somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দিপুকে হত্যার দায় রাষ্ট্রের—আইনগতভাবেও। সমাজেরও।

২১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১০:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দিপুকে হত্যার দায় রাষ্ট্রের—আইনগতভাবেও। সমাজেরও।

দিপুকে হত্যা করা হয়েছে—এটা মতামত নয়, এটি একটি আইনগত সত্য। প্রশ্ন হলো, এই হত্যার দায় কার? শুধু যারা হাত চালিয়েছে তাদের? নাকি যারা থামায়নি, হস্তান্তর করেছে, নীরব থেকেছে—তাদেরও?

১. এটি সরাসরি হত্যা—আইন কী বলে
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩০২ অনুযায়ী, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যু ঘটায়, সে হত্যার অপরাধে দোষী।” দিপুর ক্ষেত্রে শুধু মৃত্যু নয়—নৃশংসতা, পূর্বপ্রস্তুতি ও জনসমক্ষে প্রদর্শন যুক্ত হয়েছে। এতে ধারা ৩৪ (সাধারণ অভিপ্রায়) ও ধারা ১৪৯ (অবৈধ সমাবেশে সংঘটিত অপরাধ) প্রযোজ্য।

অর্থাৎ, যারা মারধর করেছে, যারা আগুন দিয়েছে, এমনকি যারা সমবেত হয়ে “পরিস্থিতি তৈরি” করেছে—সবার ওপরই সমান দায় বর্তায়।

২. ধর্ম অবমাননার অভিযোগ—আইনে প্রমাণ ছাড়া শাস্তি নেই
বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননা বিষয়ে প্রচলিত অভিযোগগুলো প্রায়শই দণ্ডবিধির ২৯৫ ও ২৯৫(ক) ধারা উদ্ধৃত করে উত্থাপন করা হয়। কিন্তু এই ধারাগুলোতেও স্পষ্টভাবে বলা আছে—

ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্য প্রমাণ করতে হবে।
এখানে:
** কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নেই
** কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট নেই
** কোনো লিখিত বা মৌখিক প্রমাণ নেই

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন নিজেই বলেছে—কিছু পাওয়া যায়নি।
অতএব, আইনগতভাবে এখানে কোনো অপরাধই প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবু শাস্তি কার্যকর হয়েছে—তা-ও মৃত্যুদণ্ড।

এটি আইনের শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

৩. লিঞ্চিং—বাংলাদেশের আইনে সরাসরি নিষিদ্ধ
“মব জাস্টিস” বা গণপিটুনি বাংলাদেশের আইনে কোনোভাবেই বৈধ নয়। এটি একসঙ্গে কয়েকটি অপরাধ:
** অবৈধ সমাবেশ (দণ্ডবিধি ১৪১)
** দাঙ্গা (১৪৬)
** হত্যা (৩০২)
** মৃতদেহ অবমাননা (২৯৭)
** অগ্নিসংযোগ (৪৩৫)
এবং ভিডিও ধারণ করে যারা দাঁড়িয়ে থেকেছে—তারা ধারা ১০৭/১০৯ অনুযায়ী প্ররোচনার দায় এড়াতে পারে না।

৪. কারখানার ভূমিকা—অপরাধমূলক অবহেলা
যদি অভিযোগ অনুযায়ী ফ্লোর ম্যানেজার দিপুকে জনতার হাতে তুলে দিয়ে থাকে, তাহলে তা:

** অপরাধে সহায়তা (abetment) — দণ্ডবিধি ১০৭
** অবৈধ আটক ও হস্তান্তর
** শ্রমিকের নিরাপত্তা লঙ্ঘন

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী নিয়োগকর্তার দায়িত্ব—
কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এখানে প্রতিষ্ঠান শুধু ব্যর্থ নয়—আইন ভেঙেছে।

৫. রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যর্থতা
বাংলাদেশের সংবিধান:

** অনুচ্ছেদ ২৭: আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান
** অনুচ্ছেদ ৩১: জীবনের নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে
** অনুচ্ছেদ ৩২: জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার

দিপুর ক্ষেত্রে এই তিনটি অনুচ্ছেদই লঙ্ঘিত হয়েছে।

আরও গুরুতর বিষয়—ঘটনার পর রাষ্ট্রের নীরবতা। দিপুর পরিবারকে অবহিত না করা, নিরাপত্তা না দেওয়া, ক্ষতিপূরণ বা স্বীকৃতি না দেওয়া—এসবই রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রমাণ।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে Universal Declaration of Human Rights ও International Covenant on Civil and Political Rights-এর অংশীজন। সেখানে জীবন রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপরই ন্যস্ত।

৬. বিচার শুধু অপরাধীর নয়—ব্যবস্থারও
রাষ্ট্র বলছে, “দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে।” প্রশ্ন হলো—
** কত দ্রুত?
** কতজন?
** শুধু সরাসরি হত্যাকারী, নাকি উসকানিদাতা, হস্তান্তরকারী, নীরব দর্শকরাও?

কারণ বিচার যদি শুধু ঘটনার পরে আসে, আর প্রতিরোধ না হয়, তাহলে সেটি বিচার নয়—একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

৭. আইনি সিদ্ধান্ত স্পষ্ট
আইনের ভাষায় এই ঘটনা:
** হত্যা
** গণহত্যার উপাদানযুক্ত লিঞ্চিং
** ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন
** রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এটি একটি সিস্টেমিক ক্রাইম।

উপসংহার
দিপুর পরিবার শুধু বিচার চায় না। তারা চায় রাষ্ট্র স্বীকার করুক—
দিপু নাগরিক ছিল। তার জীবন মূল্যবান ছিল।

আইনের চোখে দিপু অপরাধী নয়।
আইনের কাঠগড়ায় আজ দাঁড়ানোর কথা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১০:০৮
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০


এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত এবং শরিয়া আইন হলো সকল পক্ষের সম্মতি বিশিষ্ট ইসলামী হুকুমতের আইন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:১৯



সূরাঃ ৬ আনআম, ১১৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১৬। যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরন করে:... ...বাকিটুকু পড়ুন

'বাবু': একটি শব্দের উদ্ভব ও এগিয়ে চলা

লিখেছেন আবু সিদ, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০৮

'বাবু' আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। কয়েক শ' বছর আগেও শব্দটি ছিল। বাংলা ভাষাভাষীরা সেটা ব্যবহারও করতেন; তবে তা ভিন্ন অর্থে। 'বাবু' শব্দের উৎপত্তি ও বিবর্তনের ধাপগুলো এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুহতারাম গোলাম আযমই প্রথম We Revolt বলেছিলেন !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:৫৮


আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। দলটির দাবি, অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×