somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার ধার্মিক ভীতি

০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ১১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১. মানুষের মুখ বড় ভয়ঙ্কর। সে বলতে চায়। যা জানে, তা। আর যা জানে না, তা আরও বেশি। ফেসবুক জ্ঞানে টইটুম্বুর করা এই সময়ে আমারও কতকিছু মন চায়। খুব বেশি চাইলে নিজেকে সুবোধের মতো স্বান্তনা দেই। সুবোধ তুই কী জানস ব্যাটা মূর্খ, চুপ থাক, চোখ বোজে থাক, নিরাপদ থাক।


তবু মানুষ বলে কথা, এই যেমন আজ বলছি। ভীতি ও প্রীতি দু’টোই বেশ আক্রান্ত করে আমাকে। আজও আক্রান্ত হওয়ার ভয় নিয়েই লিখছি। যখন লিখছি তখন পুরো দুনিয়া ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণা নিয়ে উত্তাল। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বাহিনীর আঘাতে কয়েকশ প্রতিবাদকারী আহত হয়েছে, নিহতও হয়েছে কয়েকজন। ধর্ম প্রশ্নে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান বলে এদেশেও এর বাতাস লেগেছে পুরো দমে। ফেসবুক সরগরম, অনেকে প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করেছে। এই যে এসব হচ্ছে, এর সবই ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে। আহতদের করুণ ছবি আর ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসী মূর্তি ফুটিয়ে তুলতে আমরা ব্যস্ত। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। যারা ধর্মে মুসলমান না এ দেশে, মোটা দাগে তারা এ ইস্যুতে চুপচাপ। এই চুপচাপ থাকাটাও কিন্তু ধর্মীয় বোধ থেকে। তবে এপার বাংলার সংখ্যালঘুরা চুপচাপ হলেও সীমান্তের ওপারে বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগুরুরা বেশ সরব। তাদের অনেকেই ট্রাম্প পূজার ডাক দিয়েছেন নতুন করে। উল্লাস প্রকাশ করে বলছেন, শতাব্দীর সেরা কাজ করেছে ট্রাম্প। কেউ কেউ ঐতিহাসিকভাবে জেরুজালেম ইহুদিদেরই পবিত্র স্থান এ বিষয়টিও প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে চলছে দুই বাংলার মানুষের মধ্যে যুদ্ধ। আসলে মানুষ না, দুই বাংলার হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে। এক্ষেত্রে দুই পাড়ের সংখ্যাগরিষ্ঠরা সরব হলেও, সংখ্যালঘুরা চুপচাপ। মাইরের ভয় বলে কথা।


২. এই যে কথার যুদ্ধ চলছে তার রংটা রাখঢাক ছাড়াই ধর্মীয়। দুই বাংলার সীমান্ত এক হলে হয়তো কথা থেকে হাতাহাতি তারপর কাটাকাটি হতো। জেরুজালেমে যে রক্ত ঝরল তা নিয়ে উল্লাস প্রকাশের যে উন্মত্ততা তার উপাদান একজন মানুষ ধর্ম থেকে পেয়েছে। নিজ ভূমি থেকে একদল মানুষকে বিতারিত হতে দেখে আরেকদল মানুষের যে উল্লাস তার কারণ ধর্মীয় ভিন্নতা। এরা ধর্মের জন্য মানুষকে জবাই করতে পারে, মাকে ন্যাংটা করে নাচাতে পারে, বোনকে ধর্ষণ করতে পারে। ধর্মের নামে লুটপাট আর রাহাজানি একটা কমন ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে আজকাল। বাংলাদেশের মানুষ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবু তাদের ৭১ এ দেখতে হয়েছিল আরেক দল মুসলমানের কাছ থেকেই ধর্ম নামীয় বর্বরতা। যে বর্বর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটি দেশের জন্ম হলো সে দেশেও বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর উপরে একই বর্বরতা বারেবারে চাপিয়ে দেওয়া হলো। মাত্র ক’দিন আগে রংপুরে ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার নামে কতগুলো বাড়িঘরে আগুণ দেওয়া হলো, লুটপাট চললো, গরীব একদল মানুষকে নি:স্ব করা হলো। স্বদলবলে যারা এভাবে হামলে পড়েছিল, আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলাচ্ছিল তারা এর সবই করেছিল ধর্মের নামে, ফলে তাদের মধ্যে কোন অন্যায়বোধ নেই। তারা সবই করেছে পবিত্র দায়িত্ব থেকে। এখানেই আমার ভয়টা। এই ভয় ধর্ম কীভাবে মানুষকে মানুষ খেকো বানিয়ে দেয় সে ভয়। ধর্ম হচ্ছে এমন এক নেশা, যা নিরীহ এক গরুকে পবিত্রতার প্রতীক বানায় শুরুতে। তারপর সে গরু রক্ষার নামে মানুষকে খুন করে, সে খুনের জন্য গর্ব করতে শেখায়।


৩. এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে আশ্রিত। তাদের সাথে যা করা হয়েছে তা পবিত্র ধর্ম রক্ষার নামে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক রোহিঙ্গা নারীর গর্ভে বর্মি সেনাদের অবৈধ সন্তান। তারা রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করেছে ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার নামে। বার্মাকে মুসলিম মুক্ত করে তার পবিত্রতা রক্ষা করতেই তারা রোহিঙ্গাদের পুড়িয়ে মারছে। রোহিঙ্গাদের সাথে যা হয়েছে তা এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বর্বরতা। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্মিরা এ বর্বরতার পক্ষে প্রকাশ্যে সাফাই গাইছে। তাদের সেনাবাহিনীকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দিচ্ছে। এই যে তাদের এমন অমানবিক অবস্থান তা কিন্তু ধর্মের জন্যই। বলছে, তারা অপবিত্র রোহিঙ্গা মুক্ত বৌদ্ধ পূন্য ভূমি মিয়ানমার পুন:প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

রোহিঙ্গাদের উপর চালানো বর্বরতার কোন ভিডিও আমি দেখিনি, ছবিও খুব একটা দেখিনি। না দেখেও মাঝেমধ্যে সংবাদপত্র পড়ে চোখে পানি এসেছে। কখনো মনে হয়েছে, সম্ভব হলে যুদ্ধ যাই, গিয়ে বলি আমিও রোহিঙ্গা, অধিকার দে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এ ঘটনায় দু:খিত হওয়া ছাড়া, নিন্দা জানানো ছাড়া, প্রতিবাদে ফেটে পড়া ছাড়া আর কীইবা করতে পারি! দেখে ভালো লেগেছে, বাংলাদেশের মানুষ এদের সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছে। একটা মানবিক জায়গা থেকে প্রধানমন্ত্রী তাদের এদেশে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু ওই যে বলছি, এখানে মানবতার চেয়েও ধর্মটাই আমাদের মূল আবেগের কারণ। রোহিঙ্গারা মুসলমান না হলে সংখ্যাগরষ্ঠি বাঙালি মুসলমান টু শব্দটিও করত না। তারা বরং মুচকি হাসত। আজ যা করছে ওপার বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা।

আমি এই প্রজন্মের মানুষ। তবু মানতে পারি না, শুধু ধর্মের কারণে ভাগ হয়েছিল আমার দেশ। কিন্তু রোহিঙ্গা ও জেরুজালেম ইস্যু আমাকে ৪৭ এর বাস্তবতায় নিয়ে যায়। বুঝতে বাধ্য করে, এখানে ধর্মই সব। যে ধর্ম মুসলমানদের রোহিঙ্গা প্রশ্নে কাঁদাচ্ছে, সে ধর্ম হিন্দুদের বলছে, বুনো উল্লাস করতে। একদল মানুষকে জবাই করা হচ্ছে এ যেন আনন্দের বিষয়। ওপার বাংলার বাঙালি হিন্দুদের এমন উল্লাস দেখে শুরুতে ভেবেছিলাম, একই ভাষাভাষির হওয়ায়, বিভিন্ন সামাজিক গ্রুপে বাংলাদেশের মানুষের সাথে প্রতিনিয়ত তাদের ঝগড়া লেগে থাকে। হয়তো এজন্য তারা এমনটা করছে। কিন্তু না, এটা ছিল বিজেপি সমর্থক সব ভারতীয় সনাতনীর অভিব্যক্তি। তারা যেন বর্মি সেনাদের রোহিঙ্গা নিধনের অভিযোগ থেকে নৈতিক মুক্তি দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছে। টুইটার, বিভিন্ন পশ্চিমা গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠনসহ নানা জায়গা বিজেপি সমর্থক হিন্দুরা বর্মিদের চেয়েও বেশি সক্রিয়। তারা নানাভাব বোঝানোর চেষ্টা করছে, রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী, বর্মি সেনারা যা করছে এটা তাদের আত্মঅধিকার। খৃস্টানদের একটি অংশকেও দেখেছি, বর্মি সেনাদের পক্ষে লড়তে।

হায় ধর্ম, কেমন মানবিকতা সে শেখায় একজন মানুষকে! যে ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের রোহিঙ্গা হত্যায় কাঁদাল সে ধর্মই তাদের একজন বর্মির মৃত দেহ দেখে সুবানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে উল্লাস করতে বলল। রোহিঙ্গাদের বিতারণ দেখে যে মুসলমানরা কাঁদছে, তারাই সমস্বরে দাবি তুলল, নিজ দেশের পাহাড়ি-বৌদ্ধ সংখ্যালঘুদের বার্মায় বিতারণের। এসব সংখ্যালঘুদের রাস্তা ঘাটে দেখে হয়রানি করাটা নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে নিল। এসবই তারা করেছে ধর্মের নামে। তারা নাফ নদীর ওপারে রোহিঙ্গা বাড়িঘরে আগুন থেকে ক্ষুব্ধ হয়, কী সেলুকাস! বাড়ির পাশের সাঁওতাল পল্লীর আগুন চোখে পড়ে না!


৪. ভারতে একটি হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠী ক্ষমতায়। পবিত্র হিন্দু সরকার যাকে বলে। বাংলাদেশে মুসলমান মৌলবাদীদের মোটাদাগে প্রতিনিধত্ব করে জামায়াতে ইসলামি। স্বাভাবিক বোধে এই দুই ধর্ম গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক থাকার কথা। কিন্তু জামাতিরা দিনরাত বিজেপির সমালোচনায় মুখর। আর গেরুয়া বিজেপি জামায়াতকে মনে করে এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। জামায়াতিরা বিজেপিকে মৌলবাদী বলে গালি দেয় আর আরএসএস-বিজেপি দেয় জামাতিদের। এই দুই দলই দাবি করে, ধর্ম ওদের মানবিক করে, সাচ্চা মানুষ বানায়, শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত করে। আবার এই খাঁটি মানুষগুলোই একে অপরের উপস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়, অস্তিত্ব সংকটে ভোগে! এ থেকে কী বুঝে নেব আমরা???


সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ২:৩২
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তেহরানের ছায়া কি এখন ঢাকা সেনানিবাসে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:০১


সোমবার সকালে জলসিঁড়িতে একটা অনুষ্ঠান হলো। ফিতা কাটা, ফুলের তোড়া, বক্তৃতা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, স্বাভাবিক একটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা যা থাকে সবই ছিল। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান নিজে হাজির, পাশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাতিঘর (Lighthouse)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৬



বাতিঘর (Lighthouse)

বাতিঘর নিয়ে সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমার অনেক কৌতুহল ছিল। কেন ঐ বয়সেই বাতিঘর নিয়ে আমার এতটা আগ্রহ ছিল, তার কারণ আজও খুঁজে পাই না। অথচ আমি নিজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

"৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রয়োজন ছিল বিশ্রাম। আওয়ামী লীগের দরকার ছিল শুদ্ধিকরণ। অন্যান্য দলগুলোরও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে বিষয়ে মজিবর ও হাসিনা এক বিন্দুও ভুল করেনি!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


বাংলাদেশের ইতিহাসে মজিবরের শেষ শাসন কাল ও হাসিনার শেষ শাসন কাল দুটি ভিন্ন সময়ে হলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত মিল বহন করে। নির্বাচনী বৈধতার নিরিখে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সংগে ২০১৪, ২০১৮... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই যোদ্ধা!

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৭


এই লোকটির নাম আল আমিন। সে বিশেষ একটি দলের হয়ে জুলাই মঞ্চে জ্বালাময়ী বক্তব্য দেয় মাঝেমধ্যে। এর সম্পর্কে গুরুতর একটি অভিযোগ উঠেছে, সে নাকি ৫ আগস্ট দিবাগত রাতে ময়মনসিংহের দাপুনিয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×