বিশ্বখ্যাত ইকোনমিস্ট পত্রিকার অঙ্গ সংস্থা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) বাংলাদেশের সর্বশেষ রাজনীতি বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, বর্তমান সরকার যদি বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ এবং নিত্যপণ্যের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ধরে রাখতে পারে, তাহলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে দারুণভাবে হতাশ করে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য শক্তিশালী অবস্থানে চলে যাবে। পরপর দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়া যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য একটি অভূতপূর্ব ঘটনা হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশ পরিচালনায় বর্তমান সরকারের সামনে উল্লেখযোগ্য কোনো চ্যালেঞ্জ না থাকলেও ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দুটি কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। এর একটি হচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা এবং অন্যটি হলো_ জঙ্গি গ্রুপগুলো নতুন করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে। এ সময় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে আবারও রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপ হতে পারে। ইআইইউ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে নিয়মিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করে থাকে। বিভিন্ন দেশ, বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও গোয়েন্দা সংস্থা ইআইইউর গ্রাহক। ইআইইউ তাদের আগামী পাঁচ বছরে (২০১১-১৫) পলিটিক্যাল আউটলুক শিরোনামে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান মূল্যায়ন করেছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা : আগামী সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনায় তেমন কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে না। তবে খাদ্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও পানি সংকটের কারণে সামাজিক অস্থিরতার সম্মুখীন হতে পারে সরকার। একই সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনগুলো আবারও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারে। ইআইইউর মূল্যায়নে বলা হয়, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) জন-অসন্তোষকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে রাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। বিগত মেয়াদে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের মতো বর্তমান শাসক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও স্বীকার করেছে, বেশকিছু জঙ্গি গ্রুপ এখনও বাংলাদেশে সক্রিয়। তবে ইআইইউ বিশ্বাস করে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল
সময়কালে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হওয়ার আশঙ্কা কম। কারণ ওই সময়কাল পর্যন্ত দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশের ওপর সরকারের শক্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে। কোনো কারণে পরিস্থিতির যদি অবনতি হয় তাহলে সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য উভয় বাহিনীকে দ্রুত নিয়োজিত করতে সক্ষম হবে। এমনকি নাটকীয় কোনো পরিস্থিতিতে সরকার সবশেষ ব্যবস্থা হিসেবে জরুরি আইনও প্রবর্তন করতে পারবে।
ইআইইউ বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে বিশ্লেষণে আরও বলেছে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য সম্ভাব্য আরেকটি কারণ হতে পারে। যদিও বর্তমান সেনা নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই তবু ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের মতো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে সেনাবাহিনী আবারও রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এমন ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে গত দু'বছরে এ ধরনের ঝুঁকি বহুলাংশে কমেছে বলে ইআইইউ মন্তব্য করেছে।
এছাড়া ইআইইউর মতে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কারণে ২০১১-১৫ সাল মেয়াদে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। বিচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জামায়াতে ইসলামী ও তাদের আজ্ঞাবাহী ইসলামপন্থি কোনো গোষ্ঠী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে ইআইইউ মন্তব্য করেছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ : আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পূর্ণ মেয়াদে তাদের দায়িত্ব পালন করতে সমর্থ হবে বলে ইআইইউর প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তিক্ত বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় বিএনপি অভিযোগ করতে পারে, ওই সরকার পক্ষপাতদুষ্ট এবং নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগ প্রভাবিত। তথাপি, নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনার জন্য ভালো কোনো ব্যবস্থার অভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমেই করতে হবে বলে ইআইইউ মন্তব্য করেছে।
ইআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে পারে এবং নিত্যপণের মূল্য সহনীয় রাখতে পারে তাহলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে হতবাক করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসীন হবে। কোনো দলের জন্য দ্বিতীয় মেয়াদে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা হবে। ইআইইউর মতে, বিডিআর বিদ্রোহের নৃশংস ঘটনায় জড়িতদের এবং ১৯৭১ সালে মানুষ হত্যায় জড়িতদের শাস্তি দিতে সমর্থ হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ জনগণের কাছ থেকে সরকার বাহ্বা ও সমর্থন পাবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক : ইআইউর 'কান্ট্রি রিপোর্ট'-এ বলা হয়, আগামী পাঁচ বছরে ভারত ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে কেন্দ্রীভূত থাকবে। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে 'কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ' ভৌগোলিক অবস্থানে থাকার কারণে বর্তমান সরকার দেশ দুটির কাছ থেকে বাড়তি বাণিজ্য সুবিধা আদায় করে নিতে পারে। রিপোর্টে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। সন্ত্রাস নির্মূল, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে দু'দেশের মধ্যে নতুন চুক্তি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। তবে চীনের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ভালো রাখার বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে বলে ইআইইউ মন্তব্য করেছে। কারণ সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের মিলিটারি ইকুইপমেন্টের প্রধান জোগানদাতা চীন। ইআইইউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। আগামী পাঁচ বছর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ হিসেবেই থাকবে এবং দেশটি তার মিত্র ভারতকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব মোকাবেলা করতে নৌশক্তি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি হতে পারে বলে ইআইইউ মন্তব্য করেছে।
View this link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


