বারবার ফিরে আসে সেটা হলো তাঁর কাজের গতি। ওগিলভি ও অন্যান্য সংস্থায় কাজ করা সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়, যিনি নব্বইয়ে রেসপন্স থেকেই ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, জানিয়েছেন এক রেস্তোরাঁয় ক্লায়েন্ট ব্রিফ দেওয়ার পর ঋতুপর্ণ ন্যাপকিন টেনে নিয়ে ওখানেই বিজ্ঞাপন লিখে ফেলেছিলেন, যা পরে বড় ক্যাম্পেইনের ভিত হয়। আরও একটা ঘটনা তিনি বলেছেন। ঋতুপর্ণ একবার তাঁকে একটা তথ্যচিত্রের স্ক্রিপ্ট টাইপ করে দিতে বলেন, কারণ কম্পিউটারে তাঁর হাত চলত না। সুমন্ত পাণ্ডুলিপি চাইলেন। ঋতুপর্ণ বললেন, পাণ্ডুলিপি নেই, তিনি বলে যাবেন। তারপর নির্ভুলভাবে স্ক্রিপ্ট বলে গেলেন, যেন সামনে রাখা কাগজ থেকে পড়ছেন।

তাঁর খসড়া কাগজে থাকত না। থাকত গলায়।

ঋতুপর্ণ ঘোষকে নিয়ে বাংলায় যত লেখা হয়েছে, সেখানে দুটো বিষয়ই বারবার ফিরে এসেছে। এক, তিনি নারীর ব্যক্তিগত জগৎকে পর্দায় তুলে এনেছেন। দুই, তিনি নিজের যৌনতা ও লিঙ্গপরিচয় নিয়ে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়েছেন। দুইটাই সত্য এবং দুইটাই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে তাঁর কাজের মধ্যে আরেকটা বিষয় প্রথম সিনেমা থেকে শেষ সিনেমা পর্যন্ত থেকে গেছে। সেটা কণ্ঠস্বর। কার গলা কোন শরীরে বসবে, কে ক্রেডিট পাবে আর কে পাবে না, কে অন্যের গলা নকল করে হাসাবে, কে নিজের গলা নিয়ে দাঁড়াবে। এই প্রশ্ন ঋতুপর্ণর কাজের মধ্যে বারবার এসেছে। তবে একবার এই জায়গায় তিনিও ভুল করেছিলেন।

১৯৯২ সালে মুক্তি পেলো 'হীরের আংটি', শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভুতুড়ে সিরিজের কাহিনি থেকে। সত্যজিৎ রায় মারা গেলেন সেই বছরই। ঋত্বিক ঘটক তার এক দশকেরও বেশি আগে চলে গেছেন, মৃণাল সেন তখন ক্যারিয়ারের শেষ দিকে। বাংলা সিনেমা তখন একদিকে দর্শকহীন আর্ট ফিল্ম আর অন্যদিকে হিন্দি ছবির সস্তা রিমেকের মাঝখানে ঝুলছে।

'হীরের আংটি'র কেন্দ্রীয় চরিত্র গন্ধর্বকুমার। পর্দায় তাকে দেখা যায় অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের শরীরে। সিনেমার ক্রেডিট অনুযায়ী, তাঁর গলা দিয়েছিলেন দীপঙ্কর দে। ঋতুপর্ণর প্রথম সিনেমাতেই তাই শরীর আর গলা ছিল দুজন আলাদা মানুষের।

সিনেমার মুক্তি নিয়েও সমস্যা হয়েছিল। সংগীতা দত্ত, যিনি ঋতুপর্ণর বন্ধু এবং পরে তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, জানিয়েছেন যে 'হীরের আংটি' ঠিকমতো মুক্তি পায়নি এবং এর পর ঋতুপর্ণর সিনেমা বানানোর স্বপ্ন প্রায় থেমে গিয়েছিল। দুই বছর পর 'উনিশে এপ্রিল' মুক্তি পায় এবং ছবিটি তাঁকে বাংলা সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

২০০০ সালের 'বাড়িওয়ালি' প্রযোজনা করেছিলেন অনুপম খের। প্রধান চরিত্র বনলতায় অভিনয় করেছিলেন তাঁর স্ত্রী কিরণ খের। শুটিং হয়েছিল কলকাতার কাছে দুইটা পুরোনো বাড়িতে, বত্রিশ দিনে।

কিরণ খের বাংলা জানতেন না। ফলে সিনেমার সব সংলাপ ডাব করেছিলেন বাঙালি অভিনেত্রী রিতা কয়রাল। কান্নার দৃশ্যগুলোও, যেগুলোতে গ্লিসারিন লেগেছিল। ২০০১ সালে কিরণ খের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার পেলেন।

জাতীয় পুরস্কারের নিয়মে ডাব করা কণ্ঠে অভিনয় পুরস্কারের জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল না। ছবি জমা দেওয়ার সময় তাই কণ্ঠ ডাব করা হয়েছে কি না, সেটা জানাতে হতো। 'বাড়িওয়ালি' নিয়ে জুরি সেই বছর সমস্যায় পড়ে। জুরিপ্রধান ছিলেন গৌতম ঘোষ। প্রশ্ন ছিল, অভিনয়ের বিচার করতে গেলে অভিনেতার নিজের কণ্ঠ কতটা জরুরি। এক পক্ষের মত ছিল, সংলাপ বলা এবং উচ্চারণও অভিনয়ের অংশ। তাই নিজের সংলাপ নিজে না বললে পুরস্কার দেওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে সৈয়দ মির্জার যুক্তি ছিল, কণ্ঠ অন্য কেউ দিলেও শরীরী ভাষা এবং অভিনয় দিয়ে একজন অভিনেতার পারফরম্যান্স বিচার করা যায়।

বছর সতেরো পরে জি বাংলার এক আলাপচারিতার অনুষ্ঠানে রিতা কয়রাল নিজের বয়ান দেন। তিনি জানান গৌতম ঘোষ তাঁকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলেন কণ্ঠটা তাঁর কি না, আর তিনি সরল মনে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলেন। তারপর অনুপম খেরের ফোন আসে। কয়রালের দাবি অনুযায়ী তাঁকে বলা হয়েছিল সংবাদমাধ্যমের কাছে ডাবিংয়ের কথা অস্বীকার করতে হবে, আর তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে হুমকি আসে। কিরণ খের তখন ডাবিংয়ের কথা অস্বীকার করেছিলেন। ঋতুপর্ণ পরে কয়েকটি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে ডাবিং রিতা কয়রালই করেছিলেন। কে ঠিক কী বলেছিলেন তা নিয়ে বিবরণে অমিল আছে, ফলে সবটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

যা নিশ্চিত, তা হলো ফর্মে কয়রালের নাম ওঠেনি। পুরস্কার তাই ভাগ হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি। রিতা কয়রাল মারা যাওয়ার পর টাইমস অফ ইন্ডিয়া লিখেছিল, প্রাপ্য স্বীকৃতি না পাওয়ার ক্ষত তিনি বাকি জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন।

এখানে সহজ একটা রায় দিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু ব্যাপারটা এত সরল নয়। ডাবিং তখন বাংলা ও ভারতীয় সিনেমায় খুবই স্বাভাবিক একটা প্রথা ছিল, ঋতুপর্ণর তৈরি করা কিছু নয়। অপর্ণা সেন নিজে '৩৬ চৌরঙ্গী লেন'-এ দেবশ্রী রায়ের জন্য ডাবিং করেছিলেন। তাঁর মতে, ডাবিং অনেক সময় অভিনয়কে আরও ভালো করে তুলতে পারে। তাই সমস্যা ডাবিংয়ে নয়। সমস্যা হলো, রিতা কয়রালের নামটা সেই ফর্মে ছিল না, যেখানে তাঁর নাম থাকার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত পুরস্কার পেলেন কিরণ খের, কিন্তু যে কণ্ঠটা তাঁর অভিনয়ের একটা অংশ হয়ে ছিল, সেই কণ্ঠের মালিকের কোনো স্বীকৃতি রইল না।

তিন বছর পর 'চোখের বালি'। ঐশ্বর্য রাই বিনোদিনী। ঋতুপর্ণ পরে জানিয়েছেন, প্রথম দিন থেকেই ঐশ্বর্যকে পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছিল যে তিনি নিজের সংলাপ ডাব করতে না-ও পারেন। শুটিংয়ের শেষ দিন ঋতুপর্ণ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন তিনি ডাবিং করতে পারবেন কি না। ঐশ্বর্য সরাসরি না বলে দেন, কারণ প্রয়োজনীয় মানের বাংলা বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ডাবিং করলেন শ্রীলা মজুমদার। ঋতুপর্ণ একদিন ফোনে ঐশ্বর্যকে সেই ডাবিং শুনিয়েছিলেন, আর ঐশ্বর্য খুশি হয়েছিলেন।

রাইমা সেনের আশালতার গলা দিয়েছিলেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী, যিনি 'বাড়িওয়ালি'তে কিরণ খেরের কাজের মেয়ের ভূমিকায় ছিলেন। আনন্দবাজারে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য 'চোখের বালি'র প্রশংসা করতে গিয়ে সুদীপ্তার ডাবিংয়ের কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছিলেন।

সিনেমার ক্রেডিটে আরেকটা নাম আছে যেটা প্রায় কেউ পড়ে না। আশালতার মাসি অন্নপূর্ণার ভূমিকায় ছিলেন সুচিতা রায়চৌধুরী। তাঁর কণ্ঠ ডাব করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ নিজে।

অর্থাৎ ২০০৩ সালে, 'চিত্রাঙ্গদা'র নয় বছর আগে, নিজের শরীর পর্দায় আনার অনেক আগে, ঋতুপর্ণ একজন নারীচরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন। শুধু গলা দিয়ে। তিনি এটা লুকাননি, ক্রেডিটে লেখাই আছে। কিন্তু ডাবিংয়ের ক্রেডিট কেউ পড়ে না বলে ঘটনাটা প্রায় অলক্ষ্যে থেকে গেছে।

গ্রিক পুরাণে তিরেসিয়াস নামের এক ভবিষ্যদ্বক্তার গল্প আছে। থিবসের এই লোক একদিন দুইটা সাপকে সঙ্গমরত অবস্থায় দেখে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে নারীতে রূপান্তরিত হয়ে যান। সাত বছর নারী হিসেবে কাটানোর পর একই দৃশ্যে একই আঘাত করে তিনি আবার পুরুষ হন। পরে জিউস আর হেরার এক তর্কে তাঁকে সালিশ ডাকা হয়, কারণ তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি দুই শরীরেই বেঁচেছেন। প্রশ্ন ছিল, সঙ্গমে সুখ বেশি পায় কে। তিরেসিয়াস উত্তর দিলেন, নারী। হেরা রেগে গিয়ে তাঁকে অন্ধ করে দিলেন, আর জিউস ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিলেন ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা।

গল্পটা লক্ষণীয়। দুই শরীরে বেঁচেছেন বলেই তাঁকে ডাকা হলো সাক্ষ্য দিতে। তিনি সত্যি বললেন। শাস্তি হিসেবে তাঁর চোখ কেড়ে নেওয়া হলো। যা পড়ে রইলো, তা শুধু কথা বলার ক্ষমতা।

সোফোক্লিসের 'ইডিপাস' নাটকে এই লোকই রাজার ডাকে প্রাসাদে আসেন। তিনি কথা বলতে চান না। রাজা জোর করেন। তারপর যখন তিনি সত্যটা বলেন, রাজা তাঁকে ভণ্ড বলে গালি দেন এবং তাঁর অন্ধত্ব নিয়ে ঠাট্টা করেন। যাঁকে ডেকে আনা হয়েছিল কথা বলার জন্য, তাঁকেই অপমান করা হয় সেই শরীরের জন্য যেটা তাঁকে দেখার ক্ষমতা দিয়েছিল।

এখানে বাংলা ভাষার একটা সুবিধা চোখে পড়ে। ইংরেজিতে ঋতুপর্ণকে নিয়ে লিখতে গিয়ে গবেষকেরা he, she, they, এমনকি zie পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন, কোনোটাই স্বস্তি হয়নি। বাংলার তৃতীয় পুরুষের সর্বনামে লিঙ্গ নেই। তিনি মানে তিনি। ফলে ঋতুপর্ণর জন্য বাংলাকে নতুন শব্দ বানাতে হয়নি, পুরোনো শব্দ ভাঙতেও হয়নি। ভাষা যা আগেই দিয়ে রেখেছিল, সমাজ তা দিতে রাজি ছিল না।

স্টার জলসায় ঋতুপর্ণ চালাতেন 'ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি'। তার আগে ইটিভি বাংলায় ছিল 'এবং ঋতুপর্ণ'। দুই অনুষ্ঠানেই তিনি অতিথিদের 'তুই' বলে ডাকতেন, আর সেট সাজানো হতো বসার ঘরের আদলে, চা-নাশতাসহ। সাক্ষাৎকার শব্দ তিনি ব্যবহার করতেন না, বলতেন আড্ডা।

একটা পর্বে অতিথি ছিলেন মীর আফসার আলি। রেডিও জকি এবং কৌতুকশিল্পী মীর তখন বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন পুরস্কার অনুষ্ঠানে ঋতুপর্ণর নকল করে আসছিলেন, বিশেষ করে তাঁর মেয়েলি বলে চিহ্নিত ভঙ্গি ও গলা। কৌস্তভ বক্সী ও রোহিত দাশগুপ্তের গবেষণাপত্রে পর্বটির তারিখ ২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর। সমসাময়িক এক কলকাতা ব্লগে অবশ্য অনুরূপ একটি সংঘাতের বিবরণ ২০০৮ সালের নভেম্বরে প্রচারিত পর্ব হিসেবে লেখা আছে, ফলে তারিখ নিয়ে সামান্য অনিশ্চয়তা থেকে যায়।

যা নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই, তা হলো ঋতুপর্ণর প্রশ্নগুলো। তিনি মীরকে জিজ্ঞেস করলেন, নকল করার সময় তিনি কি ঋতুপর্ণ ঘোষ নামক ব্যক্তির নকল করছেন, নাকি একজন সাধারণ মেয়েলি পুরুষের। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মীর কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে তাঁর নকলে কলকাতার সব মেয়েলি পুরুষ অপমানিত হচ্ছেন। তারপর তিনি বললেন, তিনি আপত্তি করছেন না কারণ তাঁর নিজের অসুবিধা হচ্ছে, আপত্তি করছেন তাঁদের হয়ে যাঁদের কাছে তিনি হয়তো একজন প্রতিনিধি।

এই ঘটনা নিয়ে কলকাতায় অবশ্য সবার মত এক ছিল না। অনেকে বললেন আমন্ত্রিত অতিথিকে নিজের অনুষ্ঠানে ডেকে এনে এভাবে কোণঠাসা করা রুচিসম্মত নয়। আবার অনেকে পাল্টা যুক্তি দিলেন, ঋতুপর্ণ একবার সীমা ছাড়িয়েছেন আর মীর সেটা করে আসছেন বছরের পর বছর। গবেষকেরা এই পর্বকেই ঋতুপর্ণর প্রকাশ্যে আত্মপরিচয় ঘোষণার মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন।

দুইটা ঘটনা এবার পাশাপাশি রাখা যাক। ২০০০ সালে যে মানুষটার সিনেমায় একজন ডাবিং শিল্পীর নাম ফর্ম থেকে বাদ পড়েছিল, ২০০৯ সালে সেই মানুষটাই টেলিভিশনে দাঁড়িয়ে বললেন, কারও গলা কেড়ে নিয়ে খেলা করার অধিকার কারও নেই। এটাকে অনুশোচনা বা প্রায়শ্চিত্ত বলা যায় না, কারণ দুই ঘটনার মধ্যে ঘোষিত কোনো যোগ নেই এবং কেউ তেমন দাবি করেননি। এটুকু বলা যায়, যে যন্ত্র একজন মানুষের গলা কেড়ে নিতে পারে, ঋতুপর্ণ ওই যন্ত্রের কলকব্জা ভেতর থেকে চিনতেন। কারণ তিনি নিজেই একবার সেটা চালিয়েছিলেন।

২০১০ সালে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'আরেকটি প্রেমের গল্প'-এ ঋতুপর্ণ প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন, চিত্রনাট্যেও ছিলেন। সিনেমার পোস্টার বেরোনোর পরই কলকাতা তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল।

গল্পটা অভিরূপ সেন নামের এক রূপান্তরকামী তথ্যচিত্র নির্মাতার, যিনি দিল্লি থেকে কলকাতায় আসেন চপল ভাদুড়িকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানাতে। চপল ভাদুড়ি বাস্তবের মানুষ। ভাদুড়ি পরিবারের সন্তান, অভিনেত্রী কেতকী দত্তের ভাই। যাত্রার মঞ্চে যখন ভদ্রঘরের মেয়েদের ওঠা নিষিদ্ধ ছিল, তখন তিনি নারীচরিত্রে অভিনয় করে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া 'অভিনেত্রী'দের একজন হয়ে উঠেছিলেন। লোকে তাঁকে চপল রানি বলে ডাকত। ১৯৯৯ সালে নবীন কিশোরের 'পারফর্মিং দ্য গডেস' তথ্যচিত্রটি তাঁকে নতুন করে আলোচনায় আনে।

সিনেমায় বর্তমানের চপল ভাদুড়ির ভূমিকায় ছিলেন চপল ভাদুড়ি নিজে। আর তরুণ বয়সের চপলের ভূমিকায় ছিলেন ঋতুপর্ণ। যে মানুষটা সারা জীবন নারীচরিত্রকে নিজের শরীর ও গলা ধার দিয়েছেন, তাঁর তরুণ বয়সে ঋতুপর্ণ বসিয়ে দিলেন নিজের শরীর ও নিজের গলা।

দুই বছর পর এলো 'চিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইশ'। মহাভারতে চিত্রাঙ্গদা মণিপুরের রাজকন্যা। তাঁর বাবা পুত্রসন্তান না থাকায় তাঁকে ছেলের মতো করে মানুষ করেছিলেন। পরে অর্জুন তাঁকে বিয়ে করেন। রবীন্দ্রনাথের ১৮৯২ সালের নৃত্যনাট্যে চিত্রাঙ্গদা অর্জুনকে পাওয়ার জন্য মদনদেবের কাছে এক বছরের জন্য অন্যরকম একটি রূপ চান। সেই রূপ পাওয়ার পর তিনি অর্জুনের কাছে নিজেকে নতুন করে উপস্থাপন করেন। শেষে সেই রূপ ছেড়ে নিজের পরিচয় নিয়েই তাঁর সামনে দাঁড়ান।

ঋতুপর্ণর রুদ্র একজন কোরিওগ্রাফার। তিনি রবীন্দ্রনাথের 'চিত্রাঙ্গদা' মঞ্চস্থ করছেন, আবার একই সময়ে লিঙ্গ পরিবর্তনের অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। কারণ পার্থর সঙ্গে আইনি স্বীকৃতি ছাড়া তাঁদের পক্ষে সন্তান দত্তক নেওয়া সম্ভব নয়। সিনেমায় একের পর এক মানুষ তাঁকে অস্ত্রোপচারের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেয়। বাবা-মা চুপ করে যান, প্রেমিকও সিদ্ধান্ত বদলাতে বলে।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার কাছে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ছিল, অন্যের পছন্দের জন্য বদলে যাওয়া মানুষ কি নিজের পরিচয় নিয়ে ফিরে দাঁড়াতে পারে? ঋতুপর্ণর রুদ্র সেখানে এসে আরও কঠিন প্রশ্ন তোলে। জন্মের সময় যে শরীর আমরা পাই, সেটাও তো নিজের পছন্দে পাওয়া নয়। তাহলে নিজের শরীর বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? আর কে ঠিক করে দেয়, কোন শরীর স্বাভাবিক, কোনটা বদলে নেওয়া?

রবীন্দ্রনাথের নাটকে চিত্রাঙ্গদার পরিচয়ের একটা নির্দিষ্ট কাঠামো আছে। ঋতুপর্ণ সেই কাঠামোর ভেতরেই প্রশ্নটা আরও এগিয়ে দেন। তাঁর রুদ্রর কাছে শরীর বদলানো শুধু রূপ বদলানো নয়, নিজের পরিচয় নিজে ঠিক করার অধিকারও।

তারপর যা ঘটলো, তা সিনেমার কিছু দৃশ্যকে নতুন অর্থ দিল। ২০১৩ সালের ৩০ মে সকালে দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ মারা গেলেন। বয়স হয়েছিল ঊনপঞ্চাশ। তাঁর টাইপ টু ডায়াবেটিস ছিল, প্যানক্রিয়াটাইটিসও ছিল। মৃত্যুর পর অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে, তবে মৃত্যুর সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কতটা ছিল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। শুধু একটা অস্বস্তিকর কাকতাল থেকে যায়। রুদ্রকে যে ঝুঁকিগুলোর কথা সিনেমায় বারবার বলা হয়েছিল, তাঁর নিজের মৃত্যুর পর সেগুলোও অন্যরকম শোনাতে শুরু করেছিল।

'সানগ্লাস', হিন্দিতে 'তাক ঝাঁক', তৈরি হয়েছিল ঋতুপর্ণরই ছোটগল্প 'চৈতালি চশমা' থেকে। গল্পটা সাদাসিধে এক নারীর, যার হাতে এসে পড়ে পুরোনো এক চশমা, যেটা পরলে অন্যের মনের কথা পড়া যায়।

এই সিনেমার ইতিহাস গল্পের চেয়ে অদ্ভুত। চিত্রনাট্য নিয়ে ঋতুপর্ণ নব্বইয়ের দশকেই অপর্ণা সেনের কাছে গিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে কঙ্কনা সেন শর্মা সই করলেন। হিন্দি সংস্করণের প্রধান পুরুষ চরিত্রে প্রথমে ঠিক হয়েছিলেন আরশাদ ওয়ারসি, যিনি পারিশ্রমিক নিয়ে মতানৈক্যে সরে গেলেন। তারপর এলেন সঞ্জয় সুরি, যিনি চরিত্রের গভীরতা নিয়ে সংশয়ে সরে গেলেন। শেষে এলেন আর মাধবন। মাধবন চিত্রনাট্য না পড়েই রাজি হয়েছিলেন, শুধু ঋতুপর্ণর মুখে গল্প শুনে। জয়া বচ্চনের অসুস্থতায় শুটিং এক মাস পিছিয়ে গেলো, শেষে ২০০৬ সালের অক্টোবরে কলকাতায় দুই ভাষার কাজ একসঙ্গে শুরু হলো।

তারপর সিনেমাটা বছরের পর বছর আটকে রইলো। মুক্তি পেলো ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর, উনিশতম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। পরিচালক তখন প্রায় ছয় মাস হলো মারা গেছেন। সিনেমার গল্পে ছিল অন্যের মনের কথা পড়ে ফেলার এক চশমা। কিন্তু ছবিটা নিজেই সাত বছর মুক্তি পায়নি।

শেষ সিনেমা 'সত্যান্বেষী', শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'চোরাবালি' থেকে। ব্যোমকেশের ভূমিকায় ছিলেন সুজয় ঘোষ, নিজে পরিচালক, অভিনয়ে ওটাই তাঁর প্রথম কাজ। শুটিং হয়েছিল ধান্যকুড়িয়ার গাইন রাজবাড়িতে। ঋতুপর্ণ শুটিং শেষ করে গিয়েছিলেন, পোস্ট-প্রোডাকশনের পুরো শেষ করে যেতে পারেননি। বাকি কাজ শেষ করলেন তাঁর নিজের টিমের লোকেরা। সিনেমা মুক্তি পেলো ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর।

কুড়ি বছর ধরে যে মানুষটা ঠিক করে দিয়েছিলেন কার গলা কোন শরীরে বসবে, তাঁর শেষ সিনেমার শব্দ অন্যরা মিলিয়ে দিলেন।

'রোব্বার', সংবাদ প্রতিদিনের রবিবারের ক্রোড়পত্র, ঋতুপর্ণ সম্পাদনা করতেন। প্রতি সপ্তাহে লিখতেন 'ফার্স্ট পার্সন' নামের কলাম। রবিবার সকালে স্টল থেকে কাগজ উধাও হয়ে যেত ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে। ওই কলামে তিনি নিজের যৌনতা নিয়ে লিখতেন, ব্যর্থ সম্পর্কের অভিজ্ঞতা লিখতেন, তবে যাঁদের সঙ্গে সেই সম্পর্ক ছিল তাঁদের নাম উল্লেখ করতেন না। একা থাকা নিয়ে লিখতেন, অসুস্থতা নিয়ে লিখতেন। ২০১০ সালের ১ অগাস্টের এক সংখ্যায় তিনি লিখেছিলেন বাবা এক মাস ধরে হাসপাতালে, আর ইন্দ্রাণী পার্কের দোতলা বাড়িতে তিনি একা, বাবা হয়তো তাঁকে বাকি জীবনের জন্য তৈরি করে দিচ্ছেন।

Sahapedia-তে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কলামটি চলেছিল ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ২ জুন পর্যন্ত। তিনি মারা গিয়েছেন ৩০ মে। অর্থাৎ শেষ লেখাটা পাঠকের হাতে পৌঁছেছিল লেখক মারা যাওয়ার তিন দিন পর। কলামগুলো পরে বই হয়েছে, দুই খণ্ডে, দে'জ পাবলিশিং থেকে, মৃত্যুর বছরেই। সংগীতা দত্তের তথ্যচিত্র 'বার্ড অফ ডাস্ক'-এ ফার্স্ট পার্সন থেকে অংশ পড়ে শোনানো হয়েছে অন্যের কণ্ঠে।

সব মিলিয়ে ছবিটা এমন দাঁড়ায়, বাংলা সিনেমার যে মানুষটা কুড়ি বছর ধরে ঠিক করে দিয়েছেন কার গলা কোথায় বসবে, তাঁর নিজের গলা শেষ পর্যন্ত তাঁর শরীরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো। কাগজে ছাপা হলো, বই হলো, তথ্যচিত্রে অন্যের মুখে বাজলো, আর নিজের শেষ সিনেমার সাউন্ডট্র্যাক শেষ করলেন অন্যরা। তিরেসিয়াসের চুক্তির শর্তটাই। চোখ যায়, কথা থেকে যায়।

এখন একটা আপত্তি ওঠা স্বাভাবিক। ঋতুপর্ণ কি এই সুতো সচেতনভাবে বুনেছিলেন? বোনেননি, অন্তত লিখে যাননি। 'ফার্স্ট পার্সন'-এ ডাবিং নিয়ে বিস্তারিত আত্মসমালোচনা নেই, সাক্ষাৎকারেও নেই। ফলে এটা তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনা ছিল, এমন দাবি করা চলে না। যা করা চলে, তা হলো কাজগুলো পরপর সাজিয়ে দেখা যে সেগুলো একই দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। দীপঙ্কর দে-র গলায় গন্ধর্বকুমার, রিতা কয়রালের গলায় বনলতা, শ্রীলা মজুমদারের গলায় বিনোদিনী, ঋতুপর্ণর গলায় অন্নপূর্ণা, মীরের গলায় ঋতুপর্ণ, ঋতুপর্ণর গলায় তরুণ চপল ভাদুড়ি, আর শেষে অন্যদের হাতে সাজানো 'সত্যান্বেষী'র শব্দ। একজন শিল্পীর কাজ অনেক সময় তাঁর নিজের বলা কথার চেয়েও স্পষ্ট করে কিছু বিষয় সামনে আনে। আর ঋতুপর্ণ ঘোষের ক্ষেত্রে সেই কথাটা ফ্রেমে নয়, বাজে সাউন্ডট্র্যাকে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:৫৬

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত



সময় চলেছে তার আপন খেয়ালে,
নদীর স্রোতেরা হারায় কালের বুকে;
আমি শুধু এক অনন্তকাল ধরে,
ডুবে আছি প্রিয়, তোমার চাওয়া পাওয়ার ওই সুখে।

বাহিরের সব নিয়ম চলুক তার মতো,
মহাবিশ্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ের অবস্থা নিয়ে আলাদা গুরুত্ব দেয়া দরকার

লিখেছেন অপলক , ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৫



পাহাড়ীদের হাতে এখন প্রচুর টাকা। সে টাকার যোগান প্রত্যাক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে আমরা সমতলের জনগন দিয়েছি। পাহাড়ীরা এখন জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। তাদের মাঝে প্রচুর উচ্চ শিক্ষিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলার পথে ক্ষণিক দেখা – (১১)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০২

পূর্বের পোস্টঃ ক্ষণিকের দেখা, মায়াময় এ ভুবনে -১০


অবশেষে আমার কিছু কথা শুনে ওরা হাসিতে ফেটে পড়লো। সবার মুখে ছিল উজ্জ্বল হাসি।

আজ দুপুরে একটি এলাকার মাসজিদ সংলগ্ন পুকুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০২



আমাদের চারপাশে অনেক কিছু আছে।
যা আমরা দেখতে পাই না। ব্যাকটেরিযয়া, ভাইরাস, ডার্ক ম্যাটার, অণু ও পরমাণুর কথা বলছি না। আমি বলছি, মৃত মানুষের কথা। প্রতিদিন বিশ্বে গড়ে দেড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী বিদেশে, আইনও কি সঙ্গে নিয়ে গেছেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০৬


প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলেই দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে । সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকলেই কিছু নেতাকর্মী যেন নিজেদের দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×