মুক্তচিন্তার রক্তক্ষরণের এক মর্মান্তিক সময়ের মুখোমুখি আমরা। গত ২৬ ফেব্রুয়ারী প্রকাশ্য রাজপথে কিছু ধর্মান্ধ মুসলিম মৌলবাদী তথা দুষ্কৃতির হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়ে গেলেন লেখক সংগঠক অভিজিৎ রায়। নিরীশ্বরবাদের পক্ষে লেখালেখি করায় বাংলাদেশের ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক মুসলিম মৌলবাদীরা অতীতে অনেক বারই তাকে হুমকি দিয়েছে; এমনকী এও বলেছে যে আমেরিকাপ্রবাসী হওয়ায় তাকে এখন শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু বাংলাদেশে এলেই তাকে কোতল করা হবে। অভিজিৎ ঢাকায় আসার পর এই হুমকির বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে মৌলবাদীরা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিবৃতি দিয়ে এই খুনের দায় স্বীকার করে নানাভাবে তাদের জান্তব আনন্দোল্লাস তারা চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিজিতের ওপর এই আক্রমণ অবশ্যই বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয় এবং অভিজিতের মৃত্যুর পরবর্তী কয়েকদিন প্রতিবাদের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ধর্মান্ধ জল্লাদদের উল্লাসধ্বনিও বিপুলভাবে উপস্থিত। অভিজিতের মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, ভাষাতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক হুমায়ুন আজাদের হত্যার কথা। ২১ এর বইমেলা চলাকালীন যেখানে অভিজিৎকে হত্যা করা হলো সেখানেই হুমায়ুন আজাদকে প্রাণাত্মক আঘাত দিয়েছিল মুসলিম মৌলবাদীরা। সে যাত্রা কোনওক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও আবার কয়েকমাস পরে তার ওপর নৃশংস আক্রমণে তাকে হত্যা করতে সমর্থ হয়েছিল মৌলবাদীরা। কিছুদিন আগে শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও লেখক রাজীব হায়দরকে একইভাবে খুন করে মুসলিম মৌলবাদীরা। যারা আজকে অভিজিৎ হত্যার প্রতিবাদ করছেন তাদের ‘কল্লা নামানোর’ হুমকি মুসলিম মৌলবাদীদের তরফে অব্যাহত আছে।
বাংলাদেশ পাকিস্থান বা আফগানিস্থানে মুসলিম মৌলবাদের আগ্রাসী ভয়ংকর চেহারার উল্টোপিঠ হিসেবে ভারতে সংখ্যাগুরু হিন্দু মৌলবাদের ক্রীড়নকরা গণহত্যা, সংগঠিত দাঙ্গা বা ব্যক্তিহত্যার নানা ঘটনা ঘটাচ্ছেন। ইসলামিক স্টেট বা তালিবান বা জামাতি কার্যকলাপকে সামনে রেখে দেশজুড়ে ইসলামভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, চালানো হচ্ছে আধাসত্য অসত্য মেশানো নানা বিকৃত প্রচার। আর এসবের মধ্যে দিয়ে হিন্দু মৌলবাদ অপ্রতিহত ক্ষমতা অর্জন করতে চাইছে। বস্তুতপক্ষে এই উপমহাদেশ এবং অন্যত্রও মুক্তচিন্তা, নিরীশ্বরবাদ এবং সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ, ধর্মান্ধতা ও নানা প্রতিক্রিয়ার দর্শন এক মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসরে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও কোথাও মুসলিম মৌলবাদের প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিচ্ছে ইসলামোফোবিয়ার মত আর এক প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাভাবনা। জার্মানীতে পেগিদা (প্যাট্রিয়টিক ইউরোপিয়ানস এগেইনস্ট দ্য ইসলামাইজেশন অব দ্য ওয়েস্ট)র মত অনেক সংগঠনের বাড়বাড়ন্তর খবর আসছে। তারা বিভিন্ন শহরে বড় বড় সমাবেশও করছে। ফ্রান্সে শার্লি হেবদোর দফতরে নৃশংস হামলার রেশ মেলানোর আগেই আমাদের দেশে আমরা প্রবীন সি পি আই নেতা গোবিন্দ পানসারে গুলিবিদ্ধ হন ১৬ ফেব্রুয়ারী। পাঁচদিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে তিনি চলে যান ২১ ফেব্রুয়ারী, মহারাষ্ট্রের আর এক মুক্তচিন্তার সংগ্রামী দাভোলকরের হত্যাকাণ্ডকে মনে করিয়ে দিয়ে। কয়েক বছর কেটে গেলেও দাভোলকরের খুনিরা এখনো ধরা পড়ে নি, শাস্তি তো দূরস্থান। দাভোলকর, পানসারে, অভিজিৎদের কাজ ও সংগ্রামের প্রতি আমাদের আবেগ এবং শ্রদ্ধাঞ্জলী এই নাছোড় লড়াইয়ে আমাদের সব ধরণের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করার জন্য একজোট হবার আহ্বান জানাচ্ছে। সহজেই অনুমেয় শুধুমাত্র সরকারী প্রশাসনের কাছে দাবি দাওয়া জানানোর মধ্যেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না, কারণ মৌলবাদের বিতত বিতংস এর একাংশকেও নানাভাবে কব্জা করে নিয়েছে। মুক্তচিন্তার মানুষদের স্বাধীন সংগ্রাম এবং প্রশাসন যন্ত্রের ওপর নিরন্তর চাপ সহ নিরলস ও আপোষহীন নিরবচ্ছিন্ন নানামাত্রিক উদ্যোগই সাফল্যের একমাত্র শর্ত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



