দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন আজ থেকে আবার শুরু
আত্মীয়তার সম্পর্ক নির্ধারণে চিকিৎসকদের আগের চেয়ে বেশি সতর্কতা থাকার পরামর্শের উপর নির্ভর করে আজ শনিবার থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম আবার শুরু হচ্ছে। প্রায় দেড় মাস বন্ধ থাকার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিস্থাপন কাজ শুরু হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
সম্প্রতি জয়পুরহাটের একাধিক গ্রামে প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কিডনি কেনাবেচার ঘটনায় সারাদেশে এর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। কেনাবেচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে চিকিৎসকরাও জড়িত থাকার বিষয়টি নিয়ে নানা সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কিডনি প্রতিস্থাপন নিশ্চিত করার উপায় খুঁজে বের করতে এবং প্রণীত আইনের আলোকে প্রবিধি তৈরি করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়।
কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও কিডনি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. হারুন-উর-রশীদকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি প্রসত্মাবিত প্রবিধিটি আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দেবে। মানবদেহে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯ এর আলোকে এ প্রবিধি প্রণীত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রবিধিতে সারাদেশের কোন কোন হাসপাতাল কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজন করতে পারবে তার ধরন নির্ধারণ করা ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দানে আত্মীয় নির্ধারণে জাতীয় কমিটি প্রণয়ন করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া যেসব হাসপাতালে বেশিসংখ্যক কিডনি প্রতিস্থাপন হয় তার জন্য জাতীয় কমিটির বদলে প্রাতিষ্ঠানিক কমিটি গঠন করাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
জাতীয় অথবা প্রাতিষ্ঠানিক কমিটিতে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজনের সঙ্গে জড়িত কোন চিকিৎসক (ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন, ইউরোলজিস্ট কিংবা নেফ্রোলজিস্ট) সদস্য হতে পারবেন না। এ সব মানা না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ থাকবে বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানায়।
বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রণীত নীতিমালাটি নির্দেশনা অনুযায়ী দুই/এক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে উচ্চ উচ্চ আদালতে জমা দেবে বলে জানা যায়।
প্রবিধি কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় কিডনি ইন্সটিটিউট হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. জামানুল ইসলাম ভূঁইয়া, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ফিরোজ খান ও স্বাস্থ্য অধিদফতর হাসপাতাল এবং ক্লিনিক শাখা-১ এর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ডা. একরামুল হক।
সূত্র জানায়, কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজনে আত্মীয়তা নির্ধারণের জন্য সাত সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হবে। কমিটিতে একজন জাতীয় অধ্যাপক, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, প্রেস কাউন্সিল, মানবাধিকার কাউন্সিল, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিনিধি থাকতে পারেন।
দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাজধানীর ১০টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ৮৭৮টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তার মধ্যে কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটে ২১৮টি, আল মারকাজুল ইসলামী হাসপাতালে ৭৫টি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪টি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ৪২১টি, বারডেম হাসপাতালে ৮৯টি, ইউনাইটেড হাসপাতালে ৩০টি ও এ্যাপোলো হাসপাতালে ১৪টি কিডনি এবং ল্যাব এইড স্পেশালাইজড হাসপাতালে ২টি, পপুলার মেডিকেল কলেজে ৫টি, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে ২০টি লিভার প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
১৯৯৯ সালে প্রণীত আইনের ৭ এর (২) ধারা অনুযায়ী অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজনকারী প্রতিটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক বা সমমর্যাদাসম্পন্ন কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজন সমন্বয়কারী নিয়োগ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, দেশে মোট কিডনি দান ও গ্রহণের ৮০ শতাংশই ঘটছে মা-বাবা ও ভাই-বোনের মধ্যে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে বাকি ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে। এ ২০ শতাংশ কিডনি রোগীর ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় বা দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের কাছ থেকেও কিডনি পাওয়া না গেলে বিক্রেতাদের দ্বারস্থ হয় অনেকে। অথচ আইনে আত্মীয়ের বাইরে কারও কিডনি নেয়া নিষিদ্ধ।
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে প্রতি ডায়ালাইসিসের খরচ ৮শ' টাকা হলেও প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে লাগে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা।
কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ধীরে ধীরে কিডনি অকেজো হওয়ার পেছনে নেফ্রাইটিস শতকরা ৪৫ ভাগ, ডায়াবেটিস ২৫ ভাগ ও উচ্চ রক্তচাপ শতকরা ১৫ ভাগ দায়ী। এদের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার রোগীর কিডনি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, এসব রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজন করা প্রয়োজন। ডায়ালাইসিস এবং সংযোজন খুবই ব্যয়বহুল। একজন রোগীকে ডায়ালাইসিস অথবা সংযোজন করে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিবছর প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, কিডনি ইনস্টিটিউট, বারডেম, কিডনি ফাউন্ডেশন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজসহ আরো বেশ কিছু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়মিত ডায়ালাইসিস চলছে। সব মিলিয়ে দেশে ডায়ালাইসিস সেন্টারের সংখ্যা প্রায় ৪০টি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে ডায়রিয়া, অতিরিক্ত বমি, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, বিভিন্ন রকম ইনফেকশন, ম্যালেরিয়া, প্রসবকালীন জটিলতা, সাংঘাতিক ধরনের নেফ্রাইটিস, বিভিন্ন ওষুধের পাশ্বপ্রতিক্রিয়া ও কিডনির পাথরের কারণে হঠাৎ করেও কিডনি অকেজো হয়ে যায়। এ ধরনের কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ করা যায়। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা করলে অনেকের কিডনি পুনরায় স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরে পায়।
এতে দেখা গেছে, দেশে ধীরে ধীরে কিডনি অকেজো হওয়ার পেছনে নেফ্রাইটিস শতকরা ৪৫ ভাগ, ডায়াবেটিস ২৫ ভাগ ও উচ্চ রক্ত চাপ শতকরা ১৫ ভাগ দায়ী। এদের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার রোগীর কিডনি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাচ্ছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


