somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বুক রিভিউ : তাহার বাড়ি অন্য কোথাও লেখক মনোয়ারুল ইসলাম

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



তাহার বাড়ি অন্য কোথাও লেখক মনোয়ারুল ইসলাম

আমার সংগ্রহের বইগুলোর মধ্যে এই বইটির সিরিয়াল নম্বর ০০০০৪। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় —একুশে বইমেলা ২০২৫-এ। ধারণা করা যায়, বইটির ভালো কাটতি ছিল; যার ফলস্বরূপ ২০২৫ সালের মার্চ মাসেই দ্বিতীয় মুদ্রণ করা হয়।

কিছু মৌলিক তথ্য দিয়ে শুরু করছি বইটির রিভিউ—
বইয়ের নাম: তাহার বাড়ি অন্য কোথাও
লেখক: মনোয়ারুল ইসলাম
প্রকাশনী: অন্যধারা
প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা ২০২৫
ঘরানা: আধি-ভৌতিক
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৬০
প্রচ্ছদ: মানব গোলদার
মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা
অনলাইন মূল্য: ২১০ টাকা (অন্যধারা প্রকাশনীর ওয়েবসাইট থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী)



বইটির ফ্ল্যাপে লেখা। (প্রকাশকের ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত)

রূপবালার শরীরে এতটুকুন শক্তিও ছিল না, তবুও দাসীদের গায়ে ভর দিয়ে কোনোরকমে হেঁটে এলো কুয়োর কাছে... দেখল কুয়োর ভেতর নিরন্ধ্র অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই। তবুও কিসের টানে কুমারি রূপবালা সেই অন্ধকার কুয়োয় লাফ দিল কেউ জানল না... কেউ বুঝল না। কুয়োর কাছেই একটা ছাতিমগাছ। গাছে কোনো ফুল নেই, ফোটেওনি কোনোদিন। গাছের গোড়ার দিকটায় পাঁচটা তামার পেরেক। সুনন্দা সেগুলোর একটাতে হাত দিয়েই এমন চমকে গেল কেন?

সারসংক্ষেপ

তিনটি কাল নিয়ে লেখা এই বইটি—১৮০০, ১৮৮৫ এবং বর্তমান সময়। বইটির সংক্ষিপ্ত সারাংশ নিচে তুলে ধরছি।

১৮০০ সাল
গ্রামের নাম বিষ্ণুপুর। জমিদার বিষ্ণুরায়ের নামেই গ্রামের নামকরণ। কিন্তু ১৮০০ শতকের শুরুর দিকেই তার জমিদারির পতন ঘটে।
এক অভূতপূর্ব ঘটনায় জমিদার বাড়ির এক কুমারী দাসী—রূপবালার গর্ভে জন্ম নেয় এমন এক সত্তা, যা না পুরোপুরি মানুষ, না পুরোপুরি মাংসের প্রাণী—অন্য কিছু।
ময়লা রঙের চামড়া, অস্বাভাবিক ছোট দুটি চোখ, মুখের স্পষ্ট কোনো চিহ্ন নেই—ভয়ঙ্কর এক অচেনা জন্ম।
জমিদারের নির্দেশে সেই “অন্য কিছু”-কে ফেলে দেওয়া হয় কুয়োর ভেতরে। আর সন্তানের অদ্ভুত টানে রূপবালাও ঝাঁপ দেয় সেই কুয়োয়।
তারপর...

১৮৮৫ সাল (৮৫ বছর পর)
বিষ্ণুপুরের জমিদারির ভার এখন জমিদার অনুপরায়ের হাতে। প্রজাদের প্রতি তার মমতা ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য তিনি সকলের প্রিয়। যে গ্রামে মানুষ দরজা খুলে নিশ্চিন্তে ঘুমায়—সেই গ্রামেই একদিন পাওয়া যায় এক গ্রামবাসীর লাশ।
নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে তাকে। লাশের অর্ধেক অংশ পাওয়া গেলেও বাকি অংশের হদিস মেলে না। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করতে পারে না—অনুপরায়ের আমলে এমন ঘটনা!
কিছুদিন পর মনু মুন্সী জমিতে গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে ফিরে আসে এক অচেনা একজন কে সঙ্গে নিয়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই সে খুন করে মনু মুন্সীর মাকে—একই কায়দায়।
খুনিকে বন্দি করতে গ্রামের পণ্ডিতের সাহায্য নেওয়া হয়। তখনই বেরিয়ে আসে ১৮০০ সালের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার সূত্র।
সত্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে—
আর তার আগেই ঝরে যায় আরও কয়েকটি প্রাণ।
বন্দি কি হয় সেই অশুভ শক্তি? উত্তর রয়েছে বইয়ের ভেতরেই।

বর্তমান সময় (সম্ভবত ২০২৫) বইয়ে নির্দিষ্ট সাল উল্লেখ নেই, তবে স্মার্টফোনের ব্যবহার দেখে সময়টা আধুনিক বলেই মনে হয়।
সরকারি চাকরির সুবাদে সুনন্দা আসে কুমারী গ্রামে। গ্রাম তার পছন্দ হয়। অফিসের পিয়নের সাহায্যে একটি পুরোনো জমিদার বাড়ি ভাড়া নেয় সে। বাড়ির চারপাশে ঘন গাছপালা—প্রকৃতি যেন তাকে টেনে নেয়। রান্নাবান্নার জন্য গ্রামের এক মেয়েকে ঠিক করে।
একদিন সুনন্দা বাড়ির পেছনের অংশ দেখতে গিয়ে নজর পড়ে একটি ছাতিম গাছে। গাছের গায়ে গেঁথে আছে পাঁচটি পেরেক।
কেন?
কিসের জন্য?
কৌতূহল তাকে পেয়ে বসে। সে ঠিক করে পেরেকগুলো খুলে ফেলবে। পেরেকগুলো এত শক্তভাবে বসানো ছিল যে কাঠমিস্ত্রি ডেকে আনতে হয়। একটি একটি করে পেরেক খোলার পর বেরিয়ে আসে রক্তমিশ্রিত আঠালো এক বস্তুর মতো কিছু—
যার দুর্গন্ধ অসহ্য।
সব পেরেক খুলে ফেলা হয়।
কাঠমিস্ত্রি চলে যায়। রাঁধুনিও বিদায় নেয়।
বাড়িতে সুনন্দা একা।
অদ্ভুতভাবে বাড়িময় যেন মেঘ নেমে আসে— কিন্তু সুনন্দার চোখে সেই মেঘ ধরা পড়ে না।
হঠাৎ...

পাঠ প্রতিক্রিয়া

বইটিতে তিনটি ভিন্ন সময়কাল তুলে ধরা হয়েছে—১৮০০, ১৮৮৫ এবং বর্তমান সময়।

১৮০০ সালের ঘটনাগুলো বইয়ের একেবারে শেষের দিকে একটি আলাদা অধ্যায়ে এসেছে। যদিও এর বিস্তারিত বর্ণনা পুরো উপন্যাসজুড়ে নেই, আমার মতে গল্পের প্রয়োজনে যতটুকু বলা হয়েছে, তা যথেষ্ট ।
এবার আসি ১৮৮৫ সাল এবং বর্তমান সময়ের কথায়।
এই দুই টাইমলাইন সমান্তরালভাবে পুরো বই জুড়ে চলেছে। এক অধ্যায়ে বর্তমান সময়, পরের অধ্যায়ে ১৮৮৫—এইভাবে সময়ের বিনিময় ঘটেছে। অনেক সময় এমন টাইমলাইন পরিবর্তনে পাঠকের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কিন্তু এই বইয়ের ক্ষেত্রে তা হয়নি। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই ইন্টারচেঞ্জগুলো সামলেছেন। এজন্য লেখক নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আবহের বর্ণনাও খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। লেখকের ভাষায় সেই দৃশ্যগুলো চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তিনটি টাইমলাইন নিয়ে লেখার সাহস ও আইডিয়াটা সত্যিই প্রশংসনীয়। এমন কাঠামো ঠিকভাবে ধরে রাখা সহজ নয়, কিন্তু লেখক তা সফলভাবেই করেছেন।
তবে বর্তমান সময়ের অংশে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে কিছু চরিত্রের উপস্থিতি পুরোপুরি প্রয়োজনীয় ছিল না। যেমন—সুনন্দার বয়ফ্রেন্ড ও তার বান্ধবীর প্রসঙ্গ। এগুলো গল্পের মূল প্রবাহে খুব বড় প্রভাব ফেলেনি।
ওভারঅল, আমার মনে হয়েছে বইটি পড়তে গিয়ে বিরক্ত লাগার সুযোগ নেই। পরিচিত প্লট হলেও উপস্থাপন ভিন্ন ও আকর্ষণীয়। সর্বোপরি, উপন্যাসটি আমার ভালো লেগেছে এবং আমি অবশ্যই পড়ার জন্য রেকমেন্ড করবো।

একটি ভুল প্রসঙ্গে
জানি না এই রিভিউ লেখকের কাছে পৌঁছাবে কিনা। যদি পৌঁছায়, তবে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই।
গল্পের শুরু থেকেই সুনন্দা ভদ্রাকে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু মাঝামাঝি অংশে তাকে নামাজ পড়তে যাওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে (পৃষ্ঠা ২৬, ৯৪ এবং ১১১ দেখলেই বোঝা যাবে; বিশেষত ৯৪ নম্বর পৃষ্ঠায় বিষয়টি স্পষ্ট)।
এটি একটি বড় ধরনের অসঙ্গতি। যদিও এই ভুলটি মূল গল্পের গতিপথে তেমন প্রভাব ফেলেনি, তবুও ভবিষ্যৎ সংস্করণে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি।

সর্বশেষ কথা

অনেকের হয়তো বইটির সমাপ্তি নিয়ে কিছুটা আপত্তি থাকতে পারে। তবে আমার মতে, ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃতিক উপন্যাসে এমন ওপেন বা রহস্যময় সমাপ্তি অস্বাভাবিক নয়—বরং এটাই ঘরানার বৈশিষ্ট্য।
ভয়ের আবহে ডুব দিতে যাদের ভালো লাগে, তাদের কাছে নিঃসন্দেহে উপভোগ্য হবে এই উপন্যাসটি।


আমার রেটিং : ৮.৫ / ১০










সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনা খাদক ছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৪৮


আজকে সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু একটা এমন তথ্য দিলেন যেটা শুনে বাংলাদেশের আমজনতা রীতিমতো ক্যালকুলেটর হাতে বসে গেল। কথা হচ্ছে শেখ হাসিনার খাবার খরচ নিয়ে। কোন সালে কত টাকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টি বিলাস!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮



বৃষ্টির জন্য খুব বেশি হাহাকার জমেছিল বলেই কিনা,
জমিয়ে বৃষ্টি এসে রীতিমতো আমাদের জমিয়ে রেখেছে-
এখন গৃহ কারাবাস!
বৃষ্টি তুমি কিনা জমিয়ে রেখেছিলে এতটা ক্রোধ!
থামছেই না তোমার চোখ রাঙানি!
অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিলাম

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬

প্রিয়,
মেঘ বালিকা
(আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিলাম ) ।



আজ তোমাকে আমার মনের একটি গোপন ইচ্ছার কথা বলতে ইচ্ছে হলো।
এই বাস্তব পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত,এখানে সবকিছুর একটা শেষ থাকে।
কিন্তু যখনই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেঁপের বেগুনী, কুমড়োর চপ, কাঁঠালের বার্গার, ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে ও পেঁয়াজ কুচি করে শুখিয়ে সংরক্ষন!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯

উহা পলাতক। যাহা কখনো পালায়না উহাই পালিয়েছে। উহা রান্না করা ভাত তরকারী বাস্প উড়ছে খেতে পারেনি কিন্তু তাতে কি উহা প্রতিদিন ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা প্রতিদিন খেয়েছে! :B#... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের আনন্দের ফুল

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯



প্রেয়সি হে প্রিয়তমা গিয়েছ কোথায়?
হারায় অমৃত ঘুম খোলা আখি পাত
বিবর্ণ অনেক লাগে জোছনার রাত
তোমায় হারিয়ে প্রিয়া আঁধার জীবন।
আসবে কি ফিরে তুমি সুখের প্রভায়
জীবন রাঙ্গিয়ে দিতে? অপেক্ষার হাত
তোমার পরশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×