ছবিসহ ভোটার লিস্ট ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরির পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ১০ জুন। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার পৌরসভা এলাকাগুলোতে এ পাইলট প্রকল্পের কাজ পুরোদমে চলছে। মোট ৩০টি নিবন্ধন কেন্দ্রের মাধ্যমে এ কাজ করা হচ্ছে। এ পাইলট প্রকল্পকে কাজের সুবিধার জন্য দুটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে।
দেশবাসীর মধ্যে শ্রীপুরের এ পাইলট প্রকল্পের কাজ নিয়ে প্রবল আগ্রহ রয়েছে। কারণ এ কাজের সফলতার ওপর নির্ভর করছে ভোটার লিস্ট ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরির ভবিষ্যৎ। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ভোটার লিস্ট ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরির কাজ চলছে। এর ফলে এ পাইলট প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেশি।
যেভাবে হচ্ছে কাজ
বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশনের তত্ত্বাবধানে চলা এ পাইলট প্রকল্পে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নিবন্ধন কেন্দ্রগুলোতে ল্যাপটপ ও কমপিউটারের মাধ্যমে ডেটা ইনপুট করা হয়। নিবন্ধন কেন্দ্রের প্রতিটি ল্যাপটপ ও কমপিউটারের সঙ্গে শ্রীপুর উপজেলা পরিষদের প্রধান কেন্দ্রের সার্ভারের সংযোগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে নিবন্ধন কেন্দ্রে ডেটা ইনপুট করে, অন্যান্য কাজ সম্পাদন করে তা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মূল সার্ভারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখান থেকে পরবর্তী ধাপের কাজ চলে। পাইলট প্রকল্পের এ কাজে ডেটা কালেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন ১৪৫ জন আর কমপিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন ৬০ জন। পুরো পাইলট প্রকল্পের টেকনিকাল পারসন হিসেবে কাজ করছেন তিনজন। এরা হলেন মেজর এনায়েত, মেজর সাব্বির আহমেদ ও মেজর নাসিম। এরা পুরো প্রক্রিয়ার টেকনিকাল বিষয়গুলো দেখছেন। যেহেতু এবারের ভোটার লিস্ট ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড প্রযুক্তি নির্ভর হচ্ছে তাই তাদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি।
শ্রীপুর উপজেলা পরিষদের পাশেই একটি রুমে ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরির টেকনিকাল কাজগুলো করা হচ্ছে। টেকনিকাল পারসন মেজর এনায়েত বলেছেন, এবারের ভোটার লিস্ট ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড হবে প্রযুক্তি নির্ভর। বিশ্বের সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে ন্যাশনাল আইডি কার্ডে।
ভোটার লিস্ট তৈরিতে প্রযুক্তির ব্যবহার
ভোটার লিস্ট তৈরির প্রাথমিক কাজ হলো ডেটা কালেক্ট করা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে আনা হয়। এ টুকুই শুধু ম্যানুয়ালি কাজ। আর বাকি সব কাজই প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হচ্ছে। নির্ধারিত দিনে পৌরসভা এলাকার লোকজন ভোটার নিবন্ধন কেন্দ্রে উপস্থিত হচ্ছে। ভোটার লিস্টে নাম ওঠাতে যাওয়া ব্যক্তিকে শনাক্ত করার মাধ্যমে তার সামনেই সংগ্রহকৃত ডেটাগুলোতে কমপিউটার অথবা ল্যাপটপে ইনপুট করে নেয়া হয়। ছবিযুক্ত ভোটার লিস্ট তৈরির ক্ষেত্রে তালিকার নিচে প্রযুক্তির সাহায্যে ছবি, স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ বসানো হয়। এবারের ভোটার লিস্টে ব্যবহৃত ছবি তাৎক্ষণিকভাবে ওয়েব ক্যামেরার মাধ্যমে তোলা হচ্ছে।
ভোটার হতে আসা লোকটি বসে থাকে। ওয়েব ক্যাম মুহূর্তেই ছবি তুলে নেয়। টেকনিকাল ইনপুটের মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি নির্ধারিত স্থানে বসে যায়। দ্বিতীয় ধাপে করা হয় হাতের আগুলের ছাপ বসানোর কাজ। এখানেও প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। ডেটাগুলো ইনপুট করা হচ্ছে কমপিউটারে। আঙুলের ছাপ তাই টেকনিকালি নেয়া হয়। কমপিউটারে সংযোগ দেয়া ছোট্ট একটি যন্ত্রে হাতের আঙুলটি রাখলেই তা আঙুলের ছাপ তুলে নিচ্ছে। এভাবে দুই হাতেরই বৃদ্ধ ও তর্জনি আঙুলের ছাপ নেয়া হয়। এ চারটি ছাপকে প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি করে ফেলা হয়। তারপর সেই একটি ছাপকে বসানো হয় ভোটার লিস্টে। সেই ছাপটিই স্থান পায় ন্যাশনাল আইডি কার্ডে। এভাবে চারটি ছাপকে একটি ছাপে পরিণত করে তা লিস্টে বসানোর সুবিধা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তব্যরতরা যায়যায়দিনকে জানায়, এর মাধ্যমে কারো আঙুলের সঙ্গে অন্য কারো আঙুল কোনোভাবেই মিলে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
আঙুলের ছাপ নেয়া হয়ে গেলে পরের ধাপে স্বাক্ষর গ্রহণের কাজটি হয়। একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিতে হয়। সাদা কাগজটি ওয়েব ক্যামেরার সামনে ধরা হয়। ডিজিটালি একটি ছবি উঠে যায়। সে ছবিটিই টেকনিকাল ইনপুটের মাধ্যমে বসানো হয় ভোটার লিস্টের নির্ধারিত স্থানটিতে।
এভাবেই একটি ভোটারের তথ্য নিবন্ধন কেন্দ্র থেকে ইনপুট করা হয় কমপিউটারে। সে ইনপুট করা ডেটাগুলো মেইন সার্ভারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
নিবন্ধন কেন্দ্রের কাজ চলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত (কিছু কিছু কেন্দ্রে রাত পর্যন্ত)। তারপর রাতে মেইন সার্ভার থেকে ভোটার লিস্টের ইনপুট করা ডেটাগুলো পরীক্ষা করে দেখা হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে সেটি থেকে ন্যাশনাল আইডি কার্ড করার পদক্ষেপ নেয়া হয়। এভাবেই প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্রীপুরের পাইলট প্রকল্পে ভোটার লিস্ট তৈরি করা হচ্ছে।
নিবন্ধন কেন্দ্রগুলোতে ল্যাপটপের ব্যবহার ছিল লক্ষণীয়। শ্রীপুর পাইলট হাই স্কুলের কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে পুরুষদের ভোটার লিস্ট তৈরির জন্য তিনটি ও মহিলাদের জন্য তিনটি ল্যাপটপ কাজ করছে। শ্রীপুর গার্লস হাই স্কুলের নিবন্ধন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে চারটি ল্যাপটপ দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো ভোটার লিস্ট তৈরিতে প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই আগ্রহ নিয়ে দেখছে।
ন্যাশনাল আইডি কার্ডে প্রযুক্তি
ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সামনের দিকে যেসব তথ্য থাকছে সেগুলো হলো নাম (বাংলায়), ঘধসব (ইংরেজিতে), পিতা, মাতা, জন্মতারিখ ও আইডি নাম্বার। পাশাপাশি ছবি, আঙুলের ছাপ ও স্বাক্ষর থাকবে। অপর পিঠে থাকছে আইডি কার্ডধারীর ঠিকানা, প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর, প্রদানের তারিখ ও বারকোড। এ বারকোডে ব্যবহার করা হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি।
ন্যাশনাল আইডি কার্ডটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যে, এর ফলে এটি কোনোভাবেই নকল করা সম্ভব নয়। ন্যাশনাল আইডি কার্ড নিয়ে পাইলট প্রকল্পের টেকনিকাল পারসন মেজর এনায়েত বলেন, অনেকেই মনে করতে পারেন ন্যাশনাল আইডি কার্ড তো পাতলা। কিন্তু আমরা বলবো, এটি পাতলা হোক আর যা-ই হোক এটিকে যদি আমরা প্রযুক্তির মাধ্যমে অধিক সুরক্ষিত করতে পারি তাহলে তাই গ্রহণযোগ্য হবে।
নিবন্ধন কেন্দ্রগুলোতে ভোটার লিস্ট তৈরির প্রাথমিক কাজ হয়ে গেলে মেইন সার্ভারে চলে আসা ডেটাগুলো নিয়েই তৈরি করা হচ্ছে ন্যাশনাল আইডি কার্ড। এ জন্য কাজ করছে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষজ্ঞ টিম। আইডি কার্ডটিতে কমপিউটারের মাধ্যমে ছবি বসিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে আইডি কার্ডে ছবি নকল করার সুযোগ থাকছে না। ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরির সম্পূর্ণ কাজ প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হচ্ছে। এ কারণে এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।
আইডি কার্ডে নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। পাইলট প্রজেক্টে কর্মরত একজন টেকনিকাল পারসন জানান, আমরা এমন একটি সফটওয়্যার ডেভেলপের চেষ্টা করছি যার মাধ্যমে আইডি কার্ড ও আঙুলের ছাপ নিয়ে বলে দেয়া যাবে দুটি একই ব্যক্তির। এর ফলে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের অপব্যবহারের সুযোগ থাকছে না।
বারকোডের ব্যবহার
বারকোডের ব্যবহার ন্যাশনাল আইডি কার্ডকে প্রযুক্তিময় করে দিয়েছে। পাইলট প্রজেক্টে কর্মরত একজন টেকনিকাল পারসন দেখিয়েছেন কিভাবে এ বারকোড নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাজ করে। তিনি ছোট্ট পামটপ আকৃতির মেশিনের উল্টোদিকে একটু দূরে একটি কার্ড ধরেন। কিছুক্ষণ পর আইডি কার্ডে আলো পড়ে। আইডি কার্ডটি তখন সরিয়ে নেয়া হয়। কিছুক্ষণ পরই পামটপের স্ক্রিনটিতে ভেসে ওঠে আইডি কার্ড সংক্রান্ত নানা তথ্য। এতে আইডি নাম্বার, নাম ও জন্মতারিখ স্ক্রিনে ভেসে ওঠে।
এ প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে ন্যাশনাল আইডি কার্ড কোনোভাবেই নকল করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন এক টেকনিকাল কর্মকর্তা। কারণ কোনো উপায়ে কার্ডের ওপরের নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেললেও বারকোডে সংরক্ষিত তথ্য পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
সাধারণত আমরা লম্বা দাগযুক্ত যে বারকোড দেখতে পাই সেটি একমাত্রিক বারকোড। তবে ন্যাশনাল আইডি কার্ডে একমাত্রিক বারকোড ব্যবহার করা হয়নি, দ্বিমাত্রিক বারকোড ব্যবহার করা হয়েছে। একমাত্রিক বারকোডের সঙ্গে দ্বিমাত্রিক বারকোডের পার্থক্য হলো একমাত্রিক বারকোডের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে তথ্য রাখা যায় না। কিন্তু দ্বিমাত্রিক বারকোডের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে নানা ধরনের তথ্য রাখা যায়। দ্বিমাত্রিক বারকোডগুলো অনেকটা কমপিউটারের র্যামের (জধহফড়স অপপবংং গবসড়ৎু) মতো কাজ করে। ন্যাশনাল আইডি কার্ডে ব্যবহৃত দ্বিমাত্রিক বারকোডে ৭ হাজার বাইট মেমোরি রয়েছে। অর্থাৎ ৭ হাজার বাইট তথ্য রাখা যাবে এ দ্বিমাত্রিক বারকোডে। বাইরে থেকে তাকালে এ বারকোডে ফাকা ফাকা দাগ দেখা যায়। এর মাধ্যমে খালি জায়গা ও তথ্যে পরিপূর্ণ জায়গা বোঝা যায়।
ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ব্যবহৃত দ্বিমাত্রিক বারকোডে যেসব তথ্য রাখা হয়েছে সেগুলো হলো কার্ডধারীর সম্পূর্ণ নাম, জন্মতারিখ ও আইডি নাম্বার।
কোনোভাবেই যাতে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের অপব্যবহার করা সম্ভব না হয় সেটি নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন টেকনিকাল কর্মকর্তারা। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রাখতেই পৃথিবীর সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে ন্যাশনাল আইডি কার্ডে। আপাত দৃষ্টিতে দেখতে সাদামাটা মনে হলেও এ আইডি কার্ডেই দু’ভাবে সংরক্ষিত রয়েছে কার্ডধারীর তথ্য। যা ন্যাশনাল আইডি কার্ডের নিরাপত্তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ আইডি কার্ডে প্রযুক্তির এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যার মাধ্যমে যে কোনো কার্ড দেখেই বলে দেয়া যাবে, লোকটি বাংলাদেশের কোন এলাকার।
শেষ কথা
ভোটার লিস্ট ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরির পাইলট প্রজেক্টের কাজ ১০ জুন শুরু হয় পাচটি নিবন্ধন কেন্দ্রে। আগামী ৩০ জুন শেষ হবে শ্রীপুরের পাইলট প্রকল্পের এ কাজ। তারপরের পাইলট প্রকল্প হবে রাজশাহীতে। প্রথম পাইলট প্রকল্পে প্রযুক্তির অনেক কিছুই পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো সফলতা পেলে পরে তা সঠিক প্রয়োগের ব্যবস্থা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সামগ্রিক কর্মকা- ঘুরে দেখে একটা বিষয় স্বীকার করতেই হবে যে, ভোটার লিস্ট ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরির পাইলট প্রকল্পের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি।
### লেখাটি ছাপা হয়েছে যায়যায়দিন পত্রিকার শনিবারের টেকনোলজি অ্যান্ড টিন ম্যাগাজিনে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



