এখন পর্যন্ত কম্পিউটারে বাংলা লিখে পেন ড্রাইভে বাইরে কোথায় নিয়ে প্রিন্ট দিতে গেলেই যুক্ত অক্ষর ভেঙ্গে হযবরল হয়ে যায়। বাংলা সফটওয়ারের দৌরাত্ম যেখানে এখনো সীমাহীন ঝামেলায় বাঁধা। সেখানে ঢাকায় বাংলা একাডেমি চত্বর ও কক্ষ ভাড়া নিয়ে বিদেশি ভাষার লেখকদের জন্য আমাদের দুই সম্পাদক মোড়ল (দুই গে) হে ফেস্টিভালের নামে ধনি সাহিত্য প্রমোট করার দায়িত্ব নিয়েছেন। সব চেয়ে অবাক করার বিষয় হল, দেশের যে সব লেখকরা এই কর্পোরেট দানবের কাছে বিক্রি হয়েছে, তারাও দলে দলে হে ফেস্টিভালে গিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বোগল বাজাচ্ছেন। বাংলা সাহিত্যকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার খায়েসের পরিবর্তে বাংলাদেশে ইংরেজি সাহিত্যের বাজার সৃষ্টি করাই এই দালালদের যেনো এখন আসল উদ্দেশ্য। মাঝখান থেকে তাদের ছেলেমেয়েদের বড় লেখক বানানোর খায়েসকে কতোটা নির্লজ্বভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা হে ফেস্টিভালের আসল উদ্দেশ্য যারা জানে না, তাদের শত চেষ্টা করেও বোঝানো সম্ভব নয়।
সাহিত্যকে এখন ধনি আর গরীব দুইভাগে ভাগ করার জন্য এসব দালালদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। ত্রিশটারও বেশি কর্পোরেট সংস্থার স্পন্সর নিয়ে এসব দালালরা বাইরের অনেক লেখককে যাওয়া আসার বিমান ভাড়া দিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসছেন। মজার ব্যাপার হল, বাংলা সাহিত্যকে বাইরে পৌঁছে দেবার জন্য এসব দালালরা একটা কানা কড়িও খরচ করতে রাজী নয়। আর এই বাজারি সাহিত্যের আগ্রাসনের সঙ্গে স্বয়ং যুক্ত বাংলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক জনাব শামসুজ্জামান খান। দুই পয়সা টু পাইস কামানোর জন্য এই লোকটা বারবার বাংলা একাডেমিকে বিদেশি হায়নার কাছে বিক্রি করছেন। এটা দেখার জন্য যেনো বাংলাদেশের সকল আবালবৃদ্ধবনিতা অন্ধ হয়ে গেছেন। চোখে কালো চশমা লাগিয়ে না দেখার ভান করছেন। এই নিয়ে তিনবার জনাব খান সাহেব বাংলা একাডেমিকে এসব দালালদের কাছে বিক্রি করলেন। এর বিচার কে করবে?
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক জনাব শামসুজ্জামান খান যে দায়িত্বহীনতা কাজ বারবার করে চলেছেন, তাতে এই ব্যক্তি কোনোভাবেই আর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদ ধরে রাখার মত যোগ্যতা বা অধিকার রাখেন না। এক পাল নামিদামি লেখকরা আবার এই তথাকথিত হে ফেস্টিভালে গিয়ে বিদেশি লেখকদের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে ছবি টানাচ্ছেন। হে ফেস্টিভালের নিজস্ব ওয়েব সাইটে ভিজিট করে দেখা গেল, সেখানে অ্যাবাউট পাতায় এখনো গত বছরের আয়োজনের খবরই শোভা পাচ্ছে। মানে আয়োজকদের কারো এই খবরটি আপডেট করার মতও সময় নাই। বিভিন্ন ফেস্টিভালের কিছু ছবি, কিছু পুরানো খবর, অনুষ্ঠান সূচি, টিকিটের খবর, ছবির গ্যালারি, স্পন্সর আর যোগাযোগের খবর আছে এই তথাকথিত হে আয়োজকদের মূল ওয়েব সাইটে। আপনারা ইচ্ছে করলে দেখতে পারেন। Click This Link । বোঝেন এবার এদের ঠ্যালা কত। সারা বছরে এই ওয়েব সাইটে আর কারো ঢু মারারই সময় হয় না। এ বছরের আয়োজন উপলক্ষে শুধু হোম পাতায় এ বছরের কয়েকজন লেখকদের নাম টানানো হয়েছে। আর তিনদিনের অনুষ্ঠান সূচি। এছাড়া এই সাইটের সকল খবর পুরাতন বছরের। মানে সারা বছর এই দালালরা শুধু মাত্র একটি ফেস্টিভাল করার জন্য বাংলাদেশের বাংলা একাডেমিকে বেছে নিয়েছেন। এরা বাংলা ভাষার শত্রু। মুখে এদের এখনো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে লালন করার শকুনি স্বপ্ন। মুখোশ পড়া এসব দালালরা আবার কেউ কেউ ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারেও ফুল দিতে যান। আর অন্তরে লালন করেন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। মতিউর-মাহফুজ গংরা বাংলা সাহিত্যকে কোনঠাসা করার যে ভয়ংকর খেলায় মেতেছেন, এই দানব রুখবে কে?
এমনিতে বাংলা একাডেমি সারা বছর শীতনিদ্রা যায়। বছরে শুধু অমর একুশে বইমেলা করার প্রতিই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অথচ অমর একুশে বইমেলাটি আসলে স্রেফ প্রকাশকদের ব্যাপার। অবশিষ্ট সারা বছর বাংলা একাডেমির আর কোনো কাজ নাই। জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় এভাবে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এখন দালালদের পৃষ্ঠপোষকতায় মেতেছে, এটা ভাবলে খুব কষ্ট লাগে। অথচ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেবার জন্য কাজ করার কথা এই প্রতিষ্ঠানটির।
জনাব মতিউর-মাহফুজ গং, আপনারা ত্রিশের বেশি স্পন্সর নিয়ে এই যে বছর বছর হে ফেস্টিভালের নামে বিদেশি লেখকদের কোটি কোটি টাকা খরচ করে তিনদিনের জন্য ঢাকায় আনছেন, একবার ভেবে দেখুন, এই টাকায় সারা বছর, বাংলাদেশের জেলায় জেলায় আমাদের নিজস্ব লেখকদের দিয়ে কতবার কতটি লেখক সম্মেলন করতে পারতেন। যা থেকে আমাদের নতুন প্রজন্ম লেখালেখিতে আগ্রহী হতে পারত। অনেক বেশি উৎসাহিত হতে পারত। যা নতুন প্রজন্মের লেখকদের বেশ উপকারে লাগতে পারত। আপনারা তা না করে, হায়ারে লেখক এনে কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে আগ্রাসন চালাচ্ছেন, এটা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য দিনদিন হুমকি হয়ে যাচ্ছে। যারা আপনাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাতা চাটতে যাচ্ছেন, তাদের কিছু লাভ হলেও বাংলাদেশের সাধারণ লেখকদের জন্য এটা দিনদিন গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। আপনারা সাহিত্যকে ধনি-গরীব সুস্পষ্ট ব্যবধান টানার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। আপনারা টাকার গরম দেখিয়ে নিজেরা যতখুশি গে গে খেলা খেলুন, কিন্তু তার সঙ্গে বারবার বাংলা একাডেমিকে কেন জড়াচ্ছেন? নাকি এটাকে জায়েজ করার জন্য আপনাদের বাংলা একাডেমিকে খুব প্রয়োজন? সমীকরণ কী বলে? আপনাদের ছেলেমেয়েদের জন্য বুকার পুরস্কার লাগবে?
বাংলা একাডেমি প্রতি বছরই প্রতিশ্রুতি দেয়, দেশে তারা বিশ্বমানের লেখক সম্মেলন আয়োজন করবে। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের ভোটের সময়কার মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মত সারা বছর সেই কথাগুলো এখন অনেকটাই ফ্যাকাশে শোনায়। অথচ হে ফেস্টিভালের নামে আগ্রাসি এক তথাকথিত সম্মেলনে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিসের ভিত্তিতে প্রতি বছর হে আয়োজকদের কাছে বিক্রি হচ্ছে, তা এখনই জানার সময়। খান সাহেবরা কখনো বাংলা ভাষার উন্নতি চায়নি। এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও শুনতে খারাপ লাগলেও শতভাগ সত্যই এটা। বাংলা একাডেমি তো সারা বছর জাবর কাটার জন্য কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না।
একটু খেয়াল করলে দেখবেন, হে আয়োজকদের দুই প্রধান গুরুর একজন পশ্চিম বাংলার আনন্দ বাজারের দেশীয় চরের ভূমিকায় নেমেছেন। আরেকজন ইংরেজি সাহিত্যের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে নেতৃত্ব দিতে তথাকথিত ইংরেজি সাহিত্যের লেখকদের নামকাওয়াস্তে হাজির রেখে ইংরেজদের দালালি করছেন। এই দুই মোড়ল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নে আর কি কি করছেন, তাকি আমরা ইতিহাস ঘাটলে জানতে পারি?
বাংলা একাডেমির যারা আজীবন সদস্য, তারা কেন নিরবে এই আগ্রাসন হজম করছেন, এটা ভেবে আমার সত্যি সত্যিই কান্না পায়। তাহলে ভাষার জন্য যারা শহীদ হলেন, বাংলা ভাষার জন্য এতো যে আন্দোলন সংগ্রাম, তার কি ব্যাখ্যা এই দুই গে মোড়ল আমাদের দিতে পারবে?
আমরা হে আয়োজকদের এই দালালিপনার তীব্র নিন্দা জানাই। ধিক্কার জানাই, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক দালালদের চামচা জনাব শামসুজ্জামান খানকে। আপনি নৈতিকভাবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে থাকার সকল যোগত্য বিকিয়েছেন।
আর যারা ঘি খাবার লোভ সংবরণ করতে পারেনি, সেইসব লেখকদের জন্য বড় মায়া হয়। আহারে, তিন দিনের আলোচনা, ক্লাস নিয়ে যদি কাউরে লেখক বানানো যেত, তাহলে উন্নত বিশ্বের ঘরে ঘরে লাখ লাখ লেখক পয়দা হতো। হে আয়োজকদের আবারো সবিনয়ভাবে বলতে চাই, আপনাদের এই আয়োজনটি দয়া করে বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে সরিয়ে অন্য কোনো ভেন্যুতে করেন, কোনো অসুবিধা নাই। ব্রিটিশ কাউন্সিলে করেন, কোনো আপত্তি নাই। ন্যাম সম্মেলন কেন্দ্রে করেন, কোনো আপত্তি নাই। মাগার বাংলা একাডেমি চত্বরে আপনাদের ন্যাকা ন্যাকা কণ্ঠের আজগুবি ইংরেজি উচ্চারণ, বড় পিড়া দেয় গো। দোহাই আপনাদের, যাদের আপনারা লেখক বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, তাদের পড়িয়ে শিখিয়ে ভালো কিছু লিখতে পারে এমনভাবে আগে তৈরি করুন, তারপর না হয় এক সাথে রঙবেরঙের পোষাক পড়ে ঢাক ঢোল বাজালেন। গায়ে উলকি আঁকলেন। কেউ বাঁধা দেবে না। আপনাদের নাচা গাওয়া তখন আমরা দলে দলে গিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসব। কিন্তু বাংলা একাডেমি চত্বরে আপনাদের ধজভঙ্গ ইংরেজি উচ্চারণ ভাষা শহীদদের আত্মায় বর্ষাফলকের কোপের মত প্রতি মুহূর্তে বিধছে। দোহাই আপনাদের, আপনাদের গে উৎসব বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে সরিয়ে নিন।
মজার ব্যাপার হল, দেশের অনেক প্রথিতযশা লেখকরা যখন হে উৎসবে গিয়ে নাকাল ইংরেজি বলা ধনির দুলালদের কাছে যথাযথ পরিচয় দিয়ে আইডি কার্ড গলায় ঝোলান, তখন এদের সত্যিই বড় কাঙ্গাল মনে হয়। আহারে টাকার কাঙ্গালগণ। আমাদের ধনির দুলালরা আমাদের অনেক বিখ্যাত লেখকদেরও সরাসরি চেনেন না। পরিচয় বোঝাতে তাদের গলায় পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে হয়। টাকার কাছে এরা এভাবে গোলামি করবে, এরা কিসের সাহিত্য করেন, ভেবে পাই না।
আবার অনেকে আছেন, শুদ্ধ বাংলা বাক্য লিখতে পারেন না, অথচ পুরস্কার টুরস্কার পেয়ে নিজেকে বড় লেখক মনে করেন। তাদের আদিখ্যেতা দেখলে মনে হয়, হে ফেস্টিভালে গিয়ে এদের জীবন বড় সার্থক হয়ে গেল গো। আহারে তকমা মারা লেখকগণ। বাইরের কোন কোন ফেস্টিভালে আপনাদের নিমন্ত্রণ করে বিমান ভাড়া দিয়ে এমন দালালরা নিয়ে যায়? সেই হিসেব কি একবারও করেছেন?
বাংলা একাডেমির আগামী নীতি নির্ধারনী সভায় বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি শ্রদ্ধেয় আনিসুজ্জামান স্যার কেন বাংলা একাডেমির এই অধপতনকে রোধ করার জন্য উদ্যোগী হবেন না, এখনো তিনি কেন এই মাতলামো বন্ধের জন্য উদ্যোগী হচ্ছেন না, তাই ভেবে বড় কষ্ট হয়। বাংলা একাডেমির সকল সম্মানিত সদস্য ও আজীবন সদস্যদের প্রতি বিনীত নিবেদন, আগামী সভায় আপনারা এই বিষয়টি উত্থাপন করুন। বাংলাকে তাড়িয়ে সেখানে ইংরেজি সাহিত্যের এই আগ্রাসন অন্তত বাংলা একাডেমি চত্বরে যাতে বন্ধ হয়, আপনারা সেই উদ্যোগটি অন্তত গ্রহন করুন। নইলে আমরা দাঁত থাকতে যেমন দাঁতের মর্যাদা দেই না, তেমনি আগ্রাসন চরম আকার ধারণ না করা পর্যন্ত আমাদের হয়তো ঘুমই ভাঙবে না। সো, সাধু সাবধান। পরিশেষে, বাংলা একাডেমি চত্বরে হে ফেস্টভালের গে গে খেলার সর্বোচ্চ ধিক্কার জানাই। মতিউর-মাহফুজ গংদের দালালিপনা রুখে দাও ভাষা সৈনিকরা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



