somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘোরলাগা ইল্যুশন 'রিজওয়ান'।

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ২:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত মার্কিন কবি আগা শাহিদ আলি'র ‘দ্য কান্ট্রি উইদাউট এ পোস্ট অফিস’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে কাব্যনাটক 'রিজওয়ান'। মূল উর্দু কাব্যগ্রন্থ থেকে এটি ভাষান্তর করেছেন ঋদ্দিবেশ ভট্টাচার্য্য। এটিকে নাট্যরূপ দিয়েছেন নাট্যকার অভিষেক মজুমদার। আর 'রিজওয়ান' নাটকটি মঞ্চ পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যাশ্চার্য অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আহবান নিয়ে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াতে নাটবাঙলা নাট্যোৎসবে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা দশদিন (প্রতি দিন দুইটি শো, বিকাল ৪টা ও রাত ৮টা) শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে মঞ্চায়িত হচ্ছে 'রিজওয়ান' নাটকটি।

কবি আগা শাহিদ আলি'র ‘দ্য কান্ট্রি উইদাউট এ পোস্ট অফিস’ কাব্যগ্রন্থের প্রেক্ষাপট কাশ্মীর হলেও 'রিজওয়ান' নাটকের ক্যানভাস মূলত গোটা পৃথিবীর নিপীড়িত নির্যাতিত অসহায় মানুষের জীবন ও সংগ্রামের এক সম্মিলিত আর্ত-কণ্ঠস্বর'। 'এই দুনিয়ায় যদি কোনো জান্নাত থাকে, তবে সে জান্নাত এই মাটিতে, এই মাটিতে, এই মাটিতে।' এই মাটি কাশ্মীরের, এই মাটি সারায়েভো'র। এই মাটি ফিলিস্তিনের, এই মাটি ইরাকের। এই মাটি আফগানিস্তানের, এই মাটি সিরিয়ার। এই মাটি একাত্তরের বাংলাদেশের। এই মাটি ভিয়েতনামের। এই মাটি হিরোশিমার, এই মাটি নাগাসাকির। এই মাটি সাম্প্রতিক সময়ের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আরাকানের।

জীবন ও মৃত্যুর নোম্যানসল্যান্ডের সন্ধিক্ষণে এক ত্রিমাত্রিক প্রতীকী সংযোজনে 'রিজওয়ান' নাটকের চরিত্ররা কোনো অধিবাস্তব স্বর্গের সিড়িতে ওঠানামা করে। যেখানে দৃশ্যায়িত হয়েছে 'রিজওয়ান ও ফাতেমা' দুই ভাইবোনের স্মৃতি ও স্বপ্ন, বিয়োগ ও বিচ্ছেদের ঘটনাবলীর এক মেটাফোরিক নান্দনিক এক্সপোজিশন। রিজওয়ানের অগ্রজা ফাতিমা'র বয়ানে আমরা তা দেখতে পাই।

এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটের টানটান উক্তেজিত চিত্রকল্প, দৃশ্যমালা, শব্দ ও সংলাপ, বডিলাইন, কোরিওগ্রাফি, ব্লকিং, কম্পোজিশন, আলোছায়া ও মিউজিকের সংমিশ্রণে এক দুর্বোধ্য অথচ পরিচিত নির্মম বাস্তবের ইল্যুশন হলো 'রিজওয়ান'। হাসপাতালে রিজওয়ানের জন্মক্ষণেই শুরু হয় বিপত্তি। তারপর থেকেই রিজওয়ানের বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু। দাদু'র রাখা নাম 'রিজওয়ান', যার অর্থ স্বর্গের সিড়ির অত্ন্দ্র প্রহরী। যে কিনা এক বদ্ধ ঘরে নিহত পূর্বপুরুষদের লাশ পাহাড়া দেয়। সেখানে হাজির হয় দখলদার নিপীড়নকারী সেনাদল। যারা লাশের ভেতরে খুঁজে পাওয়া জীবিত রিজওয়ানকেই দায়ী করে তার নিকটজনদের খুনি হিসেবে। আর শাস্তি হিসেবে রিজওয়ানকেও তারা হত্যা করে।

এক কথায় 'রিজওয়ান' নাটকের গল্প এটুকুই। কিন্তু 'রিজওয়ান' নাটকে প্রদর্শিত ঘটনা পরম্পরা যেন হাজার বছরের জাতিগত সহিংসতা, বর্ণবিদ্ধেষ, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতার এক বিভমিষা প্রতীক। জীবন, মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী কল্পিত ঘটনাবলীর এক ত্রিমাত্রিক মেটাফর। প্রতিটি ইমেজই যেন এক একটা ভিন্ন ভিন্ন স্বয়ংভূত নাটক, ভিন্ন ভিন্ন ফ্রেমে বন্দী পেইন্টিংস। যেখানে প্রতিবার ফ্রেম ভেঙে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন দৃশ্যকাব্য, নতুন নতুন পেইন্টিংস। আলোছায়া, শব্দ-আবহ সংমিশ্রণে এক জীবন্ত ইল্যুশন।

'রিজওয়ান' নাটকের সবচেয়ে শক্তিশালী সংলাপ হলো, মৃত্যুর পর ফাতিমার যখন রিজওয়ানের সঙ্গে দেখা হয়, তখন সে দাবী করে 'ওরা (সেনাদল) আমাকে ধর্ষণ করেছে, আমিও ওদের পাল্টা ধর্ষণ করেছি। আমি ওদের গুলিতে মারা যাইনি। আমি বরফের ঠাণ্ডায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই মারা গেছি। এই দুনিয়ায় যদি কোনো জান্নাত থাকে, তবে সে জান্নাত এই মাটিতে, এই মাটিতে, এই মাটিতে।'

নাট্যাশ্চার্য অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ 'রিজওয়ান' নাটকে অসাধারণ আলোর ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলের পুরো স্পেস, প্রতিটি কোন, হরিজন্টাল-ভার্টিকাল, ভূমি থেকে ছাদ, দর্শকের সামনে পেছনে, উপরে নিচে সবটুকু জায়গার অসাধারণ নান্দনিক ব্যবহার সত্যি সত্যিই দেখার মত। নায়লা আজাদ নূপুরের কোরিওগ্রাফি ছিল অসাধারণ। মেডিটেশান করার মত আবহসংগীত ও ১৫ জন অভিনয়শিল্পী'র দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এক কথায় চোখে ধাঁধাঁ লাগিয়ে দেবার মত।

বিশেষ করে 'রিজওয়ান' চরিত্রে তিতাস জিয়া'র সুনিপুন অভিনয় এক কথায় অসাধারণ। ফাতিমা চরিত্রে মহসিনা আক্তার, আম্মি চরিত্রে এনামতারা সাকী, মা চরিত্রে মিতালী দাশ ও দাদু'র চরিত্রে সাজিদুর রহমানের অভিনয় মনে রাখার মত। নৌকায় চিঠি নিয়ে আসার দৃশ্যটি সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাই থিয়েটারের এক নান্দনিক সংযোজন।

তবে কিছু কিছু দৃশ্যকাব্যে ভাষ্যকারের ধারাভাষ্যতে অতিমাত্রার ব্যবহার ও সময় ক্ষেপণের কৌশল এবং আর্টিস্টদের দিয়ে একই সময়ে অভিনয়ের পাশাপাশি এমন জটিল সেট সংযোজন করার কাজটি করতে গিয়ে নাটকে দর্শকদের কিছুটা মনোসংযোগে বিপত্তি ঘটার আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ছয়জন সৈন্য যখন রিজওয়ানের লাশ নিয়ে মুখোমুখি বসে, তখন প্রত্যেকের বাম হাটুভাঙা থাকলেও একজনের ডান হাটুভাঙ্গা কিছুটা বিভ্রাট ঠেকেছে।

'রিজওয়ান' নাটকটির মঞ্চ, আলোক-পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ। পোষাক পরিকল্পনা ও কোরিওগ্রাফি করেছেন নায়লা আজাদ নূপুর। সংগীত নির্বাচন করেছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। গানের সুর (সুদূর পাহাড় দিয়ে...) করেছেন মিতালী দাশ। প্রচার ও প্রকাশনা ও ডিজাইন করেছেন শাহীনুর রহমান। চাকমা ভাষায় রূপান্তর করেছেন মৌটুসী চাকমা। আর মিলনায়তন ব্যবস্থাপনায় ছিলেন রেহেনা রাহা।

সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বমুখর সময়ে অধিবাস্তব নাট্যকাব্য 'রিজওয়ান' উপহার দেওয়ার জন্য নাট্যাশ্চর্য সৈয়দ জামিল আহমেদকে আন্তরিক অভিনন্দন। দীর্ঘদিন পর ঢাকার থিয়েটারে নতুন চিন্তা ও প্রক্ষেপণের যে কৌশল সৈয়দ জামিল দেখালেন, তা নিশ্চয়ই অন্যান্য থিয়েটারওয়ালাদের নতুন নতুন চিন্তা, কৌশল ও প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। নাটবাঙলা নাট্যোৎসের সঙ্গে জড়িত সকলকে আমার অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। জয়তু 'রিজওয়ান'। জয়তু সৈয়দ জামিল।

--------------------------
৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ২:৪৫
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্প না

লিখেছেন নীলপরি, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১২:৩৫




তুলে রেখেছি এক চিলতে কল্পনা
আর অল্প একটু জল্পনা
জেনো , এসবই হোলো গল্পনা!


যখন জ্যোৎস্না-নদী হাত বাড়িয়ে ডাকে
রাত-পাখী চোখ খুলে রাখে
ওরাই তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার অ্যাটাক

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১২:৫০



রাত ১২।০০ বাজে। ঢাকার অদূরে উপশহরের নির্জন এক বাগান বাড়ির হলুদ রঙা তিন তলা বিল্ডিং এর ২য় তলায় জঙ্গিদের সভা বসেছে। বিদ্যুৎ থাকলেও সবক’টা বাতি নিভিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে সভাকক্ষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ ভাঙাচোরা স্বপ্ন

লিখেছেন স্রাঞ্জি সে, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১:০৭



নির্ঘুম রাত প্রহরী আমি এক ব্যর্থ কিশোর
ঘোমট তিমির অন্দরে ডুবে থাকা সব স্বপ্ন,
সবি আশার দেনাপাওনা নীলাভ গভীরে প্রোথিত হয়ে
একচ্ছত্র হারিয়ে যাওয়ার শূন্যতার অনুভবে মগ্ন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা এবং ডঃ কামাল হোসেন দ্বন্দ্ব ও আওয়ামী লীগ থেকে কামাল হোসেনের বেরিয়ে আসার সেই দিনগুলো কেমন ছিল ? :(

লিখেছেন :):):)(:(:(:হাসু মামা, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ২:৫৯


শেখ হাসিনা এবং ডঃ কামাল হোসেন দ্বন্দ্ব ও আওয়ামী লীগ থেকে কামাল হোসেনের বেরিয়ে আসার সেই দিনগুলো কেমন ছিল ? :(
১৯৯১ সালের নির্বাচন। সে নির্বাচনে জয়লাভের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি ছাড়া কে এমন ভালোবাসবে?

লিখেছেন সামিয়া, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:৩৮




তোমার অদৃশ্য রুপ দেখতে দেখতে একদিন স্পষ্ট বাস্তব,বিশাল সমুদ্রের শূন্যতার ভেতরে উত্তাল তবু একাকীত্ব জীবনের মোড় নিল নতুন জীবনে।
দিগন্ত রেখার বাইরে নিয়ে যায় সে জীবন রোজ রোজ নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×