somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অর্থনৈতিক সংস্কার - ইরান বনাম মালয়েশিয়ার একটি তুলনামূলক চিত্র

০৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইরানের ২০১০ সালের "টার্গেটেড সাবসিডি রিফর্ম" এবং মালয়েশিয়ার বর্তমান "মালয়েশিয়া মাদানি" ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে প্রবর্তিত PADU (Pangkalan Data Utama) ডিজিটাল সিস্টেমের টার্গেটেড ভরতুকি নীতি—উভয়ই উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য রাজস্ব শৃঙ্খলা ও সামাজিক সুরক্ষার অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেস-স্টাডি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ইরানের মডেল থেকে গভীর শিক্ষা নিলেও তার বাস্তবায়ন কৌশলে এনেছেন অত্যাধুনিক আইটি ও ডিজিটাল ডেটাবেসের ছোঁয়া।

নিচে এই দুই দেশের অর্থনৈতিক কৌশলের একটি ডাটা-সমৃদ্ধ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো:


মূল লক্ষ্য এবং ম্যাক্রো-ইকোনমিক পটভূমি

ইরান (২০১০): তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ যখন এই নীতি নেন, তখন ইরানের জিডিপির প্রায় ২৫% (বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার) অপচয় হতো জ্বালানি ও রুটির ঢালাও ভরতুকিতে। এর মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো এবং রাজকোষের ঘাটতি ঠেকানো।

মালয়েশিয়া (২০২৫-২০২৬): আনোয়ার ইব্রাহিম সরকার ২০২৬ সালের বাজেটে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৭০ বিলিয়ন রিংগিত (প্রায় ১০৭ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ দিয়েছে। যেখানে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেবল জ্বালানি ভরতুকি বিলই ছিল প্রায় ৫০ থেকে ৭০ বিলিয়ন রিংগিত! মালয়েশিয়ার মূল লক্ষ্য রাজস্ব ঘাটতি ২০২৪ সালের ৪.১% থেকে কমিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে ৩.৫%-এ নামিয়ে আনা।


ডেটাবেস ও টার্গেটিং কৌশল: সর্বজনীন বনাম সিলেক্টিভ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম

দুই দেশের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো তারা কীভাবে ভরতুকি পাওয়ার যোগ্য মানুষকে চিহ্নিত করেছে:



ইরানের ভুল থেকে শিক্ষা: ২০১০ সালে ইরান জটিল যাচাই-বাছাই এড়াতে দেশের প্রায় ৯৫% নাগরিককে সর্বজনীনভাবে প্রতি মাসে ৪৫ মার্কিন ডলার সমমূল্যের রিয়াল দেওয়া শুরু করে। এটি ছিল একটি বড় নীতিগত ভুল, কারণ ধনীরাও নগদ টাকা পাচ্ছিল।

মালয়েশিয়ার PADU সমাধান: আনোয়ার ইব্রাহিম এই ভুল এড়াতে ২০২৪ সালে PADU নামক ডিজিটাল হাব চালু করেন, যা ২০২৬ সালে সম্পূর্ণ সক্রিয়। এটি নাগরিকের কেবল 'আয়' দেখে না, বরং তার পারিবারিক সদস্য সংখ্যা, স্থাবর সম্পত্তি এবং জীবনযাত্রার প্রকৃত খরচ বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেবল প্রকৃত অভাবী (নিচের ৪০% বা B40 এবং মাঝারি আয়ের M40) নাগরিকদের ভরতুকির নগদ অর্থ (Sumbangan Tunai Rahmah - STR) পাওয়ার যোগ্য ঘোষণা করে।

আর্থিক টেকসইতা এবং মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনা

ইরানের ট্র্যাজেডি: বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং আইএমএফ (IMF)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান সরকার ভরতুকি তুলে নিয়ে যে পরিমাণ রাজস্ব সাশ্রয় করেছিল, তার চেয়ে বেশি টাকা জনগণের মাঝে নগদ বিতরণে খরচ করে ফেলেছিল। এই ঘাটতি মেটাতে ইরান সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে টাকা ছাপায় (Money Printing), যা দেশে তীব্র প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যস্ফীতি (Inflation) তৈরি করে এবং নগদ টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

মালয়েশিয়ার ভারসাম্যপূর্ণ নীতি: মালয়েশিয়া নগদ টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছে না। তারা 'মাদানি অর্থনীতি'র আওতায় রাজকোষের টাকা বাঁচিয়ে তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে পুনঃবন্টন করছে। ২০২৬ সালের বাজেটে ভরতুকি সংস্কারের মাধ্যমে সাশ্রয় করা অর্থ সরাসরি দেশের নিম্নবিত্তদের জন্য "রাহমাহ ও সারা" (SARA) নামক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে যুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের মূল্যস্ফীতিকে ৩% এর নিচে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে।

গিনি কোফিসিয়েন্ট ও দারিদ্র্য বিমোচন সূচক

ইরানের ডাটা: প্রাথমিক ধাক্কায় ক্যাশ ট্রান্সফারের কারণে ইরানের আয় বৈষম্য পরিমাপক গিনি ইনডেক্স ০.৪১ থেকে কমে ০.৩৭-এ নেমে এসেছিল এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছিল। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে এই সফলতা ধরে রাখা কঠিন হয়। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংক ডেটা (২০২০-২০২২) দেখায় যে, পুনরায় টপ-আপ ক্যাশ ট্রান্সফার চালুর পর ইরানের দারিদ্র্যের হার ২৯.১% থেকে ২১.৯%-এ নেমেছে।

মালয়েশিয়ার ডাটা: ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড কম্পেটিটিভনেস র‍্যাংকিংয়ে (WCR) মালয়েশিয়ার অবস্থান এক লাফে বিশ্বের ১৫তম শীর্ষ প্রতিযোগিতাপূর্ণ অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে [WCR]। PADU সিস্টেমের নিখুঁত টার্গেটিংয়ের কারণে মালয়েশিয়া ২০২৬ সালের মধ্যে তাদের দেশ থেকে 'Hardcore Poverty' বা চরম দারিদ্র্য শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে।

অর্থনৈতিক দর্শনের পার্থক্য

ইরানের মডেলটি ছিল মূলত একটি "সংকট ব্যবস্থাপনা" যেখানে হুট করে ভরতুকি তুলে দিয়ে জনগণের ক্ষোভ থামাতে নগদ টাকা বিলানো হয়েছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতির জন্ম দেয়। অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম সরকারের কৌশলটি হলো একটি পরিকল্পিত "ডিজিটাল সমাজকল্যাণ রূপরেখা", যেখানে PADU ডেটাবেসের সাহায্যে রাষ্ট্রের অপচয় রোধ করে ধনীকদের থেকে রাজস্ব এনে সুনির্দিষ্টভাবে গরিবদের টিকে থাকার শক্তি জোগানো হচ্ছে।



তথ্যসূত্র ও রেফারেন্সসমূহ:

International Monetary Fund (IMF) & IISD Report: "Iran – The chronicles of the subsidy reform" (Guillaume, D., Zytek, R., & Farzin, M.)

World Bank Group Research Paper: "Welfare and Fiscal Implications from Subsidy Reform in Iran" & "Iran Economic Monitor"

Ministry of Finance (MoF) Malaysia: "Pre-Budget Statement 2026 & Madani Economic Framework Data"

Penang Institute Journal (2024-2026): "An Inquisition into Malaysia’s PADU Subsidy Targeting, and Beyond."

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:১৮
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



এই মুহুর্তে আমি গাজীপুর যাচ্ছি।
সময় সকাল দশটা। রবিবার। রাস্তায় জ্যাম যেতে অনেক সময় লাগবে। লাগুক। সমস্যা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আজ আমার কোনো কাজ নেই। বউ বাচ্চা বাসায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাসিত নক্ষত্রের শহর !

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯



রাতের শেষে যে শহর জেগে থাকে
তার ভাঙা নীয়ন আলোয়
আমি দেখেছি মানুষের মুখ—
অথচ দেখিনি মানুষ ।
দেখেছি ক্লান্ত আত্মারা,
ধীরে ধীরে আত্মহুতি দেয় প্রতিরাতে।

চারদিকে শব্দ ছিল,
হাজার কথার বিষাক্ত ভিড় ছিল,
কর্পোরেট... ...বাকিটুকু পড়ুন

"তোমরা আমাদের মানুষদের কেন খুন করলে?"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০১

জাপানের মানুষেরা আজও বুঝতে পারে নাই, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েদের এভাবে হত্যা করা হলো। সেই দেশের মুরুব্বীরা এখনো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন। আক্ষেপ করেন। আমার বোনের জামাই জাপানে পোস্ট ডক... ...বাকিটুকু পড়ুন

শত্রুর শত্রু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:১৪

উগ্রবাদী আর উদারবাদী, দুটি ইসলামই একই রাজনীতি করে। তাবলীগ জামাতের লোকটি মাঠে এসে বলে মেয়েদের ফুটবল হারাম। তারপর বিশ্বকাপে সৌদি আরবকে সমর্থন করে রাস্তায় নামে। এই দুটি আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৩



বিয়ের মঞ্চে বসে আছি। মঞ্চ বলতে চকির মতো একটা খাট, তার সম্ভাবত এক পা ছোট বা নাই, কারন সামান্য নাড়াচাড়ায় খাটা টালমাটাল হয়ে একদিকে কাত হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×