somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তরুন ইউসুফ
কাব্যগ্রন্থ : ট্রাফিক সিগন্যালে প্রজাপতি, না গৃহী না সন্ন্যাসী; nরম্যগল্পগ্রন্থ : কান্না হাসি রম্য রাশি। nছোটদের বই : রহস্যে ঘেরা রেইনফরেস্ট nইতিহাস গ্রন্থ: শেরে বাংলা ও যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন কিছু দুষ্প্রাপ্য দলিল

ভারত: মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের কার্যকারণ

০২ রা জুলাই, ২০২৩ সন্ধ্যা ৭:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বর্তমান ভারতের দিকে তাকালে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায় তা হলো মুসলমান বিরোধী সাম্প্রদায়িক মিথ্যা ইতিহাসকে খুব উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। ইতিহাস বইয়ের পৃষ্ঠা বলুন কিংবা সিনেমা, নাটকের কাহিনি বলুন সেখানে মূলত দেখানো হয় মুসলমান রাজারা বিশেষ করে মুঘল সম্রাটরা ভারত শাসনের সময় তাদের উপর শুধু অত্যাচার নির্যাতনই করেননি, পাশাপাশি অনেক হিন্দুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেছেন কিংবা হিন্দু নারীদের জোরপূর্বক বিবাহ করে তাদের গর্ভে মুসলমান সন্তান পয়দা করেছেন। প্রশ্ন হল তাদের এই প্রচারের ঐতিহাসিক সত্যতা কতটুকু? ইতিহাস কি বলছে-

ইতিহাস বলছে- মুসলমান শাসকেরা বহু বছর ধরে ভারত শাসন করেছেন বটে কিন্তু এই মুসলমান শাসকেরা কখনই হিন্দু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সুবিধাজনক অবস্থানটি নষ্ট করতে চাননি, তাঁদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টাও করেননি। মুসলমান শাসকদের সেনাবাহিনী বা রাজসভায় পদাধিকারী হিসাবে কাজ করার জন্য হিন্দুদের ধর্মত্যাগ করার প্রয়োজন হয়নি। মোগল সেনাবাহিনীতে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের চমৎকার সব বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, মুসলমান আধিকারিকেরা আল্লার নামে শপথ নিচ্ছেন, আর হিন্দুরা বিষ্ণুর নামে।

এই ধর্মীয় বহুত্বের স্বীকৃতি ছিল সাধারণ ভাবে মোগলদের ঘোষিত নীতি, ষোড়শ দ্বিতীয়ার্ধে সম্রাট আকবরের হাত ধরে যার সূচনা হয়। রোমের কাম্পো দে’ফিয়োরি-তে জোর্দানো ব্রুনোকে যখন ধর্মদ্রোহের অপরাধে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, আকবর তখন আগ্রায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতার গুরুত্ব বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। অনেক হিন্দু ইতিহাসবিদ মোগল শাসনের শেষ পর্যায়ে, বিশেষত সম্রাট আরঙ্গজেবের আমলের ‘সাম্প্রদায়িক' চরিত্র নিয়ে কঠোর মন্তব্য করন। অথচ আরঙ্গজেবের ঘনিষ্ঠ বৃত্ত এবং রাজসভায় বহুসংখ্যক হিন্দু ছিল। তাহলে যারা সাম্প্রদায়িক মিথ্যা ইতিহাস লিখছেন তার কারন কি? এর কারণ হল, ভারতে অসন্তোষ ও হিংসা ছড়াতে, এবং ধর্মীয় বিভাজন পোক্ত করতে মুসলমান-বিরোধী সাম্প্রদায়িক ইতিহাস কট্টরপন্থী হিন্দু দলগুলোকে দারুণভাবে সাহায্য করছে।

মোগল পূর্ব যুগের কি অবস্থা? ষোড়শ শতকে মোগল আগ্রাসনের আগেই বাংলার মুসলমান শাসকেরা (আফগানিস্তানের পাঠান) সেনাবাহিনী ও রাজসভায় হিন্দুদের গ্রহণ করতে শুরু করেছিলেন। হিন্দু সমাজের উঁচু স্তর থেকে ইসলামে ধর্মান্তর বিশেষ হয়নি। বাংলায় ভারতের উত্তরাঞ্চল থেকেও উচ্চ শ্রেণির মুসলমান তত আসেননি। ‘আশরফ’রা অবশ্যই ছিলেন, যাঁরা নিজেদের খাইবার পাস-এর পশ্চিম থেকে আসা জনগোষ্ঠীর বংশধর— ফারসি, আরবি বা তুর্কি সাম্রাজ্যের মতো মুসলমান-প্রধান ভূমির সন্তান— বলে দাবি করতেন। কিন্তু, তাঁদের অনুপ্রবেশ প্রচুর সংখ্যায় ঘটেনি। বেশির ভাগ ধর্মান্তরই (চতুর্দশ শতক থেকে যার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য) ঘটেছিল সমাজের অসচ্ছল অংশ থেকে, মূলত হিন্দু সমাজের স্বচ্ছন্দ গণ্ডির বাইরে। এ-কথা স্পষ্ট করে বলা যায় না যে, যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা সকলেই হিন্দু, কেননা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা হিন্দু সমাজের সঙ্গে বিশেষ সম্পৃক্ত ছিলেন না। আর তারা ধর্মান্তরিত হয়েছিল যত না চাপে পরে তার চেয়ে বেশি স্বেচ্ছায়।

ব্রিটিশ আমলে, তার প্রথম পর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকেই, হিন্দু- মুসলমান বিভাজন বাড়ে। ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস- এর ‘কর্নওয়ালিস কোড' নামে পরিচিত এক ঘোষণার ফলে, রাষ্ট্রের হাতে ভূস্বামীরা কতখানি রাজস্ব তুলে দেবেন তা ‘চিরস্থায়ী ভাবে নির্ধারিত হয়। এর ফলে তাঁরা রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ পান, সঙ্গে মালিকানার নিশ্চয়তা। এই সুরক্ষিত ভূস্বামীদের অধিকাংশই হিন্দু, এবং এর একটি অংশ জমির খাজনার ওপর নির্ভর করেই জীবনযাপন শুরু করেন, যদিও তাঁরা বাস করতেন অন্যত্র, জমি চাষাবাদও করতেন না। যাঁরা জমিদারদের খাজনা দিতেন এবং নানা ভাবে অত্যাচারিত হতেন, তাঁদের বেশির ভাগই মুসলমান। অথচ ভারতে বর্তমান প্রচারনার বড় অংশজুড়ে দেখা যাচ্ছে ভারতের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মূলে রয়েছে হিন্দুদের উপর মুসলমান শাসকদের জুলুম অত্যাচার।

এই মিথ্যা প্রচারণা কেন করা হচ্ছে? এই মিথ্যা প্রচারণার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ধর্মীয় বিভাজন পোক্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা চরিতার্থ করা। তবে আশার কথা হল ভারতের প্রগতিশীল মানুষেরা এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে অসাম্প্রদায়িক ভারত বিনির্মানে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যার ফল খানিকটা দৃশ্যমান।

তথ্যসূত্রঃ হোম ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড এবং আইডেন্টিটি এন্ড ভায়োলেন্স: দি ইলিউশন অব ডেস্টিনি-অমর্ত্য সেন; বেঙ্গল ডিভাইডেডঃ হিন্দু কমিউনালিজম এন্ড পার্টিশন-জয়া চ্যাটার্জি; হু আর দ্যা বেঙ্গলি মুসলিমস, ইসলাম এন্ড ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি- রিচার্ড ইটন।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০২৩ সন্ধ্যা ৭:৪০
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=ব্যাকুলতা....=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:২৮


ইদানিং মন বড় ব্যাকুল হয়ে থাকে
কৈশোরের উঠোনে ফিরে যেতে,
অদ্ভুত আনন্দঝরা দিনগুলি সেই;
চোখগুলো হয় মনের জানালা...
জানালায় উঁকি দিয়ে নিস্তব্ধতায় কাটে
ভাবনাগুলো হয় নীল পায়রা;
উড়াউড়ি করে কৈশোরের উঠোনজুড়ে।

সেই বটগাছ; মাথা ছিল আকাশসম
তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হতে যাচ্ছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:১১


দেবিদ্বারের রাজনীতির আকাশে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করছে, যেখানে যুদ্ধের দামামা বাজার আগেই বিজয়োল্লাসের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। আমাদের তরুণ তুর্কি হাসনাত আব্দুল্লাহর সামনে এখন এক দিগন্তজোড়া খোলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইনকিলাব জিন্দাবাদ

লিখেছেন তরুন ইউসুফ, ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৫৪


সব ঠিক আছে
আমাদের শাহাদাত
আমাদের রক্ত
আমাদের কান্না
এ মাটির সাথে মিশে যাবে
তারপর সেই মাটিতে
যে গাছ জন্মাবে
তার ছায়ায় খুনি
তুমি বসলে বুঝতে পারবে
গাছ তোমাকে ঘৃণা করছে
সেই মাটিতে
যে ঘাস জন্মাবে
সে ঘাসে পা... ...বাকিটুকু পড়ুন

১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : বাংলাদেশের নির্বাচনী ভাগ্যলিপি (একটি রূপক ভবিষ্যৎবাণী)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯


এটি কোনো বাস্তব পূর্বাভাস, জরিপ বা রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং সময়, জনমানস ও
রাষ্ট্রের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে একটি আলঙ্কারিক ভাবনা।

সময়ের পাণ্ডুলিপিতে লেখা
১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচন
সেদিন সূর্য উঠবে কুয়াশা ভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিক্রির জন্য নয় : সবুজভূমিতে রক্তপাত চাইনা !!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ইলাস্ট্রেটেড একটি ছবি পোস্ট করেছেন যেখানে, গ্রিনল্যান্ডে আমেরিকান পতাকা লাগানোর চিত্র দেখানো হয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা ট্রাম্পের ছবিতে উপস্থাপনা বোর্ডটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×