মাঝে মাঝে বাবা নামাজ পড়াতো। পিছনে মা, আমি, ভাইয়া দাঁড়িয়ে যেতাম। প্রত্যেকটা বাসার কিছু 'ফ্যামিলি থিং' থাকে। হঠাৎ হঠাৎ এক সাথে নামাজ পড়াটা আমাদের বাসার জন্য ওরকমই ছিল।
তবে শখ করে নামাজ পড়ার দিন বেশিদিন থাকে নি। আরেকটু বড় হওয়ার পরে, যখন গন্ডিটা বাবা মাকে ছাড়িয়ে আরও ব্যাপ্তি পেয়েছে, টিভি কমিকস সব একটু একটু করে ঢুকে পড়েছে, ঘুমে মজা পেয়ে গিয়েছি, তখন থেকে নামাজে রাজ্যের আলসেমি।
তার থেকে আরেকটু বড় হওয়ার পরে আমার ত্যাড়া রগটার জন্ম হলো। কোন কিছু ভাল না লাগলে তা করা বন্ধ করে দিলাম। বকা দিয়ে তো কিছুই করানো যাবে না। নামাজ কেন পড়ব? না হলে আল্লাহ গুণাহ দিবে? সত্যি বলতে কি ওই উত্তর আমার কাছে গুরুত্ব হারিয়েছিল। আমাকে পিটুনির ভয়ে কিচ্ছু করানো যায় নি কোন কালেই।
নামাজ প্রথম কবে ভাল লেগেছিল মনে নেই সত্যি। তবে ততদিনে আমি বেশ বড়, বোদ্ধা, মোটামোটি পাকা। চোদ্দ পনের হবে বয়স। রমজানে সবাই রোজা রাখে, সেই সময়ে মনটা একটু ঝুঁকেছিল বোধ করি আল্লাহর দিকে। তখন একটা বই হাতে এসেছিল যাতে নামাজের কোথায় কি বলা হয় সব একে একে বলা। আমি অবাক হয়ে পড়ছিলাম খুব মনে আছে। সব সময় মা বাবা বলতো, নামাজ হচ্ছে আল্লাহর সাথে কথা বলা। কথাটা যে শাব্দিক অর্থেই ঠিক কতটুকু সত্য এর আগে সত্যিই বুঝি নি। একদম প্রথমে 'ইন্নি ওয়াজ যাহতু...' ওটা তো ইবরাহীমের দোআ। কত হাজার বছর আগে চাঁদ, সূর্য্য সব কিছুকে স্রষ্টা বলে ভুল করে শেষ মেষ যখন আল্লাহকে চিনেছিলেন, তখন তাঁর বলা কথাগুলো। কথাগুলো প্রতিবার নামাজে কেউ পরিপূর্ণ উপলব্ধির সাথে পড়লে গায়ে শিহরণ লাগার কথা। চোখ, মন শুকনো থাকার কথা না। আর সব কিছুকে অস্বীকার করে আল্লাহকে একক স্বত্তা হিসেবে সাক্ষী দেয়া--এক রকম প্রতিজ্ঞা বটে। তারচেয়েও বেশি করে হওয়া উচিত উপলব্ধির উচ্চারণ, যা সেদিনের আগে কখনও হয় নি।
একে একে নামাজের কোথায় কি পড়া হয় সব কিছুর বাংলা অর্থ আগে মুখস্ত করলাম। যাই নামাজে পড়া হয় তার শাব্দিক অর্থ বলতে না পারলেও মোটামোটি অর্থ এখনও বেশ বলতে পারব। তারপরে আরবি ঝালাইয়ে নামলাম। ততদিনে নিয়ত থেকে শুরু করে অনেক কিছুই ভুলে গিয়েছি, অনিয়মিত নামাজ পড়া এবং নামাজে অনাগ্রহের কারণে। দোআ কুনুত দ্বিতীয়বার শিখছিলাম যখন তখনের কথা মনে পড়ে এখনও হাসি পায়।
কুরআনের একটা বাক্য আছে, 'তাঁর স্মরণের সাথে সাথে অন্তরে প্রশান্তি আসে', কথাটার পূর্ণ অর্থ টের পেলাম, যেদিন প্রথম সত্যিকার অর্থে নামাজ পড়লাম, আমার প্রার্থনা করলাম সব অর্থ বুঝে। প্রতিটা মুহূর্তে স্নায়ু টান করে সেই একক স্বত্তার ধ্যান করে।
সিজদায় নাকি আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকা হয়। অজানা ভালোবাসার বদ্ধ দুয়ার খুলে গেলে বুক ভরে কেমন টল টল করতে থাকে যে, সেদিন ওমন লাগছিল খুব।
যারা জীবনে একবারের জন্য হলেও নামাজকে পরিপূর্ন উপলব্ধির সাথে পড়তে পেরেছেন, তাদের চোখে পুরা নামাজ ব্যাপারটাই এক যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা বা অর্থহীন উঠা বসার চেয়ে অনেক অন্য রকম হয়ে ধরা দেয়ার কথা, সত্যিই।
(চলতেও পারে)
--------------------------------------------
ছবি কৃতজ্ঞতা : ফ্লীকারস
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




