প্রথম পর্বঃ Click This Link
দ্বিতীয় পর্বঃ Click This Link
তৃতীয় পর্বঃ Click This Link
নতুন বছর এসে পড়ল। তার ক’দিন আগেই আমাদের ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্ট দিয়েছিল। আমি, লাবু, অনুপমা, ববি-সবাই মোটামুটি টেনেটুনে পাশ করে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি। আঁখি অবশ্য খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। ও বরাবরই সিরিয়াস টাইপের ছাত্রী। থার্টি ফার্স্ট নাইটের দিন আমরা সবাই খুব হৈ-চৈ করলাম। বেরসিক মায়া হাজারীও হৈ-চৈ দেখে মাঠে নেমে এলো। আচ্ছা, এখানে একটা ভুল করে ফেললাম। প্রথম পর্ব পড়ে আঁখি হুলিয়া জারি করেছে তাকে আর মায়া হাজারী লেখা যাবে না।
এসএসসি পর্যন্ত তো গ্রামে থেকে নিজ থানার স্কুলেই পড়াশোনা করেছি। গ্রামে নিউ ইয়ার সেলেব্রেশন বলতে কেবল পহেলা বৈশাখ। ইংরেজি বছর নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। এখনকার গ্রামের ছেলে-ছোকরারা হিন্দি গান বাজিয়ে আর মোরগ পোলাও রান্না করে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করে। এগুলো নিয়ে আমাদের কোন বিকার ছিল না। বিটিভিতে খবরে দেখতাম কোন দেশে কিভাবে উদযাপিত হয়েছে দিনটি-ঐ পর্যন্তই। হোস্টেলে এসে এই প্রথম আমরাও বছরের শেষ দিনকে বিদায় জানালাম। চারদিকে পটকা-বাজির শব্দ। হোস্টেলের মেয়েরা হৈ হৈ করতে করতে মাঠে নেমে এসেছে। হোস্টেল সুপার ফাহমিদা আপাও তাঁর দুই বিচ্ছু মেয়েকে নিয়ে বাচ্চাদের মতো হৈ-চৈ করছেন। ঐশি কোত্থেকে ফোম স্পিরিট নিয়ে এসেছে। ঐটা মেরে সবাইকে এস্কিমো বানিয়ে দিল। হিন্দু মেয়েরা একে-অপরকে আবীর মাখাচ্ছে। হলি উৎসবের মতো। যার যা ইচ্ছা করছে, কোন মানা নেই। শিল্পী মেয়েটা এসে আবীর দিয়ে আমাকে ভূত বানিয়ে দিল। কয়েকজন আবার কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে ব্যাডমিন্টন কোর্টে নেমে গেল। আঁখি খুব ভালো ব্যাডমিন্টন খেলত। তাকে সেখানেই দেখা গেল। ক্যান্টিন মামার ক্যান্টিন আজ এতো রাতেও খোলা আমাদের জন্য। যার যত ইচ্ছা চা-বিস্কুট খেল। ফাহমিদা আপাও কাউকে কাউকে নিজ খরচে খাওয়ালেন।
পরদিন আমরা চার রুমমেট মিলে আমাদের প্রাইভেট পড়া বাতিল করে দিলাম। আমি বললাম-
-এতো পড়াশোনা করে কী হবে? রেজাল্ট একটু খারাপ হবে না হয়। চল, আজকে আমরা কোন একটা ফাস্ট ফুড কর্নারে যাব।
অনুপমা বলল,
-খাওয়া শেষ করে প্রেম দীঘির পাড়ে যাব।
বলেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। আমি বললাম,
-প্রেম দীঘির পাড়ে কেন!
ববি চোখ টিপে দিয়ে বলল,
-ঐ দীঘির পাড়ে বিশেষ বিশেষ দিনে ম্যালা জুটি দেখা যায় শুনেছি। আমরা জুটি দেখতে যাব।
লাবনী অবাক-এই মফস্বলেও দীঘির পাড়ে জুটি বসে থাকে নাকি!
ববি অবশ্য জুটি দেখার ব্যাপারে তেমন আগ্রহী ছিল না। সে তার এক মাসী নাকি পিসির বাসায় চলে গেল। পরে জেনেছিলাম, ঐদিকেই তার বিশ্বদা’র বাড়ি। মাসি-পিসির জন্য টানের রহস্যটা তখন আর বুঝতে বাকী রইল না আমাদের। আমরা বাকী তিনজনই জুটিহীন। অবশ্য অনুর ব্যাপারে একটু সন্দেহ ছিল সে আসলে পুরোপুরি জুটিহীন কিনা। কারন- মাঝে মাঝেই তার লেখালেখিতে শ্যামল দা নামের এক অপরুপ যুবকের আগমন ঘটে, যে কিনা 'স্যেভেন'কে 'ছেবেন' উচ্চারণ করে থাকে। যাই হোক, ঠিক হল আমরা জুটিহীনেরাই আজকে প্রেম দীঘির পাড়ে যাব।
বিকেলে একটা ফাস্ট ফুড কর্নারে গিয়ে ঢুকলাম। বয় এসে জানতে চাইল কী খাব আমরা। আমরা বার্গার আর ভেজিটেবল রোল নিলাম। এগুলোর দামই সবচে কম। আমার হাতে আবার টাকা সবসময়ই কম থাকত। আমি মাসের শুরুতেই বাবার দেওয়া অর্ধেক টাকায় ‘আউট বই’ (আমার বাবার ভাষায়) কিনে ফেলতাম। বাকী অর্ধেক টাকায় কষ্ট করে চলতাম। কিন্তু বাবার জেরার ভয়ে কখনোই আর বাড়তি টাকা চাইতাম না। টাকা কম থাকায় বেশি ভালো আইসক্রীম নেওয়া গেল না। আমাদের পাশের টেবিলে তিনটা ছেলেও খাচ্ছিল। একটা ছেলে বলল,
-ওরাও তিনজন, আমরাও তিনজন। মিলে গেল। যাওয়ার সময় তিনজনের জন্য তিনটাকে নিয়ে যাব। আমার পছন্দ কালো জামা পরা মেয়েটা।
বলেই অসভ্যের মতো হাসতে লাগল। আমি অশরীরীদের ভয় না পেলেও মানুষ খুব ভয় পাই। পৃথিবীর অশান্তি সব তো মানুষের জন্য মানুষই বানায়। কোন অশরীরী তো আর বানায় না। কিন্তু মানুষ ভয় পেয়ে আমি সাবধান থাকি তা ঠিক, তবে বোবা হয়ে থাকি না। প্রতিবাদের অভ্যাস আমার ছেলেবেলা থেকেই। মেয়েদের প্রতি ছেলেদের মানসিক বা শারীরিক কোন অত্যাচারেই চুপ করে থাকা আমার সয় না। স্কুল থেকে আসার পথে কয়েকটা ছেলে প্রায়ই উত্যক্ত করত আমাকে। আমার মাথা ব্যাথার সমস্যা ছিল, তাই ডাক্তারের পরামর্শে চশমা নিতে হয়েছিল। সেই চশমা পরাকে কেন্দ্র করে ওরা আমাকে দেখলেই ছড়া কাটত,
-চশমাওয়ালি বুবুজান, এ দেশ ছারি ভারত যান। ভারত দেশের গরু-ছাগল, চশমাওয়ালির প্রেমের পাগল।
একদিন একটা ছেলে আমার হাত চেপে ধরে বলল,
-এই মাইয়া, আইজকা তরে যাইতাম দিতাম না। দেখি তুই কী করস।
আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। আমি বললাম,
-কেন? এইটা কি তোর বাপের রাস্তা?
ছেলেটা রেগে গিয়ে তখন আমার নাকে ঘুষি লাগিয়ে দিল। ক্ষেতে কৃষকরা কাজ করছিল। দুই-একজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। কিন্তু কী আশ্চর্য, কেউ কিচ্ছুটি বলছিল না! ঘুষির সাথে নাক দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসল। সবাই দেখল আমার সাদা স্কার্ফে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। তবু কেউ কিছু বলল না।
সেই ছেলেটাকে সেদিন বই ভর্তি স্কুল ব্যাগ দিয়ে কেমন এলোপাথাড়ি পিটিয়ে দৌড় মেরেছিলাম বাড়ির দিকে, সে স্মৃতি আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তখন মাত্র ক্লাস স্যাভেনে পড়তাম। সেটা নিয়ে অনেক বড় সালিশ হয়েছিল।
আমি ছেলেটাকে একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। অনুপমা আমার হাত চেপে ধরে থামাল। ও বলল,
-কিছু বলিস না।
-কেন বলব না?
-ওরা ঝামেলা করবে। ওরা চাইছেই আমরা যেন ওদের সাথে কথা বলি।
-কিছু না বললে ওরা এরকম করেই বেড়াবে।
লাবু বলল,
-আজকের দিনটা বাদ দে।
কোন রকমে খাবারটা শেষ করে রাগে গজগজ করতে করতে বের হয়ে এলাম। রাস্তায় ফুচকার গাড়ি দেখে সেই লোভও সামলানো গেল না। ফুচকা খেতে খেতে মন আবার ফুরফুরে হয়ে গেল। গেলাম প্রেম দীঘির পাড়ে। গিয়ে দেখি একটা মোটা কড়ই গাছের নিচে এক পাগল শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে আবোল-তাবোল বকছে। কোন জুটি-ফুটি নেই। কাছেই কয়েকটা উদ্বাস্তুদের আশ্রয়। সেখান থেকে কয়েকটা ছোট ছেলে-মেয়ে এসে আমাদের ঘিরে ধরল। তাদের টাকা দিতে হবে। আমরা তিনজনে মিলে দশ-পনের টাকার মতো বের করলাম। টাকাটা ওরা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে গেল। তারপর নিজেরাই মারামারি করতে লাগল। গ্রীষ্মকালে এই দীঘির পাড়ে থৈ থৈ আদুরে বাতাস থাকে। কিছুক্ষন বসে থাকলে আরামে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়। কিন্তু ডিসেম্বর শেষের বাতাস একেবারে হাঁড় কাঁপানো। তাড়াতাড়ি হোস্টেলে ফিরে যেতে পারলেই বাঁচি। তাছাড়া দিন ছোট, তাই একটু দ্রুতই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে চাইছিল। ফিরে আসব এমন সময় আরও কতগুলো ছেলে-মেয়ে তীরের বেগে ছুটে আসছিল আমাদের দিকে। লাবনী বলল,
-দৌড়া।
আমি অবাক- দৌড়াতে হবে কেন! অনুপমা বলল,
-এখনো বুঝতে পারছিস না? ওরাও টাকা চাইতে আসছে।
আমরা সত্যি সত্যি দৌড় মারলাম। কারন-আমাদের কাছে আর কোন টাকা ছিল না। কাছাকাছি ছিল সার্কিট হাউজ। একটা গাড়ি সাঁই করে বেরুচ্ছিল। এই সুযোগে আমরাও স্যাঁত করে ঢুকে পড়লাম। দারোয়ান বাধা দেয়ার সুযোগই পেল না। দারোয়ানের সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে সার্কিট হাউজের আশেপাশে একটা চক্কর দিয়ে আসলাম। আগে কখনো দেখিনি জায়গাটা। ভেতরে খুব সুন্দর। টলটলা জলের একটা পুকুর আছে। পুকুরটা আবার তিন কোনা। ধারগুলো পাকা, আর কী সুন্দর বাঁধানো ঘাট। ঘাটে ছোট্ট একটা নৌকা বাঁধা। পুকুরে নৌকার কী দরকার কে জানে! সেখান থেকে আমাদের হোস্টেল মাত্র পাঁচ-দশ মিনিটের পথ। আমরা খুব সহজেই হেঁটে চলে এলাম।
সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম নিউ ইয়ার সেলেব্রেশন। এরপর অনার্স লাইফ কেটেছে। কিন্তু এতো মজা আর কখনই করা হয়নি। এই পর্যায়ে এসে আমার তেমন বন্ধুই হল না। অনুপমা আর লাবুর সাথে মাঝে মাঝেই রাস্তায় দেখা হয়। ওদের সংসার আর বাচ্চা-কাচ্চার গল্প শুনি। শ্যামল দা’র সংগে অনুপমার বিয়ে হয়নি। শুভ নামের এক ছেলেকে বিয়ে করে সুখেই আছে সে। লাবনী সন্তান-সংসার সামলাতে গিয়ে নাকি অনার্সটাই শেষ করতে পারেনি। কেমিস্ট্রির ক্লাস রোজ করতে হয়। তাছাড়া একেকটা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে কখনো কখনো সারা দিনও নাকি লেগে যায়। শেষে কেমিস্ট্রি পড়া ছেড়ে দিয়ে পাসকোর্সে মানবিক বিভাগে পড়ে সার্টিফিকেট জুটিয়েছে। এখন একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সে। শুভ একেবারে অনুর মনের মতো ছেলে। অনু যেমন গান-বাজনা আর কবিতার মানুষ, তার বরও তেমনি। শুনেছি ছেলেদের পুরো পরিবারই শিল্পী পরিবার। তাই অনুর খুব কদর সবার কাছে। আর ববিটা যে কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে। কোথায় থাকে, কী করে কিছুই জানি না। ববির কন্ঠে লতা মুঙ্গেশকরের গানগুলো এখনো কানে বাজে আমার। কী অপার্থিব সুর যে মেয়েটার গলায় ছিল সেটা বলে বোঝানো যাবে না। আঁখি এখনো আমার সঙ্গেই আছে, এবং অবিরত আমাকে যন্ত্রণা দিয়েই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আমরা সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করি। আমাদের বুকের ভেতর হু হু করে বিষাদের বেহালা বেজে ওঠে। আনন্দের স্মৃতিও এতো বিষাদ জাগাতে জানে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

