
আমি প্রথম গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দেখি বাসে বসে সাভার- নয়ারহাটের মাঝামাঝি নিচু জায়গায় তিনশেড , চারিদিকে চাষের জমি । খুবই গরিবি হাল ছিল গনস্বাস্থ্যের । তাকে দেখতাম চারুকলায় আসতে । তার ছোট ভাইটির সাথে সখ্যতা গড়ে উঠল । তার বোন ভর্তি হল আমাদের এক বছরের জুনিয়র । আস্তে ধীরে সেই গণস্বাস্থ্য হু হু করে বেড়ে উঠল । তিনি সবসময়ই শাসকদের সন্দেহ , তুচ্ছ , তাচ্ছিল্যর শিকার হয়েছেন । কিছুদিন আগে তার পেজে দেখলাম মুক্তিযুদ্ধে কিভাবে যোগ দিলেন তার বয়ান দিয়েছেন । তক্কে তক্কে ছিলাম তার লেখা ছেপে দেব । আজ তার ৭৯ তম জন্মদিন । শুভ জন্মদিন জাফরুল্লাহ সাহেব ।
# ১৯৭১ এ লন্ডন থেকে কলকাতা এসে প্রথম সপ্তাহে যা দেখলাম :
ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসে রাতে কলকাতা দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। উৎসাহ ও উত্কণ্ঠা নিয়ে ট্যাক্সি করে সোজা বাংলাদেশ হাইকমিশনে। ধারণা ছিল যুদ্ধ যখন চলছে, তখন নিশ্চয়ই সারা রাত কমিশন খোলা, সবাই ব্যস্ত, কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর। পৌঁছে চমকে দেখলাম হাইকমিশন নীরব নিষ্প্রভ। অনেক চেষ্টার পর খবর পৌঁছালাম পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হোসেন আলীর কাছে। তিনি আমাদের কথা শুনে বিরক্ত মনে বললেন, আপনারা কষ্ট করে কেন এসেছেন, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। যান রাতটা নিকটবর্তী লিটন হোটেলে কাটান, তাদের এয়ারকন্ডিশন রুম আছে। ধাক্কা খেলাম, এয়ার কন্ডিশন রুমে আরাম-আয়েশে থাকার জন্য তো আমরা লন্ডন থেকে কলকাতায় আসিনি। হাইকমিশনের মেঝেতে শয়ন ব্যবস্থা করলে বেশি খুশি হতাম। এসি হোটেলে অর্থ ব্যয় না করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সে টাকা ব্যয় তো সঠিক কাজ।
পরের দিন অনেকের সঙ্গে দেখা হলো— বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী। সবার একই কথা, তারা ভয়ানক কষ্টে আছেন, আহার-বাসস্থানের ব্যবস্থা নেই; একই প্রশ্ন, ‘প্রাণের তাগিদে আমরা দেশ ছেড়েছি, আপনারা কেন এসেছেন?’ কেউ কেউ বললেন, বিদেশে যাওয়ার জন্য আমরা সাহায্য করতে পারব কিনা?
দেখা হলো ব্যারিস্টার মওদুদ, আমিরুল ইসলাম ও প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্র সচিব মাহবুবুল আলম চাষীর সঙ্গে। চাষী আমাদের নিয়ে গেলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয়ে ৮ নং থিয়েটার রোডে। প্রথমে সাক্ষাৎ করালেন কর্নেল (অব) মুহম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর সঙ্গে। ছাত্রজীবনে তার সঙ্গে একবার পরিচয় হয়েছিল। তিনি ১৯৬২-৬৩ সালে রাওয়ালপিণ্ডি থেকে ঢাকা এসেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানি ছাত্রদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানে উৎসাহিত করার জন্য। তিনি সিলেটি ভাষা ভালো বলেন, আলাপনে বাংলার চেয়ে ইংরেজি বেশি বলেন।
আমরা লন্ডন থেকে এসেছি শুনে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘ওয়েলকাম ইয়ং ম্যান। হাউ ইজ লন্ডন নাও এ ডেইজ, হাউ ইজ তাসাদ্দুক? গ্যানজেস কেমন চলছে? সিলেটিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন, আমার কথা বলবেন, সকল সিলেটবাসী আপনাদেরকে সাহায্য করবে অকাতরে।’ তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কাছে। তখন তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন। বসতে বলেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কেমন আছেন? বাঙালিদের বিভেদ, দলাদলি কীভাবে সামাল দিচ্ছেন? বাম রাজনৈতিক দলগুলো চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে আছে তো? যুদ্ধ চলছে, দেশ পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে পুরো মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। নিজেরা গিয়ে দেখুন, বিলেতের প্রবাসী বাঙালিদের সংঘবদ্ধভাবে সাহায্য করতে বলবেন। বিলেতের ডাক্তারদের তো অনেক আয়।’
তিনি আরো বললেন, ‘যুদ্ধ চলছে যশোর ক্যান্টনমেন্ট, আগরতলা সীমান্তে, নিজেরা গিয়ে দেখেন। প্রস্তুতি চলছে গেরিলা যুদ্ধেরও, মুক্তিবাহিনী সত্বর দেশের অভ্যন্তরে আক্রমণ শুরু করবে।’ তাজউদ্দীন সাহেবের বক্তব্যে আমরা আশান্বিত হলাম। বুঝলাম, যোগ্য লোকের হাতে নেতৃত্ব আছে। এখানে নিশ্চয়ই বিলেতের মতো দলাদলি নেই। ভুল ভাঙল কয়েক দিন পরে।
পরের দিন গেলাম যশোর সীমান্তে। ক্যাপ্টেন হাফিজ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড চাপে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পিছু হটে ভারতীয় সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছেন কিন্তু ক্লান্তি বা হতাশার চিহ্ন নেই। অধিকতর উদ্যমে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা ছাত্র ও শ্রমিকদের রণকৌশল শেখাচ্ছেন। ক্যাপ্টেন হাফিজ নিজের জন্য কিছু চাইলেন না। বললেন, ‘তরুণ গেরিলাদের কাপড়চোপড় ও খাদ্য দিয়ে সাহায্যের চেষ্টা করুন।’
সেখান থেকে ফিরে দেখা হলো কাজী জাফর ও মেননের সঙ্গে। মেননের ভাই সাদেক খান বললেন, ‘যুদ্ধ দেখতে হলে আগরতলা যান, সেখানে খালেদ, জিয়া, শফিউল্লার নাগাল পাবেন, দেখবেন বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর ও পুলিশ কীভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তরুণ গেরিলারা প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা আক্রমণের জন্য।’
সাদেক খান খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম হয়েছিলেন। সার্বক্ষণিক কমিউনিস্ট কর্মী হয়ে অনিয়মের কারণে যক্ষ্মা আক্রান্ত হন এবং কয়েক বছর লেখাপড়া বন্ধ রাখেন। পরে কিছুদিন অভিনয়ে ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়ে অত্যন্ত সফল হয়েছিলেন।
আমরা বোকার মতো সরল মনে কলকাতা পুলিশের কাছে আগরতলা ও আসাম যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করি। দুদিনের মধ্যে অনুমতি পেয়ে যাব আশ্বাস দিলেও চারদিনেও অনুমতিপত্র না পাওয়ায় বিষণ্ন হয়ে পড়ি। আমাদের দুঃখের কথা শুনে সাদেক ভাই বললেন, ‘বোকামি করেছ, পুলিশের কাছে কেন গিয়েছ, কখনো তোমরা অনুমতি পাবে না। নাম বদলিয়ে টিকিট কেটে সোজা আগরতলা চলে যাও। সেখানে খালেদ মোশাররফের সাক্ষাৎ পাবে।’ সাদেক খান এজেন্টের মাধ্যমে মি. জেড চৌধুরী ও মি. মবিন নামে টিকিটের ব্যবস্থা করে দিলেন।
সপ্তম দিনে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসে কলকাতা থেকে আগরতলা। পূর্ব পাকিস্তানের মহকুমা শহরের চেয়েও ছোট। হোটেলের সন্ধানে শহরের প্রবেশপথে প্রথম দেখা হলো ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনির সঙ্গে। ছাত্রজীবনে আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতাম বলে মনির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না। তাই একটু শঙ্কিত হয়ে তাকাতেই মনি বললেন, ‘ডাক্তার, আমি জানতাম আপনি আসবেন, কমিউনিস্টরা লন্ডনে বসে থাকবে না।’ হাসিমুখে ভালো ব্যবহার করলেন। জিজ্ঞেস করলেন কলকাতায় কার কার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
‘প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ফজলুল হক মনি হঠাৎ রেগে গেলেন। বললেন, ‘কোথাকার প্রধানমন্ত্রী? কে তাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন? প্রতারক তাজউদ্দীন, নিজে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেছেন। আওয়ামী লীগের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কমিউনিস্ট।’ আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম। ভাবলাম যুদ্ধের সময় যদি এরূপ বিভেদ থাকে, ভবিষ্যতে কী হবে? নিশ্চয়ই তাজউদ্দীন সাহেবের জীবনটা সুখের হবে না। স্বাধীনতা উত্তরকালে তা-ই প্রমাণিত হয়েছিল। ‘কৃতঘ্ন’ শব্দটা অন্য ভাষায় নেই। ষড়যন্ত্র থেমে ছিল না। যুদ্ধকালীন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মনির সহায়তায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অজ্ঞাতে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) সৃষ্টি করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সমান্তরাল অন্য একটি বাহিনী হিসেবে।
দেখা হলো চট্টগ্রামের এমআর সিদ্দিকী সাহেবের সঙ্গে। তিনি ওই রাতে তাদের সঙ্গে আগরতলা সার্কিট হাউজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। পরের দিন ভোরেই রওনা হলাম দুই নম্বর সেক্টরের উদ্দেশে, মেলাঘরের পথে। সাক্ষাৎ হলো মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর জিয়া, শফিউল্লাহ, মীর শওকত আলী ও অন্যদের সঙ্গে। যুদ্ধে ফিল্ড হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে বলার পর খালেদ বললেন, ‘আমার ডাক্তারের প্রয়োজন নেই। আমার প্রয়োজন অস্ত্র এবং বুলেট অ্যান্ড বুলেটস। আপনারা লন্ডন ফিরে গিয়ে আইআরএর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আমাদের জন্য রাতে দেখা যায় এরূপ বাইনোকুলার, ছোট ডুবুরি যান মিডগেট এবং ছোট ছোট অস্ত্র জোগাড় করে পাঠান। চেকোশ্লোভাকিয়ায় অল্প মূল্যে স্বয়ংক্রিয় ছোট অস্ত্র পাওয়া যায়।’
কয়েক দিনের মধ্যে আহত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে গেলে মেজর খালেদ তার মত বদলাতে বাধ্য হন। দুই মাসের মধ্যে গড়ে ওঠে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর দেহরক্ষী হাবুল ব্যানার্জির আনারস বাগানে ৪৮০ বেডের ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। প্রবাসী সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রাথমিকভাবে কিছু অর্থ সাহায্য করেছিলেন। বেশির ভাগ খরচ ও সব যন্ত্রপাতি পাঠিয়েছিল লন্ডনস্থ বিডিএমএ। হাসপাতাল তৈরির মূল কৃতিত্ব ডা. মবিনের। এ হাসপাতালে ২২ অক্টোবর মাথায় গুলিবিদ্ধ মেজর খালেদ মোশাররফ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছিলেন, পরে স্থানান্তর হয়েছিলেন লক্ষে ৗতে, ভারতীয় সেন্ট্রাল কমান্ডের বড় মিলিটারি হাসপাতালে।
বিডিএমএ থেকে অন্য চার চিকিৎসক— ডা. কাজী কামরুজ্জমান, বরকত আলী চৌধুরী, আলতাফুর রহমান ও মাহফুজ অক্টোবরে ভারতে এসে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা দেন। বিজয়ের প্রাক্কালে বিলেত থেকে আসেন ডা. মোশাররফ হোসেন জোয়ারদার, যার ঢাকায় শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল। ডা. বরকত চৌধুরী বর্তমানে অসুস্থ, আলজেইমার রোগে আক্রান্ত, ডা. কাজী কামরুজ্জমান বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ঢাকায় মগবাজারস্থ কমিউনিটি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন করেছেন। ডা. মাহফুজ একজন বিশেষজ্ঞ রেডিওলজিস্ট হিসেবে বিলেতে অবসর জীবন যাপন করছেন। তিনি বাংলাদেশের এনআরবি ব্যাংকের একজন উদ্যোক্তা পরিচালক। ডা. আলতাফ লন্ডনে অবসর জীবন যাপন করছেন। মধ্যে মধ্যে বেড়াতে দেশে আসেন। #
পরের লেখা পেলে ছেপে দেব ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

