somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রুবা

১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মামী সেদিন আমাকে কতক্ষণ মেরেছিলেন জানি না। একসময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে খাটের ওপর বসে হাঁপাতে লাগলেন। আমি তখনও হাসছিলাম। হাসিটা থামাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর বুকের ভেতর কেমন যেন হালকা হয়ে গেছে ।

মামী হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, হাসিস কেন? আমি কোনো উত্তর দিলাম না। তিনি বিরক্ত হয়ে আবার বললেন, এত মার খেয়েও হাসিস? আমি এবার বললাম, জানি না মামী। আজ অনেকদিন পর ভালো লেগেছে। মামী কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ওই লোকটার সঙ্গে আর কথা বলবি না। আমি বললাম, কেন? মামী বিকৃত মুখ করে বললেন, বুইড়া গুলা বেশি হারামজাদা হয়। আমি হাসতে হাসতে বললাম, কিন্তু উনি তো খারাপ কিছু করেন নাই।

মামী আর কিছু বললেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমাকে ইশারায় চলে যেতে বললেন। পরদিন সকাল থেকেই অদ্ভুত একটা অপেক্ষা শুরু হলো। কেন অপেক্ষা করছি, নিজেও জানতাম না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। দরজার বাইরে কারো পায়ের শব্দ হলেই মনে হতো, এই বুঝি আপনার বাবা এলেন। কিন্তু এলেন না। এমন করে বেশকিছুদিন এলেন না, আমিও আসতে আস্তে ভুলে যাচ্ছিলাম। হঠাথ করে একদিন এলেন ।

সেদিন আমি ছাদে কাপড় মেলছিলাম। দূর থেকে তাকে আসতে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি ঘরের ভেতর চলে গেলাম। কেন লুকালাম জানি না। হয়তো লজ্জায়। হয়তো ভয়ে।

ইসহাক সাহেবের ঘরে বসে তিনি অনেকক্ষণ কথা বললেন। আমি পাশের ঘর থেকে তাদের কথাবার্তার কিছু কিছু শুনছিলাম। ইসহাক সাহেবের গলা মাঝে মাঝে উঁচু হয়ে যাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর আপনার বাবা আমাকে ডাকলেন, একটু চা হবে? আমি চা বানিয়ে নিয়ে গেলাম। তিনি কাপ হাতে নিয়ে বললেন, সেদিনের রান্নাটা কিন্তু আসলেই ভালো হয়েছিল। আমি হেসে বললাম, মিথ্যা কথা বলছেন কেন।

মিথ্যা কেন বলব?

আমি তো রান্নাই করতে পারি না।

তাহলে সেদিন এত ভালো রান্না হলো কীভাবে?

আপনার অনেক ক্ষুধা লেগেছিলো তাই হয়তো।

তিনি হেসে ফেললেন। আড় চোখে দেখলাম ইসহাক সাহেব মহা বিরক্তি নিয়ে আমাকে দেখছেন । বিষয়টা আমার ভালো লাগলো, আমি ইচ্ছা করে আপনার বাবার সাথে হেসে হেসে কথা বলতে লাগলাম। ওইদিন থেকে ইসিহাক সাহেব আমাকে দেখলেই রেগে যেতেন । বিভিন্নভাবে আমাকে অপদস্ত করতে লাগলেন ।

এরপর থেকে তিনি যখনই আসতেন, কোনো না কোনোভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতেন। কখনো চায়ের অজুহাতে, কখনো কোনো কাগজ দিতে বলে। কখনো শুধু জিজ্ঞেস করতেন, শরীর ভালো কি না? আমি মাথা নিচু করে বলতাম, ভালো না।

কেন?

এমনি ভালো লাগে না। একদিন তিনি আমাকে একটা শাড়ি দিয়ে গেলেন। বললেন, এইটা তোমাকে মানাবে । আমি শাড়ি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। এই পর্যন্ত কেউ আমাকে কোন উপহার দেয়নি, তাও শাড়ি ।

সেদিন রাতে মামীকে শাড়িটা দেখালাম। তিনি শাড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই শাড়ি পইরা কি ব্যডার লগে রঙঢঙ করবি নি?
আমি বললাম, জানি না। মামী বললেন, তুই জানিস না, কিন্তু ওই ব্যাডায় ঠিকি জানে, শোন লো মাতারী আমার ঘরে বইসা এইসব রঙ তামাশা চলবে না। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। মামী মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

তারপর থেকে আপনার বাবা যখন আসতেন, মামী প্রচন্ড রেগে যেতেন, হাতের কাছে যাই পেতেন ছুড়ে মারতেন, একবার তো একটা বটি ছুড়তে গিয়ে হাত কেটে রক্তারক্তি কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। একদিন দুপুরে আপনার বাবা চলে যাওয়ার পর মামী আমাকে ডাকলেন। এই যে নটি নন্দিনী, তিনি আমাকে আজব আজব নামে ডাকেন। আমি কাছে গেলাম। ওই ব্যাডার লগে এতো কি ফুসুর ফুসুর শুনি, শইলে কি জোয়ার বেশি উঠছে? বেশি উঠলে রেল লাইনের বস্তিতে গিয়া খাড়া। আমার ঘরে এইসব চলবে না । আমি চুপ করে রইলাম। আমার চোখ থেকে ঝরঝরিয়ে পানি ঝরছিলো। কি এক অজানা কারনে খুব রাগ হচ্ছিলো । মামী আমার কান্না দেখে আমাকে কাছে ডাকলেন, মামী আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, তুই অনেক কষ্ট পাইছিস। মানুষকে খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করিস না। আমি মামীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি উনাকে খারাপ মানুষ মনে করেন? মামী অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, পৃথীবির সব বুইড়া ব্যাডা লুচ্চা এদের বিশ্বাস করা পাপ। তারপর খুব আস্তে বললেন, তাই তো ভয় লাগে। সেদিন তার কথার মানে বুঝিনি।

এর কিছুদিন পর আপনার বাবা এক বিকেলে একা এসে হাজির হলেন। ইসহাক সাহেব তখন বাড়িতে ছিলেন না। আমাকে দেখে বললেন, তোমার মামা কোথায়?

বাইরে গেছেন।

ফিরতে কতক্ষণ লাগবে?

জানি না।

তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, তুমি একটা জায়গায় যাবা আমার সাথে। আমি জানি না কী সাহসে বলেছিলাম, আপনি বসেন, মামী একা আছেন তারে জিজ্ঞাসা করে দেখি। তিনি বসে পড়লেন। সেদিন তিনি খুব বেশি কথা বলেননি। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। আমি চা এনে সামনে রাখলাম। তিনি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললেন, কি ভাবীসাব অনুমতি দিল ?

আমি মাথা নাড়লাম। না।

কিছুক্ষন চুপ থেকে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন, ঠিক আছে আমি তাহলে যাই । আমার লোকটার জন্য মায়া হলো , আহা কতো আশা নিয়ে আসছিলো , আমাকে সাথে নিয়ে ঘুড়তে চাইছিলো তাও হচ্ছে না । আমি তাকে বললাম আপনি বসেন , আমি রেডি হয়ে আসছি । তিনি একটু হেসে বললেন, থাক ভাবীসাব অনুমতি না দিলে দরকার নাই । তিনি এমন ভাবে বললেন আমার চোখে পানি এসেছিল। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললাম একটু অপেক্ষা করেন ।

আমি তার দেয়া শাড়িটা পড়ে মামীর ঘরে গিয়ে মামী কে সালাম করে বললাম , মামী আমি একটু ঘুরে আসি । মামী রক্তচক্ষু করে বললেন , ওই বুইড়া ব্যাডার লগে ? আমি মাথা নিচু করে রাখলাম। যাও যাও , যখন প্যাট নিয়া আসবা লাত্থি মাইরা বাইর কইরা দিমু মনে থাকে যেন । আমি কোন কথা না বলে আপনার বাবার সাথে বেড়িয়ে পরলাম । সেদিন প্রথমবার মনে হলো, হয়তো সত্যিই আমার জীবনটা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু তখনও জানতাম না, ওই মানুষটার সঙ্গে আমার পরিচয় আমার জীবনকে কোন দিকে নিয়ে যাবে। আর জানতাম না, কয়েক মাস পর এমন একটা ঘটনা ঘটবে, যার পর এই বাড়িতে আমার আর একদিনও থাকা সম্ভব হবে না।


প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

চতুর্থ পর্ব


চলমান.....






সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে----- ড্রাকুলা হাসিনা।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৭



ড্রাকুলার হাসিনা তো আর এমনি এমনি বলেনি যে, আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যা মূলত ভারতকে একতরফা সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি অমর দিশারী

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:১২


তুমি সূর্য কিনারায় উঁকি দিয়েছ বলে-
মা.. তুমি সূর্য আলো!
তোমার জন্মদিনে চাঁদ পৃথিবী হাসছে
আমরা যে গর্বিত গর্বিত-
মা.. তুমি সূর্য আলো;

তোমার অনুশাসন
আমাদের প্রেরণার উড়ন্ত পায়রা
শান্তির জ্বলন্ত মশাল
তোমার জন্ম সাতশত মহীয়ান-
আমরা শুধু গর্বিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবিশ্বাস্য, অবিস্মরণীয়! বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে!!! :-ls B-)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯



অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত, অতুলনীয়,অবিস্মরণীয় যে বিশেষণই ব্যবহার করি না কেন বাংলাদেশের এই জয়ের মহত্ব বুঝাতে কোন শব্দ ভান্ডারই যেন যথেষ্ট নয়। আমি রীতিমত বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি বাংলাদেশের এমন পারফর্মেন্স দেখে!! বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth-রূপের বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক প্রোগ্রামিং

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৩৩

প্রশ্ন ও প্রারম্ভিক জিজ্ঞাসাঃ
আমাদের মনে কি এমন প্রশ্নের উদয় হয় না যে,"আমরা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অবয়ব, গায়ের রঙ, চুল কিংবা পুরুষদের মুখের দাড়ি-গোঁফের দিকে তাকাই, তখন এক অদ্ভুত... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্প - অভাগীর সুর ব্যঞ্জনা – পর্ব ১ -

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


শহরটা রাতে কখনও পুরো ঘুমোয় না। কেউ প্রেমে জাগে, কেউ স্বপ্নে, কেউ অপরাধবোধে।আর কেউ কেউ জেগে থাকে অভাবে। তিনতলার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িটির জানালার পাশে বসে শিরীন হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখল।

বাইরে তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×