somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি নারী নেত্রী, সমাজ সংগঠক ও সংগ্রামী সুফিয়া কামালকে।

২০ শে নভেম্বর, ২০১৪ সকাল ৮:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ আমাদের প্রিয় কবি সুফিয়া কামালের ১৫ তম জন্মবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাকে। কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা কবি এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া ছাড়াও সমাজ সংগঠক হিসেবে সুফিয়া কামাল ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তার লেখায় সর্বদা এই চিত্র ফুটে উঠত। নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের আর্তনাদ ব্যথিত করত তাকে । এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ এখানে তুলে ধরতে চাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মানব সভ্যতার চরম বিপর্যয়ে বিচলিত হয়ে উঠেন সুফিয়া কামাল। তিনি সৃস্টিকর্তার কাছে এ অবস্থার অবসান কামনা করে লিখলেন ‘প্রতিকার’ কবিতা। কলম হাতে তিনি এগিয়ে এলেন নির্যাতিত মানবাত্মার প্রতি। তিনি লিখলেন,

“রক্তিম আলোকে হেরি পৃথিবীর রক্তশক্ত হৃদয়
কৃষ্ণাব বেদনা-ঘাতে শত ক্ষতময়!
তোমার দিগন্তের আজ বেলাশেষে গোধূলীর আলো
ফোটে নাকো, দেখা যায লেখা সেথা কালো কালো
কুন্ডলিত ধুম্ররাশি! অকস্মাৎ তীব্র বিস্ফোরণ
নয়ন ধাঁধিয়া তোলে! মানুষের মৃত্যু আয়েজন
নিত্য সমারোহ চলে নির্ঘোষিয়া শয়তানের জয়।
সহিয়া রহিবে তুমি এত, দয়াময়?
আদিগন্ত ব্যাপি আজ নাচি চলে যার,
তান্ডব বিভৎস লীলা; করিবে না কি এর প্রতিকার?”


সংগঠক সুফিয়া কামাল

তখন ১৯৪৬ইং সাল। কোলকাতায় সা¤প্রদায়িক দাংগা চরম আকার ধারণ করে। সুফিয়া তাঁর মেয়ে ও বেগম মরিয়ম মনসুরের মেয়ে জাকিয়াকে নিয়ে কোলকাতায় ব্রেবোণ কলেজে দাংগা আক্রান্ত লোকদের জন্যে একটি আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেন এবং দীর্ঘদিন সেটা পরিচালনা করেন। সমাজের নিগৃহীত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের হয়ে কথা বলার বীজ প্রোথিত হয়েছিল সুফিয়ার ভিতর সেই কৈশোর থেকেই। দেশ বিভাগের পর সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন সুফিয়া। তখন থেকেই তার সামনে খুলে যায় সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের বিশাল প্রেক্ষাপট। সেই সময়ের নারী নেত্রী লীলা রায়ের অনুরোধে সুফিয়া যোগ দেন ‘শান্তি কমিটিতে।’ এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল সা¤প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা। সুফিয়া অচিরেই তার সাহসিকতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার জন্যে এই কমিটির সভানেত্রী মনোনীত হন।

১৯৪৭ইং সনে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রগতিশীল মহিলাদের নিয়ে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’। এই সমিতিরও সভানেত্রী নির্বাচিত হন সুফিয়া কামাল। একই সময়ে স্থানীয় বিশিষ্ট মহিলাদের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘ওয়ারী মহিলা সমিতি’। সুফিয়া কামাল এই সমিতিরও সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৫১ইং সনে গঠিত হয় ‘ঢাকা শহর শিশু রক্ষা সমিতি’। সুফিয়া কামাল এই সমিতিরও সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬০ইং সনে সুফিয়া কামাল প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন স্মৃতি কমিটি’। এর উদ্দেশ্য ছিল বেগম রোকেয়াকে জনসমক্ষে পরিচিত করে তোলা।
স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে সুফিয়া কামালের বাসায় বসেই প্রথম সিদ্ধান্ত হয় ‘৭১এ ঘাতক-দালার নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠনের। মূলত তাঁর ও শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপেই দু’ধারায় বিভক্ত ঘাতক বিরোধী আন্দোলন এক ধারায় মিলিত হয় এবং জাহানারা ইমামকে আহ্বায়ক ও অধ্যাপক আব্দুল মান্নানকে সদস্য সচিব করে ৪৫ সদদ্যের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ‘৭১ এর ঘাতক দালাল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়। তিনি গণআদালতের একজন বিচারকও বিনর্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে শেষ মুহূর্তে তাঁর নাম বাদ দেয়া হয়। এই কমিটি কর্তৃক গঠিত ‘জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের’ তিনি ছিলেন চেয়ারপারসন। জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর তিনি এই কমিশনের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।



সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলন

সুফিয়া কামাল ছিলেন একজন অকুতোভয় যোদ্ধা। যে কোন রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে জাতীর প্রয়োজনে, সংকট সময়ে তিনি সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন সোচ্চার কন্ঠে। ১৯৫২ইং সালের ভাষা আন্দোলন তথা বাঙালী জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর বিদেশী আগ্রাসন নাড়িয়ে দেয় সুফিয়া কামালের সাহিত্য জীবনকে। রাজনৈতিক এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে তাঁর লেখনী। তাঁর জীবনকালের সাহিত্য সাধনার যত ফসল আমরা পেয়েছি তার একটা বিরাট অংশই এই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে।
১৯৫৪ইং সনে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন বাতিল করে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী ২১ ফেব্রুয়ারীর শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে এদেশের ছাত্রসমাজ। এর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে সুফিয়া কামালও এর প্রতিবাদ জানান। এর আগে যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে তেল ও নুনের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সমাজের সকল স্তরের মহিলারা সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে মন্ত্রি আতাউর রহমানকে প্রকাশ্য রাস্তায় ঘেরাও করে যা এর আগে কখনও ঘটেনি। এরপর আসে উনসত্তুরের গণ অভ্যুত্থান। পশ্চিমা ভয়-ভীতি আর প্রলোভনে যখন অনেকে দিশেহারা তখন সুফিয়া এগিয়ে আসেন সাহস ও অনুপ্রেরণা নিয়ে।
প্রতিবাদী সংগ্রামী সুফিয়া কামালের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খানের সাথে সরাসরি আলোচনা। ঐতিহাসিক তাসখন্দ চুক্তি সম্পাদনের পর পরই ঢাকায় আসেন আয়ুব খান। বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন অস্ত্রবাজদের রাজত্ব। প্রতিকারের আশায় মহানগরীর শান্তিপ্রিয় মানুষ একটি কমিটি গঠন করে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে তার সাথে দেখা করতে যায়। সেদিন সুফিয়া কামালের সাহসী প্রতিবাদে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ফিল্ড মার্শাল। সুফিয়া বলেছিলেন, “আপনি তাসখন্দ চুক্তি করে অতবড় পাক-ভারত যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারলেন। সে তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডগোল তো সামান্য। এ পারবেন না একি হয়?

স্বাধীনতার পর সত্তর দশকের শেষে এবং আশির দশকের সামরিক সরকার, স্বৈরাচার, মৌলবাদ ও সা¤প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে তিনি শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করে গেছেন। যে কোন প্রকার দুঃশাসন ও সা¤প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিে আস্ফালন বিরুদ্ধে তাঁর কন্ঠ উচ্চারিত হতো সবার আগে।
১৯৭৫ইং সনে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেন সুফিয়া কামাল। তাঁর সংগ্রামী চেতনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। তারপর আসে ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান। সামিল হন সুফিয়া কামালও। কার্ফ্যু অমান্য করে তিনি মৌন মিছির বের করেন। ফলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন উজ্জীবিত হয় আর এক দফা। পতন হয় স্বৈরাচারের।

এক কথায় সুফিয়া কামাল ছিলেন সব্যসাচী প্রতিবাদী কন্ঠ। যেখানেই অত্যাচার-অবিচার, রাজনৈতিক দমন-নিপীড়ন সেখানেই সোচ্চার ছিল তাঁর কন্ঠ। ভাষা আন্দোলন, বাংলা হরফ রক্ষার আন্দোলন, রবীন্দ্র সংগীত রক্ষার আন্দোলন, বিশ্ব শান্তি রক্ষার আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, কালা-কানুনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ‘৭১ এর ঘাতক ও দালালদের বিরুদ্ধে জোট গঠন, ফতোয়াবাজী ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সব জায়গায় জড়িয়ে আছে সুফিয়া কামলের নাম।

দেশপ্রেমিক সুফিয়া

একদিকে কবি-সাহিত্যিক অন্যদিকে সমাজসেবী সাংগঠনিক এসব পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে সুফিয়া কামালের দেশপ্রেমিক পরিচয়। যারা সুফিয়া কামাল সম্পর্কে জানেন তারা একবাক্যে স্বীকার করবেন একথা। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ২৩ মার্চ এক বৈঠকে ইয়াহিয়া খানের সামনে সুফিয়া কামাল যে বক্তব্য তুলে ধরেন তাতে তাঁর সাহসিকতা ও দৃঢ়তার পরিচয় পেয়ে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বিস্মিত না হয়ে পারেননি। তখন থেকেই পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর শেন্য দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সুফিয়া কামালের উপর। তাই সোভিয়েট সরকার বিশেষ বিমানে করে তাঁকে সোভিয়েট ইউনিয়নে নিয়ে যাবার ইচ্ছে ব্যক্ত করে। কিন্তু তিনি তাতে রাজী হননি। দেশের চরম দুর্যোগ মুহূর্তে নিজকে সমস্ত ঝুট-ঝামেলা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় সুফিয়া কামাল নিজ বাড়িতে অবস্থান করে নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন। তাঁর প্রতিবেশীরা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাবার সময় তাদের রেশন কার্ড তাঁর কাছে রেখে যায়। এগুলো দিয়ে রেশনের চাল-ডাল উঠিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতেন সুফিয়া কামাল। এমন দুর্যোগপূর্ণ সময়েও তাঁর লেখনী থেমে থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিদিনের ঘটনা তিনি ডায়রীতে লিখে রাখতেন। এগুলোর সংকলিত প্রকাশই হচ্ছে সুফিয়া কামালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিল ‘একাত্তরের ডায়েরী’।

যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দ্বারা লাঞ্চিত আশ্রয়হীনা মেয়েদের তিনি যথাসাধ্য সাহায্যের চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এদের পূর্ণবাসনের জন্যে তিনি গড়ে তুলেন ‘নারী পূর্ণবাসন সংস্থা’। তিনি নিজে ছিলেন এর সভানেত্রী। তাছাড়া নারী মুক্তি আন্দোলনে তাঁর মুল সংগঠন হলো ‘মহিলা পরিষদ’-- যার দৃপ্ত পদচারণায় আজও উদ্বেলিত হচ্ছে এদেশের নারীসমাজ। ১৯৯৮ইং সনে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্যে ঢাকার সচেতন নাগরিক সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল ‘ত্রাণ কমিটি’। সুফিয়া কামাল ছিলেন এর আহবায়ক।

নারী মুক্তি আন্দোলনে সুফিয়া কামাল

এদেশের নারী জাগরণ, নারী আন্দোলনের পিছনে সুফিয়া কামালের অবদান অপরিমেয়। নারী জাগরণ আর নারীমুক্তি ছিল তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য। ১৯৬১ইং সনে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রণয়ন ছিল নারী মুক্তি আন্দোলনের জন্যে একটি উল্লেখযোগ্য বিজয়। পরবর্তীতে মৌলবাদী চক্র এই আইনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে নারী সমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠে।

এতকিছুর পরও এদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থেকে যায়। সুফিয়া কামাল উপলব্ধি করেন যে, নারী সমাজের পূর্ণ মুক্তি না আসা পর্যন্ত গণতন্ত্র পূর্ণতা পায়না। এ নিয়ে তাঁর ক্ষোভের অন্ত ছিলনা এবং তিনি তা প্রকাশও করেছিলেন অত্যন্তজোড়ালোভাবে। ‘বেগম’ এর প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে তা তিনি ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে---
“... মুসলিম সমাজ আজ এক কঠোর দায়িত্ব গ্রহণের সম্মুখীন। অর্জিত স্বাধীনতা, সম্মান ও গৌরব অক্ষুন্ন রাখতে হলে কেবল পুরুষই নয়, মুসলিম নারীকেও এগিয়ে আসতে হবে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কাজে। তার সংগে সংগে ভবিষ্যৎ নারী সমাজকে এমনবাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে তারা সেই স্বাধীন সার্বভৌম আদর্শ রাষ্ট্রের দাবীদার হতে পারে সগৌরবে। এর জন্যে চাই আমাদের মানসিক প্রসার, আশা-আকাংখার ব্যপ্তি আর জীবন সম্বন্ধে স্থির ধারণা।”
এ সম্পর্কে তার আরও একটি উদ্বৃত্তি উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছেন,
“... গণতন্ত্র যদি হয়, তাহলে সেখানে কথা বলার স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। তা হচ্ছে কই? দু:খ হচ্ছে সরকার মহিলাদের কথা জানার, বুঝার চেষ্টাও করছেন না। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী মহিলা হলেই নারীর অধিকার আদায় হয়না। নারীর অধিকার আদায় করতে হলে রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র ও সমাজের গণতন্ত্রায়ন করতে হবে।


মানুষে মানুষে বৈষম্যের প্রতিবাদে সুফিয়া কামাল

আন্দোলন, সংগ্রাম, প্রতিবাদ, সমাজ সংগঠন এসব কিছু জীবন্ত রূপ পেতো তাঁর কবিতায়। সাহিত্যকে তিনি শুধু সুকুমার বৃত্তির আবর্তে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এর মাধ্যেমে তিনি কথা বলেছেন নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের পক্ষে। তাঁর সাহিত্যের প্রতিবাদী কন্ঠ উচ্চারিত হয়েছে সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে। একটা ছোট্র ঘটনায় তার প্রমাণ মিলে।
১৯৯২ ইং সনে সার্ক সম্মেলন উপলক্ষে ঢাকা শহরকে সাজানো হয় তিলোত্তমা স্বপ্নের নগরী হিসেবে। কিন্তু এর আড়ালে বহুমুখী সমস্যায় জর্জড়িত হচ্ছে মানুষ। প্রাণপাত করছে একটু ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্যে। একজন সচেতন সমাজ সংস্কারক হিসেবে সুফিয়া কামালের মনে দারুণভাবে নাড়া দিয়ে যায় এটা। কবিতার মাধ্যমে তিনি এর প্রতিবাদ করেন। তিনি লিখেন,
“নির্লজ্জ নগরী নটি, নিত্য নব নব রূপায়ণে
সজ্জিত করিয়া দেহ, বসি বাতায়নে
লুব্ধ কর ভ্রান্ত পথিকেরে
------------------------------
সাজায়ে প্রত্যঙ্গ, অঙ্গ স্বচ্ছ আবরণে
ঝলমল করি ওঠো দীপ্ত দিবালোকে
----------------------------
মানবেতর মানুষেরা
বেঁচে আছে যারা
শোণিতাক্ত পথে ও প্রান্তরে
সুসজ্জিত তোমার বাসরে
পশিতে যাইয়া শোন আজি
দিকে দিকে উঠিতেছে বাজি
সকরুণ বাঁশীর সুর
খসে যাবে পায়ের নূপুর
স্খলিত হবে বহির্বাস
ব্যর্থ হইবে পুষ্পশয্যা ঘনাইবে সর্বনাশ”।

সুফিয়া কামাল একদিকে যেমন ছিলেন আপোষহীন ব্যক্তিত্ব তেমনি অন্যদিকে তীক্ষè বিবেকবান একজন মানুষ। সমাজের যে কোন প্রকার বৈষম্য তাঁকে নাড়া দিত সবার আগে। ১৯৯৭ ইং সনে ঈদ উপলক্ষে এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা দামের পাকিস্তানী লেহেঙ্গা ঢাকার বাজারে আসে। পত্রিকায় এর ছবিও প্রকাশিত হয়। এর বিপক্ষে সুফিয়া কামালের বিবৃতি পুরো অসুস্থ পরিবেশকে পাল্টিয়ে দেয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোন মহিলা যদি এই টাকায় লেহেঙ্গা কিনেন তবে তিনি যেন বিদেশে গিয়ে তা পরিধান করেন। আর শৈত্য প্রবাহে যত মানুষ মৃত্যুবরণ করছে তাদের কথা স্মরণ করে তিনি যেন কিছু শীতবস্ত্র বিতরণ করেন।
যে কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা তাঁকে নাড়া দিত ভীষণভাবে। ১৯৯২ ইং সনে ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে তিনি বাংলাদেশের ১৬ জন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবির সাথে পত্রিকায় বিবৃতি দেন। এবিষয়ে তিনি দৈনিক ‘ভোরের কাগজে’ তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ‘অতিথি প্রতিবেদন : আজকের ভাবনা ’ শিরোনামে।

“ভারত ভাগ্যবিধাতা এবার যে কলংক-কালিমা বিভুতিতে আচ্ছন্ন হলো, তাতে সা¤প্রদায়িকতার এক বিরাট কলংকিত অধ্যায় বিশ্ব ইতিহাসে অঙ্কিত হলো। বিপুল জনগোষ্ঠী, বিরাট সামরিক বাহিনী, প্রবল শান্তি, সাম্য ও ধর্ম নিরপেক্ষতার রূপে যে ভারত সোচ্চার কন্ঠে আদর্শ স্থান অধিকার করার দাবী করে আসছিলো, আজ বাবরী মসজিদ ধ্বংসের কারণে সে গর্ব, সে অহংকার ওই মসজিদ ধ্বংস¯তূপের তলে চিরতরে বিলুপ্ত হলো”।


মৃত্যু

সুফিয়া কামালের জীবনে কোথাও অন্ধকার ছিল না। পুরোটাই আলো। এক কথায় তিনি স্বয়ং ছিলেন আলোর উৎস। পথ দেখাতেন সবাইকে। কিন্তু সেই আলো আজ আর আমাদের মাঝে নেই। ১৯৯৯ ইং সনের ২২ নবেম্বর পি জি হাসপাতোলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আমৃত্যু তিনি যে আদর্শের পথে হেঁটেছেন সেই আদর্শ আজ যে পঙ্কিল আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে তা দেখার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এটা বোধ হয় এক দিক থেকে ভালই হলো। মৃত্যুর আগেই বুকে মৃত্যুশেল বিধাঁর যন্ত্রণা থেকে তিনি বেঁচে গেছেন।


শেষকথা

সুফিয়া কামালের কবিতা ও রাজনীতি ছিল একই সূত্রে গাঁথা। তিনি বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, একাত্তরের মুক্তযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বহু কবিতা লিখেছেন। তাঁর মতে রাজনীতি হলো মানবতাবোধের প্রতিষ্ঠা, সমঅধিকার ও মানুষের ভাল থাকা। তিনি তাঁর কবিতার বাঁকে বাঁকে সংগ্রাম করে গেছেন একজন নারী হিসেবে, একজন মা হিসেবে, একজন স্ত্রী হিসেবে সর্বোপরি নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত মানুষের কন্ঠ হিসেবে। তাঁর কবিতার বাণী ছিল যে কোন উৎপীড়ন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন ধর্মীয় গোঁড়ামী, কুসংস্কার, সা¤প্রদায়িকতা ও নারী-পুরুষের বৈষম্যের বিরুদ্ধে। এদেশের নারী জাগরণে, নারী মুক্তি আন্দোলনে তিনি ছিলেন আপোষহীন ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ধর্মান্ধ অপশক্তির বিরুদ্ধে তাঁর কন্ঠ ছিল সোচ্চার। তিনি ছিলেন বাংলার বিবেক। তাঁর কবিতার শব্দ বিন্যাস ছিল সুচারু ফলা। ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন সকল প্রকার বঞ্চনার বিরুদ্ধে।
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মের লেবাস নয়, শিশুর নিরাপত্তাই হোক আমাদের প্রথম দায়িত্ব!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫১

ধর্মের লেবাস নয়, শিশুর নিরাপত্তাই হোক আমাদের প্রথম দায়িত্ব!

একজন বাবা তাঁর ছয় বছরের কন্যাকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিকতা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায়। তিনি কি কখনো কল্পনা করেছিলেন, ধর্মীয় শিক্ষকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:২৯


যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলীকে ধন্যবাদ। তিনি একটি ট্যাবু ভেঙে দিয়েছেন। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় জন্মদিন উপলক্ষে একটি বাউল গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এই খবর প্রচার হওয়ার পরপরই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গাজীপুর থেকে কক্সবাজার: চার বাইকে ছয় সহকর্মীর ১৪ ঘণ্টার নাইট রাইড অ্যাডভেঞ্চার

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০২


আমি শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, থাকি সাভার এলাকায়। ভ্রমণের নেশা আর মোটরসাইকেলের প্রতি ভালোবাসা আমার দীর্ঘদিনের। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব গাজীপুর থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের দিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

Personal Cancer Vaccine: আশার আলো দেখাচ্ছে

লিখেছেন কলাবাগান১, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২


আপনি কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন যে ক্যান্সার টিউমারকে কেন শরীর এর রোগ প্রতিরোগ করা ইমিউন সেল (যেমন টি সেল) একেবারে ধ্বংস করতে পারে না!!! যেখানে টি সেল... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২



শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

গতকাল এক বাবার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবার প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×