somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবির সংসার

০২ রা মার্চ, ২০১৫ দুপুর ১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবির সংসার
রায়ান নূর


ঘরের চাল বাড়ন্ত ৷ কবি নওয়াজ সেই বিকালবেলা বসেছে কাগজ কলম হাতে দুইপায়া জীবের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে ৷ তাদের জীবন-যাপন মানুষের মত হতে পারত কিন্তু কেন হলো না? তারা চাইলে নিজেদের মস্তিষ্ক শাণিত করতে পারত কিন্তু কেন পারল না ৷ এসব আজগুবি চিন্তায় রাত আটটা পেরিয়ে দশটায় পৌঁছল ৷

গিন্নী গিয়েছে তার কোন এক বান্ধবীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ৷ সেদিকে খেয়াল নেই কবি নওয়াজের ৷ চিন্তার কোন কূল-কিনারা না পেয়ে পশুদের উপর মনুষ্যগুণ আরোপ করে যখন উঠতে যাবে ঠিক তখনোই একটা আইডিয়া মাথায় চেপে বসে ৷ সে কিনা হতে পারত!
নওয়াজ যদি চিত্রশিল্পী হত তবে নিশ্চয়ই তার গিন্নী সবসময় পানির গ্লাস,খাবার,তুলি-কালি নিয়ে অধীর আগ্রহে বসে থেকে ছবি আঁকা দেখত ৷ তার ছবির কত প্রশংসা করত কেননা তার স্বামী এলাকার একজনই ৷
নওয়াজ যদি বড়লোক হত ৷ মেহেরজান নিশ্চয়ই পানীয়ের সাথে এককাপ হুইস্কি রাখত ৷ বড় মধুর হত তার জীবন ৷ যেকোন সময় প্রয়োজনে একটা মাইক্রোবাস থাকত যাতায়াতে ৷ কত মহামান্য ব্যক্তি তার বাড়িতে ফুলের তোড়া হাতে সম্মোধন করত ৷

নওয়াজের চিত্ত আন্দোলিত হয় এমন ভাবনায় ৷ সে অনেক আশাবাদী, কারণ সে জানে কবিরা কখনো গরীব হয় না;সবই সম্ভব ৷ বড় একটা কাগজ দেয়ালে আঁটকে সে কলম দিয়েই ছবি আঁকতে বসে যায় ৷ ছবি মনে আসে কিন্তু কলমে আসে না ৷ সে জানে শিল্পীরা যখন ছবি দাঁগাতে বসে তখন সাদা কাগজে নাকি ছবি ভেসে ওঠে ৷ এই অভিজ্ঞান থেকেই তার এ বৃথা পরিশ্রম ৷
একটা ভালো ছবির মতো ছবি আঁকাতে ভালো তুলি-কালি দরকার ৷ কলম দিয়ে কি ছবিতে প্রাণ আসে! রঙই তো আসল জিনিস যা ভিতরকে বাহিরে আর বাহিরটাকে ভিতরে আচ্ছন্ন রাখে ৷ সে ভাবল এক্ষুনি হয়ত মেহেরজান তুলি আর কালি নিয়ে চলে আসবে ৷ তার মনে হল যাবার আগে স্পষ্টভাবে তুলি আর কালি আনার কথা মেহেরজানকে সে বলেছে ৷

মেহেরজান আসলো ৷ এসেই তো রেগে অস্থির ৷ নওয়াজও ধৈর্য্যহারা হয়ে বলল,
‘মেহেরজান মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে ৷ শীঘ্রই তুলি আর কালি দাও তো ৷’
‘আমি কি কালি বানাবো ৷ বিকেলে বাজারে গিয়েছিলে?’
‘তোমাকে যাবার সময় বললাম তো তুলি কালির কথা ৷’
‘তোমাকে কি বাজারে যাবার কথা আমি বলি নি?’
‘রাখো তো বাজার,আসলেই শুধু বাজার,কালি থাকে দাও ৷’

মেহেরজান ধনী ঘরের মেয়ে তাই এই কথা তার সহ্য পেলনা ৷ রাগ করে বালিশে মুখ বুজে শুয়ে পড়ল ৷ বান্ধবীর বাড়িতে খেয়ে এসেছে কিন্তু নওয়াজ সে কথা জানে না ৷ রাত বারোটা বেজে আসলো তবু মেহেরজানের এতটুকু সাড়া নেই ৷ অবাক হল না নওয়াজ, হয়তো অভিমান করে এমনি শুয়ে আছে ৷ কাছে গিয়ে একটু আদর করলেই আবার আগের মতো হয়ে যাবে ৷
ক্ষুধা ক্রমে বাড়তে লাগল ৷ সেই দুপুরে তাড়াহুড়ো করে দুগ্রাস ভাত মুখে দিয়েছে ৷ দেহের ক্ষুধা আর পেটের ক্ষুধা যেন মানসিক ক্ষুধাতে পরিণত হলো ৷
রাত দুইটা বেজে আসলো,চলে গেল মাথা থেকে সকল আইডিয়া ৷ এখন তার একটাই ভাবনা সে কেন কিছু হতে পারে না? খুঁজতে লাগল তন্ন তন্ন করে খাবারের উৎস ৷ খাদ্য এর মূল কারণ যখন ক্ষুধা তার চরমে ৷
কিছু চাল ছিল ঘরে ৷ উনুন ধরায়ে সবটুকু ভাজতে লাগল কড়াই করে ৷ এই উপস্থিত বুদ্ধিটা তার তৎক্ষণাৎ এসেছিল তাই আর বিচারের অপেক্ষা রাখল না ৷ লবণ আর পোড়া মরিচে সবটুকু সাবার করে আবার বসে পড়ল কলম হাতেই ৷
রাত্রী শেষ নাগাদ একটা ছবির একটা চরম আইডিয়া মাথায় আসলো ৷ কয়েকটা কলম হাতে বসে পড়ল কাগজের সামনে ৷ আঁকালো একটা অদ্ভুত প্রাণী যার হাতে একটা খাঁচকাটা ছুড়ি আর এক হাতে বিষের শিশি,যার এক পায়ের নিচে সাগর আর এক পায়ের নিচে আগ্নেয়গিরি ৷ চেয়ে আছে আকাশের দিকে যেখানে উড়ছে শাদা শাদা আর রঙীন পাখি ৷ প্রাণীটির বুকে জড়িয়ে আছে এক সাপ যার ছোবল তার মুখের দিকে ৷ তার মাথাটা খর্বাকৃতি কচ্ছপের মতো ৷ ততক্ষণে সকল কলমের কালি শেষ ৷ তাই ইচ্ছে করলেও পারে না আর কিছু বিশেষণ যোগ করতে ৷ অতৃপ্তি রয়েই গেলো,কালকে এর ফিনিশিং টা দেবে কিন্তু তার কিছু টাকা দরকার আগে ৷ মেহেরজানকে বললে মনে হয় কিছু টাকা পাওয়া যাবে ৷ যে কিনা বান্ধবীর অনুষ্ঠানে দুইহাজার টাকার উপহার কিনতে পারে তার কাছে পঞ্চাশ টাকা মোটে কিছুই না ৷
দুই ঘণ্টার মত ঘুম পেড়ে বউ এর চিৎকার চেচামেচিতে ঘুম ভাঙলো নওয়াজের ৷ উঠেই মাথায় হাত দিয়ে ঠায় বারান্দায় বসে পড়ল ৷ ততক্ষণে পাড়ার লোকেরা হাজির ৷ কি হয়েছে! নওয়াজ জানে না ৷ বউ এর চিৎকারেই সে জানলো তার মূল ঘটনা ৷ বলতে শুনল,‘এ ঘর-সংসারে আর একদিনও নয়,দুইকেজি চাল রাতে একলা সাবার করেছে খোক্কসের মতো ৷ সংসার কি আমার একার, নাকি আমার বাপে চালাবে ৷ কত ঢঙে হয়েছে কবি তাই জগত জোড়া সুখ্যাতি কিন্তু পেটে ভাত জোটে না, কই ভিক্ষে করার তো মুরৎ হয় না ৷ ঝোলা নিয়ে বেরোলেও তো কেউ দু পয়সা দয়া করত ৷ ’

নওয়াজ ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে একবার চেয়ে দেখে, ঘরের বাসনকোসন আর আসবাব পত্রগুলো ফেলে দিয়ে ভেঙে ফেলেছে, যেগুলো সে নিজে কিনেছিল ৷ চোখের পলকে মেহেরজান একটা মিনিট্রাকে সকল বাপের বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে রওয়ানা দিলো ৷ নওয়াজ সে দিকেই চেয়ে থাকে কিন্তু মেহেরজান একবারও একটু ফিরে তাকালো না ৷ নীরবে দু ফোঁটা চোখের জল কেবল গড়িয়ে পড়ল নওয়াজের,ততক্ষণে বাড়ি জনশূন্য হয়েছে ৷

ছোট একটা ছেলে ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে বলল,
‘কাক্কু ছবিটাতে যাকে দেখলাম,ওটা কি মানুষ?’
নওয়াজের হাসি পেল,তবু হাসি চেপে বলল,‘কাক্কু,মানুষের মতো দেখতে হলেও সবাই কি মানুষ ? হা,ওটাও একটা মানুষ,তবে দুইপায়া মানুষ ৷’
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=মনে রং নেই আর=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫২


মন তো ছিল গোলাপী রঙ আভায় বন্দি, মন ছিল চন্দ্র মল্লিকা,
মন আর সেই মন নেই, মনের চারিপাশে এক সমুদ্দুর কুহেলিকা;
মন যেন পাথর হয়ে আছে, নেই অফুরন্ত ফুরসত
মন গোলাপী রঙ নয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতটা নির্লজ্জ বেহায়া ভিসি সারা দুনিয়াতে নেই-- ছি:

লিখেছেন অপলক , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০১

একটা মানুষ কতটা নির্লজ্জ হতে পারে, সেই সাথে ক্ষমতার+ টাকার+ সরকারী সুবিধাদী পাবার কাঙ্গাল হতে পারে, চুয়েটের ভিসি (Vice-Chancellor) কে না দেখলে জানতেই পারতাম না। এতদিন শুধু লোভী বলে বুবু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিতে আতঙ্ক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫০


দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মানুষজন । সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছেন প্রবীণ নেতা নিতাই চন্দ্র রায়। এই অবস্থায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেয়ালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়, গ্রাফিতিতে চুনকালি ও পলিটিক্যাল ইসলাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০৪


রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের লেখা পড়ে আমি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে একাধিকজন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×