
সামু ব্লগে ব্লগ ও ব্লগার রিলেটেড বহু পোষ্টই লেখা হয়েছে। আমিও এমন অনেক পোষ্ট লিখেছি। তবে নন ব্লগারদের নিয়েও একটা পোষ্ট লেখা উচিৎ বলে মনে হলো। যারা ব্লগে শুধুই পাঠক, মনে মনে চান ব্লগার হতে কিন্তু সাহস পাচ্ছেন না, অথবা যারা ফেসবুকে বা অন্যকোন মাধ্যমে বিখ্যাত লেখক কিন্তু ব্লগে লেখেন না কঠিন মডারেশনের জন্যে, এই পোষ্ট তাদেরই জন্যে।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আপনি বহুদিন ধরে সামুর পাঠক। কিছু কিছু প্রিয় ব্লগারের লেখা না পড়লে দিনটা পারই হয়না। প্রতিদিনই সময়ে অসময়ে ঢুঁ মেরে যান ব্লগে। সামুর ব্লগারদের উন্নতমানের লেখা এবং পারস্পরিক বন্ধুতা দেখে মাঝেমাঝে ভাবেন যে নিজেও যদি ব্লগিং করতে পারতেন! তারপরে ভাবেন, নাহ! কি দরকার ঝামেলার! পাঠক আছি, বেশ আছি। লেখালেখি কিভাবে করতে হয় তা তো জানিই না।
১) লেখালেখির জগতে হাতেখড়ির উপযুক্ত পরিবেশ: আনকোড়া লেখকদের জন্যে সামু ব্লগ ভীষনই সাহায্যকারী একটি প্ল্যাটফর্ম। একটা সময়ে বাংলা ভার্চুয়াল লেখালেখির জগতটা সামুকেন্দ্রিক ছিল, সামু তখন প্রচুর লেখক তৈরি করেছে। সামু লেখক লেখিকা তৈরির প্রমাণিত কারখানা।
যেহেতু সামু ব্লগে সব ধরণের লেখাই পাওয়া যায় তাই আপনাকে একেবারে দক্ষ কবি বা ঔপন্যাসিক হতে হবে তা কিন্তু নয়। আপনি যদি ভালো ছবি আঁকেন বা তোলেন, তবে ছবি ব্লগ দিতে পারেন। যদি ভালো রান্না পারেন তবে সেসব রান্না কিভাবে করলেন সেটা লিখতে পারেন। যদি বাগান করার শখ থাকে তবে নিজস্ব জ্ঞান অনুযায়ী কৃষি নিয়ে বলতে পারেন। বন্ধুদের সাথে হয়ত সমাজের নানা বিষয় নিয়ে আপনি তুখোড় আলোচনা করেন। যেসব সমসাময়িক বিষয়ে মতামত দিয়েও পোষ্ট দিতে পারেন। প্রথম প্রথম হয়ত খুব গুছিয়ে লিখতে পারবেন না। কিন্তু প্রতিটি সামনের পোষ্ট আপনার লাস্ট পোষ্টের চেয়ে ভালো হবে। যতো লিখবেন, বা যে শখের চর্চা ব্লগে করবেন সেটাতে আরো উন্নত হবেন। কেননা সেটা আপনার নিজের মধ্যে না থেকে ছড়িয়ে পড়বে নানা মানুষের মাঝে। আপনিও তাই সচেতন ভাবে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করবেন।
মোটকথা ব্লগিং করতে ব্লগিং শিখে আসার প্রয়োজন নেই, ব্লগিং করতে করতে শেখার প্রসেস চলতে থাকে। শুধু নিজে লিখে নয়, গুণী ব্লগারদের লেখা পড়েও কিন্তু শেখার অন্ত নেই। অন্যান্য ব্লগারদের লেখা পড়ে সুন্দর সব মন্তব্য থেকেই শুরু হয় অনেক ব্লগারের পথচলা। একপর্যায়ে দেখা যায়, তারা এক দুটি গল্প কবিতা লিখতে লিখতে বইমেলায় বইও প্রকাশ করে ফেলেন! সবকিছুর প্রথম ধাপ ছিল সৎসাহস নিয়ে সামুতে একাউন্ট খোলা!

২) ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনে কমিনিউকেশনে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন: সামু এমন এক গৃহ যাতে নানা মতামতের মানুষ বসবাস করেন। আপনি একটি পোষ্ট দিলেন, সেই পোষ্ট নিয়ে দশটা মানুষ দশভাবে ভাববে। আপনাকে নিজেদের পয়েন্ট অফ ভিউ যুক্তিসহকারে বোঝাবে। মাঝেমাঝে আপনার ভাবনাটির ত্রুটি ধরে আরো ব্যাখ্যা করতে বলবে। তখন আপনি সে বিষয়টি নিয়ে আরো গভীরভাবে যুক্তি দিয়ে ভাববেন এবং সবার সাথে আলোচনা করবেন। কোন রাগ, ঘৃণা নয়, সম্মান নিয়ে বিপরীত বিশ্বাসী মানুষের সাথে তর্ক করা ভীষন বড় একটি গুণ। এর প্রয়োজনীয়তা ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনেও অনেক জরুরি। ব্লগে মন্তব্য প্রতিমন্তব্যের চর্চায় আপনি এ গুণে মাহির হয়ে উঠবেন। যেকোন টপিক নিয়ে লিখে বা অন্য ব্লগারদের লেখা পড়ে আলোচনা করে করে আপনার জ্ঞান বাড়বে। শুধু ভার্চুয়াল নয়, বাস্তবজীবনেও এর প্রতিফলনে কথাবার্তায় পটু এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন।

৩) সৃষ্টিশীলতায় কেটে যাক অবসর: ব্লগিং করা ভীষন আনন্দদায়ক এবং রিল্যাক্সিং একটি কাজ। প্রথম প্রথম একটু কঠিন মনে হলেও কিছুদিনের মধ্যেই মজাটা অনুভব করতে শুরু করবেন। আপনি একটি করে পোষ্ট লিখছেন এবং বাংলা লেখালেখির জগতে একেকটি কন্টেন্ট ক্রিয়েট করছেন। আপনি যে বিষয় নিয়ে লিখছেন গুগল বাংলায় কেউ সে বিষয়টি নিয়ে সার্চ করলে আপনার লেখাটি খুঁজে পাবে। অমর হয়ে থাকবে আপনার সৃষ্টি! আপনার সৃষ্টি সময়ে অসময়ে কাউকে আনন্দ দেবে, কারো উপকার করবে। তাই অবসর সময়ে টিভি বা ঘুমের মাঝে না কাটিয়ে ব্লগিংকে হবি হিসেবে বেছে নিব। সৃষ্টিশীলতায় মাতুন অবসরেও!

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আপনি সামুতে কেবলই পাঠক হিসেবে আসেন। পড়ে চলে যান। কিন্তু লেখালেখির অভ্যাসটি আপনার আছে। হয়ত বেশ দক্ষ লেখক। সামুতে লেখার উৎসাহ পাননা কঠিন মডারেশনের জন্যে। অন্যকোথাও পরিচিতি তৈরি হয়ে আছে, তাই সামুতে শুরু থেকে শুরু করতে ইচ্ছেও করেনা।
৪) অন্যের সুচিন্তিত, নিরপেক্ষ গাইডেন্স পাবেন: ধরে নিলাম আপনি ফেসবুকে ফেমাস লেখক, সামু ব্লগে শুধু পড়তে আসেন। এখানে কেউই আপনার ইয়ার, দোস্ত, আত্মীয় না। যদি কেউ প্রশংসা করে জানবেন মন থেকে করেছে, কেউ যদি সমালোচনা করেন তার পেছনেও সৎ কারণ আছে। এখানে কেউ আপনাকে খুশি করার জন্যে বা স্পেসিফিক্যালি আপনাকে হার্ট করার চেষ্টা সাধারণত করবেনা।
সামু পরিবারের একটি বৃহৎ অংশ শিক্ষিত এবং রুচিশীল। সেকারণে যেকোন লেখা নিয়ে তারা সুন্দর মতামত দিয়ে একজন লেখককে ভালো মন্দ বোঝাতে পারেন। লেখালেখির নানা ধরণের টিপস, ট্রিকস পাঠকের মন্তব্যেই খুঁজে নেওয়া যায়। বানান ভুল, বাক্য গঠনে অদক্ষতা সহ নানা সূক্ষ্ম বিষয়বস্তুও সামুর ব্লগারদের চোখ এড়ায় না। বেশিরভাগ ব্লগারই খুব মার্জিত ভাষায় সমালোচনা করেন, সেকারণে সমালোচনাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিতে সমস্যা হবার কথা না। অপরিচিত মানুষদের নিরপেক্ষ, এবং বুদ্ধিদীপ্ত মতামত আপনাকে সাহায্য করবে নিজের ভুল ত্রুটিগুলো জানতে এবং শোধরাতে।

৫) নতুন এবং ব্যতিক্রমী মানুষের সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব: ব্লগের সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এখানে নানা বয়স, স্থান, পেশার মানুষ শুধু ব্লগার পরিচয়ে একত্রিত হয়েছেন। সবারই নিজস্ব মূল্যবোধ ও বিচার বিবেচনা আছে। বাস্তব জীবনে আপনি স্কুল/ভার্সিটিতে সমবয়সীদের সাথে মিশছেন, অফিসেও একই পেশার মানুষেরা একত্রিত হচ্ছেন। অন্য নানা বিষয়কেন্দ্রিক ব্লগ অথবা ফেসবুক পেইজে একই বিষয়ের লেখক লেখিকার সমাবেশ ঘটছে। কিন্তু সামু ব্লগ একটি পাঁচমিশালি ব্লগ, বিধায় এখানে আপনি ভিন্ন স্বাদের লেখা ও লেখকের সাথে পরিচিত হতে পারবেন। অন্যদের দেখাদেখি নিজ জনরা থেকে বেড়িয়েও কিছু লেখার চেষ্টায় আরো উন্নত হবেন।
প্রথম প্রথম ব্লগে কারো সাথেই আপনার পরিচয় থাকবেনা। সবার সাথে আপনাকে আস্তে আস্তে বন্ডিং তৈরি করতে হবে। নানা ধরণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতামত ও চিন্তার আদান প্রদান করতে করতে সুন্দর আন্তরিক বন্ধুত্ব যে কখন গড়ে উঠবে টেরও পাবেন না। আর নানা মতের মানুষের সাথে মিশতে গিয়ে আপনার ভাবনার গন্ডি বিশাল আকার ধারণ করবে। যেসব ব্লগারের ফ্যান আপনি, একসময়ে দেখবেন তাদের সাথেও ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে!

৬) চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে হয়ে উঠবেন দক্ষ, শানিত: ব্লগে পরিচিতি লাভ করা অন্য অনেক প্ল্যাটফর্মের চেয়ে ভিন্ন। এখানে অনেক দক্ষ এবং অভিজ্ঞ লেখক লেখিকা আছেন, উন্নতমানের পাঠক আছেন। এক লাইন লিখে এখানে আপনি একশ দূরের একটা লাইকও পাবেন না। সামুতে সেইফ হওয়া বা প্রথম পাতায় জায়গা পাওয়াও বেশ কঠিন। প্রথম পাতায় জায়গা পেতে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। আলোচিত এবং নির্বাচিত পাতায় জায়গা পেতে আপনাকে উন্নতমানের পোষ্ট লিখতে হবে। ব্লগে যাই পাবেন মেধা ও শ্রম দিয়ে পাবেন। এসব পড়ে ভয় পাচ্ছেন?
ভাবুনতো যদি আপনি একটি কঠিন জায়গায় সফল হতে পারেন তবে কি ভীষন আত্মবিশ্বাস জন্মাবে আপনার মধ্যে? ব্লগিং এর শুরুতে স্ট্র্যাগলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে আপনার লেখার হাতও খুলতে শুরু করবে। সবার আলোচনা সমালোচনায় আপনার মনে হবে আরো ভালো কিছু লিখি! ব্লগে প্রথম মন্তব্য, প্রথম লাইক, প্রথম আলোচিত ব্লগ অথবা নির্বাচিত পাতায় ঠাঁই পাওয়ার অনুভূতিই আলাদা। অন্যরকম একটা আনন্দ এবং গর্ববোধ করবেন। সামু ব্লগের একেকটি সিড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে কঠিন কিছু জয়ের অনুভবে আপনি ভার্চুয়াল ও রিয়েল লাইফে লেখনী, কথাবার্তায়, আলোচনায় হয়ে উঠবেন আরো দক্ষ!

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
ওহ! সামুতে ব্লগার হয়ে কি কি পাবেন তা তো বললামই। কি হারাবেন সেটাও বলি। হুমম, আসলে হারানোর কিছুই নেই আপনার। তাই মনের সংশয় কাটানো কঠিন কিছু নয়! জাস্ট ট্রাই ইট, ইউ মে এনজয় ইট মোর দ্যান এনিথিং!
আমি কিন্তু কোনভাবেই এটা বোঝাতে চাচ্ছি না যে পৃথিবীর সবাইকে ব্লগার হতেই হবে বা সামুতে আসলে শুধু পাঠক হয়ে থাকা যাবেনা। কিন্তু যাদের মধ্যে লেখালেখির প্রতিভা আছে এবং সেটা অন্যকোন মাধ্যমে প্রকাশ করছেন, তারা সামুর ব্লগার হলে সামুকে এবং নিজেকে আরো উন্নত করতে পারবেন। আর যাদের মনে সামুর ব্লগার হবার ইচ্ছে মাঝেমাঝেই উঁকি দিয়ে যায় কিন্তু সাহস পান না, দোমনায় আছেন তাদের ভাবনার পথকে আরো সহজ করার জন্যেও এ পোষ্টটির জন্ম।
যদি লেখাটি পড়ার পরে আপনার মনে ব্লগিং এর ইচ্ছে জাগে, তবে এই পোষ্টটিও দেখতে পারেন। এটি লেখা হয়েছে একেবারে নতুন ব্লগারদের জন্যে: সহায়তামূলক পোষ্ট; সামুতে স্ট্র্যাগলিং নতুন ব্লগারদের কমন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর। নতুন ব্লগারদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।
নতুন নতুন ব্লগার সামুতে এসে নিজ মেধা ও শ্রম দিয়ে সামুকে আরো উন্নত করবে সে আশায় শেষ করছি।
ছবিসূত্র: অন্তর্জাল!
তথ্যসূত্র: নিজ ব্লগীয় জীবন!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

