যে দিন চুলের মুষ্টি ধরে টেনে হিচরে বিনায়ক বাড়ি থেকে মিনতিকে বেড় করে দিয়েছিল তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে।বাপের বাড়ি মাইল সাতেক দূরে।যেতে ঘণ্টা খানিক লেগে যায়।অনেক অনুরোধ করার সত্যেও বিনায়ক সেদিন কথা শোনে নি।পা পর্যন্ত জরিয়ে ধরা হয়ে ছিল।বলে ছিল, তুমি যখন চাও চলে যাই চলে যাবো-যাতে তুমি শান্তি পাও আমি তাই হবে শুধু এই রাত টুকু থাকি।সকাল হলেই চলে যাবো।মিনতি ভেবেছিল রাত হলে রাগটা পরে যেতে পারে তাই এই ভণিতা।
কোন কথাই শোনেনি সেদিন।এক কাপরে বেড়িয়ে এসে বাড়ি থেকে দশ ক্রস দূরে এসে যে বড় আম গাছটা আছে তার নিচে বসে ঘণ্টা খানিক কেঁদে ছিল।অপেক্ষা করছিল বিনায়ক তার খোজ করুক।
রাতে সেই বিমর্ষ চেহারায় এক কাপরে কি করে বাড়ি ফেরে তা নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিল না।বাবা কি ভাববে ছিল সে চিন্তাও।কিন্তু কিবা করার আছে -একটা মেয়ের যখন কোন উপায় না থাকে তখন তো বাবার বাড়িতে ফিরতেই হয়।বাবা বিয়ের সময় বিনায়ককে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল।ইচ্ছে হলে বাবা হর হামেসা পাঁচ বিঘা জমি কিনে ফেলতে পারো।
বাবার বাড়ির খুব আছে গিয়ে চোখ মুখ ভাল করে পরিষ্কার করে নেয়।যাতে বাবা কিছু বুঝতে না পারে।বাড়িতে অত রাতে দেখে বাবা জিজ্ঞাস করেছিল-কিরে মা এতো রাতে কোন সমস্যা হয় নাই তো?
না বাবা-তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল তাই চলে আসলাম।
আচ্ছা ঠিক আছে বলে বাবা তার ঘরে চলে যায়।
বার বার ফিরে জাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারেনি।বের করে দেয়ার সময় কসম কেটে বলেছিল তুই যদি আর ফিরে আসিস আমার মরা মুখ দেখবি। মিনতি স্বামীর মরা মুখ দেখতে চায় না।
আজ কিছু প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পায় না।বিনায়কের মা তার নামে কুৎসা করে লাগিয়ে ছিল নাকি অসতী।বিনায়ক একবারও জিজ্ঞাসা করলো না আসলেই সে অসতী কিনা।শাশুড়ির সেবা যত্ন কম সে কেরে নি সে।কিন্তু তবুও কেন সেই মিথ্যা কথাটা বিনায়কের কানে লাগিয়েছিল বুঝতে পারে না।বৌ শাশুড়ি যুদ্ধ কি কোন শেষ হবে না? এক দিন সেও শাশুড়ি হবে। কাড়ন সে তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল।মাস ছয় হয় ছেলের জন্ম।একদিন এই ছেলেরও বৌ হবে।সে কি তার শাশুড়ির থেকে আলাদা হতে পারবে?
ছেলে হওয়ার সংবাদ পেয়েও বিনায়ক দেখা করতে আসেনি।ছেলের জন্য একটু মায়া হলও না? সে দিন ফিরে আসার পর বিনায়ক বিহীন কষ্টের রাত পার করে এসেছে।অপেক্ষা করে গেছে কবে এসে বিনায়ক তাকে ঘরে ফিরিয়ে নেয়।এই একটা বছর কষ্টেই কেটে গেল।
প্রতিটা দিন স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার বাসনায় অধির অপেক্ষায় ছিল।কিন্তু গত কাল যখন বিনায়ক বাড়িতে আসে এবং ফিরে জাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করে -সে ফিরে যায় নি।এতো দিনের জমে থাকা খোপ কাল ঝেড়েছিল।বলে ছিল,তুমি কেমন মানুষ ছেলেকে দেখতেও কি মন চায় নি এতো দিনে?তুমি মানুষ?আমি আর ফিরে যাবো না।আমি খারাপ।কেন এসেছ?
বিনায়ককে নিরাস করে ফিরিয়ে দেয়।ফিরে জাওয়ার সময় যত দূর পর্যন্ত বিনায়কে দেখা যাচ্ছিল তত দূর পর্যন্ত চেয়ে ছিল।চেয়ে ছিল আবার সে ফিরে আসুক।এবার আসলে আর সে না করবে না।বিনায়ক ফিরে আসবেই ।তাকে আসতেই হবে।মায়া কম দেয় নি সে তাকে।সতীত্বর মূল্য সে পাবে।
মনে মনে বলে, তোমার সেই কথা আমি ভুলতে পারিনি।তুমি মরে যাও সে আমি চাই না।তাই আর আমি তোমার বাড়িতে ফিরে যাইনি।সে কথা তুমি জান না।
রাতের প্রচণ্ড বর্ষায় গাছে জমে থাকা ধুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে গেছে।পুঁজর মাল্য তুলতে ডাল তেকে ফোটা ফোটা পানি এসে প্রায় ভিজিয়ে দিয়ে যায়।জবা ফুল গাছড়াটা দেখতে দেখতে দেখতে কম বড় হল না।এখন আরও আর ফুল দেয়।
বৃষ্টি হওয়ায় এই সাত সকালে লোক কম।তা নাহলে অনেকেই ফুল তুলতে চলে আসতো।সব্বাই ঠাণ্ডায় ঘুমচ্ছে পুর দমে।কিন্তু পাশের বাড়ির বনিক এই পিচ্ছিল পথে ধরে এতো জোরে জোরে দৌরে এদিকে আসছে কেন? যে কোন সময় পরে যতে পারে।এই বনিক আস্তে দৌড়া, আস্তে দৌড়া, পরে যাবি তো।
দিদি মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেছে।
তুই তো হাঁপিয়ে গেছিস।জিরিয়ে নে।তারপর বল।
দাদা বাবু নেই।
নেই মানে?
কাল রাতের যে ঝর বইতে ছিল তাতে বাজ পরে মারা গেছে।
কি বলিস? বলেই লুটিয়ে পরতে পরতে সামলে নেয় নিজেকে।বনিকের কাঁদে ভর করে কন মতে ফিরে বাড়ি।মাল্যের ঝুরিটা সেখানেই পরে আছে।বাবা উনুনে বসে ছিল।দৌড়ে এসে ধরে আর জিজ্ঞাসা করে কি হয়েছে বনিক।
কাকা বাবু দাদা নেই সেই খবর শুনে।
আর বলতে হল না।বলল যা পানি নিয়ে যায়।কষ্টটা কি করে সে সামলে নিয়েছে নিজেও জানেনা।
মিনতি সুস্ত বোধ করে ঘণ্টা খানিক পরে।আর তখনি বাবাকে নিয়ে সোজা যাত্রা শুরু করে দেয় বিনায়কের বাড়ির দিকে।আর বলতে থাকে বাবা কসমটাই ঠিক হল।কাল আমাকে দেখে বলে সে মারা গেল।বাবা আমি চাইনি ও মারা যাক।তাই কখন ফিরে যাই নি।বনিকটা পাশেই ছিল।সে নিঃশ্চুপ করে আছে।
বাড়িটা অসম্ভব রকম ফাকা।লোক জনের তেমন আনা গোনাও নেই।এতো নিস্তব্ধ কেন মিনতি বুঝতে পারে না।সোজা দৌড়ে দেয় বিনায়কের ঘরে দিকে।
পিছন ফিরে দেখে বনিকটা নেই -হাওয়া।একি হল।ও আবার কোথায় গেল? বাবা আস্তে আস্তে আসছে।কিন্তু বনিক? ঢুকে যায় বিনায়কের ঘরে।দেখে বিনায়ক শুয়ে আছে বার উপর পা তুলে আর একটা বিড়ি ফুঁকছে আপন মনে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

