সেদিন কথাবার্তা তেমন আগায় নি। পরের স্টেশনই স্ট্র্যাথফিল্ড ছিল। মিলির কাছে এ নেহায়েত পরোপকারী কর্মসাধন। সুজন তখনও মোবাইল কিনে নি। একেবারে নতুন দেশে সব অপরিচিতের মাঝে এক স্বদেশী মেয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল, ভাল লেগেছিল ওর। কিন্তু যেচে গিয়ে যোগাযোগ রাখার মত কোন তথ্য রাখে নি ও।
এর অনেকগুলো দিন পরে আরেকদিনে যাব আমরা এখন। এর মাঝে আমাদের গল্পের মূল চরিত্রদের সম্মিলিত কোন ঘটনা যেহেতে ঘটে নি, তাই সে সব দিনের আলোচনা অপ্রয়োজনীয়।
যেদিনের কথা বলছি, সেদিন মিলি দাঁড়িয়ে আছে সার্কুলার কীর রেইলিং ধরে। প্রায় বিশ ফুট নিচের পানিতে ঢেউয়ের আলোড়ন দেখছে। ফেরীগুলোর কাছের পানিতে তেল ডিজেল সহ দূষণের কমতি নেই। বুড়িগঙ্গার চেয়ে কম হবে না মনে হয়। অথচ একটু দূরে গেলেই পানি বেশ স্বচ্ছ। অনেক নিচের সামুদ্রিক জলজ উদ্ভিতগুলো দেখা যায় হালকা। ঢেউয়ের তালে তালে ওগুলো কি ভীষণ দুলছে! এক একটা বড় ফেরী পাশ দিয়ে গেলে পানিতে বড় ঢেউ হয়। ঢেউয়ের ধাক্কা এসে লাগে কংক্রীটের দেয়ালে। মিলি মুগ্ধ চোখে দেখছিল। ওর মন একটু একটু ভাল হচ্ছিল। খুব মন খারাপ থাকলে ও এরকম একা একা চলে আসে সার্কুলার কীর ধারে। এক পাশে অপেরা হাউজ আরেক পাশে হারবার ব্রিজকে রেখে মানুষ দেখে, পানি দেখে, ফেরী দেখে। এক সময় মন ভাল হতে থাকে।
রোদটা মুখের উপর লাগছে দেখে মুখ ঘুরিয়ে পাশ ফিরল একটু। তখনই চোখে পড়ল। কয়েক মিটার দূরেই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে পানি দেখছে। বাঙালী/ভারতীয় চেহারার কেউ হলেই এক ধরণের অতিরিক্ত মনযোগ চলে যায় সেদিকে, মিলি খেয়াল করেছে। কেউ চোখে না পড়ার মত না হলে যতক্ষন দেখত তার চেয়ে একটু বেশিই তাকিয়েছিল হয়তো, তখনই ছেলেটা হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিকে তাকাল। এতক্ষণ চোখে মুখে গাঢ় বিষাদ ছিল ছেলেটার, ভ্রু কুঁচকানো ছিল। মিলিকে দেখেই চোখে মুখে বিষ্ময় ফুঁটে উঠলে। তারপরে হেঁটে আসল এদিকে। 'আপনি মিলি না?'
একটু অবাক হওয়া গলায় 'হ্যা' বলে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মিলি। কোথাও দেখেছে খুব বুঝতে পারছে, ও একবার কারও চেহারা দেখলে ভুলে না সহজে। কিন্তু কোথায় একদম মনে পড়ছে না। ওর দৃষ্টিই সেটা বলে দিয়েছিল নিশ্চয়ই। ছেলেটাই বলল, 'চিনতে পারেন নি বুঝি? আমি সুজন। মাস ছয়েক আগে ট্রেইনে দেখা হয়েছিল।' দ্বিধান্বিত কণ্ঠ সুজনের। চিনতে পারবে তো? নাকি পারবে না আর মাঝ খান দিয়ে সুজন যেচে গিয়ে অপমানিত হবে। মেয়েটা ওকে চিনে নি? তো তাকিয়ে ছিল যে। ধুর, চিনতে পেরে এগিয়ে আসাটাই ভুল হয়েছে। কিন্তু ততক্ষনে মিলির মনে পড়েছে। 'ওহ স্যরি, সত্যিই স্যরি। মনে পড়েছে। আপনি তখন জাস্ট দেশ থেকে এসেছিলেন, না?'
যাক, হালকা হলো সুজন। হেসে ফেলল। 'হ্যা। বাহ, আবার দেখা হবে ভাবতেও পারি নি। তাও কি ড্রামাটিক। সার্কুলার কীতে একা একা যে?'
'ওহ', একটু হেসে আস্তে আস্তে বলল মিলি, 'আমার মন খারাপ থাকলে একা একাই চলে আসি এখানে। ভাল লাগে।'
সুজন খেয়াল করল মিলির মুখের উপর কিসের একটা ছায়া আসছে। মিলিই ওটা ঝেড়ে ফেলে জিজ্ঞাসা করল, 'আপনি? একাই এসেছেন?'
'হ্যা। কাজ করি এদিকেই। শিফট শেষ হয়ে গিয়েছে। বাসায় কেউ নেই ভাবলাম একটু ঘুরে যাই।'
এরপরে কিছু সামাজিক প্রশ্নোত্তর। কে কিসে পড়ছে। কথার পিছনেই কথা বলা, সিডনীতে নতুন আসা প্রত্যেকে জিজ্ঞাসা করতে হয় বলে করা--'সিডনী কেমন লাগছে বলুন তো?'
এতক্ষন হেসে হেসেই কথা বলছিল সুজন। এ প্রশ্নে চোয়াল শক্ত হলো বুঝি একটু। শুকনো একটা হাসি দিল। 'কেমন আবার লাগবে? এখানে কেমন লাগা লাগির তো কিছু নেই।'
'কি বলেন এসব? আমার ভীষণ প্রিয় শহর সিডনী। সিডনীকে কারও ভাল না লাগলে কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগে। একটু তো ভাল লাগছে, লাগছে না? সিডনী ভাল লাগার মত শহর!'
সুজন একটু অধৈর্য্য হলো যেন, 'বললাম না, ভাল লাগার কিছু নেই তো। প্রয়োজনও নেই। আপনি এখানকার সিটিজেন, ভাল না লাগলেও আপনাকে জোড় করে ভাল লাগাতে হয়েছে। আমার তো সেসবের প্রয়োজন নেই। আমার সাথে সিডনীর সম্পর্ক নেহায়েত গিভ এন্ড টেইক। আদান প্রদান।'
'তাই? কিচ্ছু পান নি সিডনী থেকে?' আহত কণ্ঠে বলল মিলি।
'পাই নি আবার? পেয়েছি তো। দেশে যেখানে মা রান্না করতো, নিজের গ্লাসে পানিও গড়িয়ে খাই নি কোন দিন, সেখানে হাত পুড়িয়ে অখাদ্য বস্তু রান্না করা শিখছি। দেশে যেখানে কখনও টাকা পয়সার ব্যাপারে ভাবতে হয় নি, সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা অমানুষিক পরিশ্রম করছি ইউনিভার্সিটির ফি দেয়ার জন্য। কাজের ধরণ এমন যে শারিরীক পরিশ্রমের চেয়ে মনের উপর ভয়াবহ চাপ বেশি। তার উপর আবার রেজাল্ট খারাপ হওয়া চলবে না। ভিসা ঠিক রাখতে হবে! এসব তো সিডনীই দিয়েছে!' মুখে হাসিটা ধরে রাখছে সুজন কিন্তু বুকের আগুনটা চাপা থাকছে না। রক্তাভ চোখের তীব্র চাহনিতে প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। এতক্ষণে খেয়াল করল ও মিলির চেহারা একদম রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছে। ও থামার বেশ খানিকক্ষন পরে আস্তে করে বলল, 'আই অ্যাম স্যরি।'
এবার সুজনের অনুতপ্ত হওয়ার পালা। সুজনের উত্তেজিত হওয়াতেই মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছে মেয়েটা। এতক্ষণ একটা ভদ্রতার বড় মানুষী মুখোশ আঁটা ছিল, সেটা ঝরে পড়ে কিশোরী মায়াময় একটা মুখ বের হয়ে পড়েছে। মেয়েটার সাথে পরিচয় তো এমন কিছু না, এত কিছু বলছে কেন? হতাশ কণ্ঠে বলল সুজন, 'উহু আমি স্যরি। মুডটা বেশ খারাপ, কাজের শিফট শেষ করে আসলাম তো। শুধু শুধু আপনাকে এসব বলছি। খেয়েছেন দুপুরে?' কথা ঘুরালো সুজন।
খায় নি মিলি। সুজনও খায় নি। এখন খাবে কি না জিজ্ঞাসা করতেই রাজি হয়ে গেল মিলি। তারপরে খুঁজে খুঁজে সী ফুডের একটা দোকান বের করে দু'জনে খেতে বসে গেল।
খেতেই খেতেই হঠাৎ মিলির ফেরী চড়তে শখ হলো। 'ফেরী চড়েছেন কখনও?'
'হু একবার।'
'কেমন লেগেছে?'
'মমম... আপনার সিডনীর এই একটা জিনিস খারাপ না।' ফচকা হাসি হেসে বলল সুজন।
'চলেন তাহলে, আজকে আবার যাওয়া যাক!' উৎফুল্ল কণ্ঠে মিলি উঠে দাঁড়াল।
'কোথায় যাবেন ফেরীতে করে?' সুজনের কণ্ঠে বিষ্ময়।
'কোথাও যাওয়া লাগবে কেন? এমনি, যেটা প্রথমে আসে সেটায় উঠে একটু ঘরব।'
সুজন প্রথমে ভেবেছিল মিলি ঠাট্টা করছে। একদিনের পরিচয়ে কারও সাথে লাঞ্চ করাটাও ঠিক মানায় না, এই বয়সী মেয়েরা তো আবার অতিরিক্ত সাবধানী থাকে। লাঞ্চ খেল, এখন আবার যেচে গিয়ে ফেরীতে উঠতে চাইছে? কিন্তু মিলি ঠাট্টা করছিল না। সত্যি সত্যি উদ্যোগী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ফেরীতে উঠার লাইনে।
আলোচিত ব্লগ
গানটি বন্ধুত্বের, গানটি শান্তির প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত
আমেরিকা ও ইরানের শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এই গানটি বুনেছি, নিজের বেসুরো গলা 'ব্যবহার' করেই।
এবারে কি ভারত - বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তির আলো দেখা দেবার কথা?

বন্ধু হে অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন
সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান
সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল

সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন
নীল গ্রহের শেষ প্রেম // কেয়া এবং আমি।

আমি ভেসে আছি মহাশূন্যে।
আমার শরীরে রূপালী স্পেসস্যুট।
চারপাশে অসীম অন্ধকার।
আর আমার সামনে দূরে জ্বলছে এক নীলাভ-সবুজ গ্রহ—
Earth-666।
এই গ্রহেই আমার জন্ম।
এই গ্রহেই আমি প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম।
আর এই গ্রহই আমার কাছ থেকে সবকিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”
এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন
=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।
বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।
যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।