ফেসবুক ফ্রেন্ডস সাজেশনে আসা মেয়েটার প্রোফাইল পিকচার দেখে চেয়ারে বসেই গেয়ে উঠেছিল পিয়াল- ‘ইউ আর সো বিউটিফুল’, ব্যস, মাউসে ক্লিক করে দয়িতা নামের মারকাটারি দেখতে মেয়েটাকে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠাতে আর কতক্ষণ? সে অনুরোধ গ্রহণও করল অচেনা সুন্দরী। প্রোফাইল ঘেঁটে হাজার খানেক ছবির বাহার দেখে চোখ কপালে ওঠে আর কী পিয়ালের! ফ্লুরোসেন্ট আলোর দ্যুতিতে ভরপুর, গাল বেয়ে লাবণ্য ঝরে, ঠোট-দাঁত বেয়ে সে এক স্বপ্ন-স্বপ্ন ব্যাপার। লাইক বাটনে হাতের প্রেম তখন পিয়ালের… আর প্রশংসার ভাষা কবিগুরুও অত জুটিয়ে যেতে পারেননি। আচমকা প্রেমের প্রস্তাবনাও এ কন্যে গাঁইগুই করে মেনে নিল। তার পর?
আর কী, শেষমেশ রবীন্দ্রসরোবরে ক্যাফে কফি ডে-তে গোলাপ তোড়া হাতে অদেখা সুন্দরী প্রেমিকার জন্য অপেক্ষারত পিয়াল। ঠিক ৫টা বেজে দশ। কিন্তু একী! নীল সালোয়ার পরে আসার কথা যে মেয়ে জানিয়েছিল… ট্যাক্সির দরজা খুলে সেই কি হাত নাড়ল? ফেসবুকের ছবিতে মুখ জুড়ে ওই কালো ব্রণর মেলা তো চোখে পড়েনি? থুতনি ঝুলে ডাবল চিনের উঁকি আর কপালঢাকা বদখত রঙিন চুলের মধ্যযৌবনা- এ কে? নাহ! পালিয়ে আসেনি পিয়াল। তবে সেদিন বাড়ি ফিরে ফোন নম্বর আর ফেসবুক আইডি রাতারাতি পালটে ফেলেছিল বটে।
ফোটোশপ-পিকাসা-ফোটোম্যানিয়া মিলে ফেসবুক-ট্যুইটার-অর্কুট তথা ইন্টারনেটের এহেন জালিয়াতি মেক-ওভারের হ্যাং ওভার যে শুধু পিয়ালের নয়, তা অভিজ্ঞ মাত্রই জানেন। এমনিতেই সোশ্যাল মিডিয়ার যা নিন্দে বাজারে, তাতে কান পাতা দায়। এ নাকি এমন জালিয়াতির জায়গা যে একবার পা দিলে কেলেঙ্কারি আর কী! মা-বাবাদের এহেন তথ্য আর তত্ত্বে শান্তিতে চ্যাট করা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকেই। কিন্তু খানিক জালিয়াতির বিরুদ্ধেও যে একেবারে সুর তোলা যায় না।
কেন? সুন্দর মুখের জয় যে প্রাথমিক ভাবে সর্বত্র, তা কে না জানে? কিন্তু পরিচিত এক স্টুডিওর ক্যাপশন পরোক্ষ ভাবে কী মারাত্মক ছেয়ে গেছে, তা আমরা হরদম দেখতে পাচ্ছি। ফোটোশপের কারিকুরিতে খানিক জ্ঞান লাগে বটে। কিন্তু সাধ্যের মধ্যে সাধপূরণ পিকাসা বা ফোটোম্যানিয়া আছে এ ক্ষেত্রে। শ্বেতী বা ছুলিময় মুখমন্ডল নিমেষের ক্লিকে ১০০টা লাইক পাওয়ার মতো তৈরি। মুখের রেখায় বয়স বারবার নানা হ্যাটা করেছে যখন, তখন এই ফোটোম্যানিয়ার বিশেষ এফেক্ট আমাদের পাড়ার বছর ৪০-এর জয়া বৌদিকে ২৫-এর তণ্বী মার্কা পোস্টকার্ড ছবি উপহার দিল।
সোশ্যাল সাইটে এহেন কারিকুরি থুড়ি জালিয়াতির যে গল্প দিয়ে লেখা শুরু করলাম, এরকম অভিজ্ঞরা হাড়েহাড়ে জানেন বাস্তবটা সামনে আসার আফটার এফেক্ট। এখন এটা নিয়েই অন্য বিতর্ক উঠেছিল আর কী! ওই চেহারাটাই সব নাকি? বন্ধুমহলে সামান্য বিজ্ঞ বলে খ্যাত মহর্ষি জানাচ্ছে, ‘না। আসলে এটা ওই দর্শনধারীর কনসেপ্ট না। বিষয়টা সত্য-মিথ্যের। আমরা সবাই নকলের দিকে ঝুঁকছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেহেতু আমার উলটো দিকের লোকটা অপরিচিত, তাই তাকে ঠকিয়ে মজা পাওয়ার একটা স্যাডিস্টিক প্লেজারেরও ব্যাপার থাকে। কিন্তু সেটা কখনও কখনও মারাত্মক হতে পারে। আমি ফোটোর কারসাজি করে নেটে একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম জমালাম, তারপর আমার আসল থোবড়াটা দেখে সে আমায় রিজেক্ট করল- সেটা তো খুব খারাপ। নিজেরও সম্মানটা গেল; নাকি? এখানে আমি ফেসবুককে দোষ দেব না। বরং মাধ্যমটাকে যারা মিসইউজ করছে, দোষটা তাদের’, মহর্ষির মতো এতো নিউট্রাল আবার হতে পারছে না শিখরিণী। ওর মতে, ‘এটা বোকাবোকা কনসেপ্ট। আমার ছবিকে আমি মেজেঘষে অন্যরকম বানাতেই পারি। তা দেখে মজে না গেলেই হল। মুশকিলটা হল, ম্যাক্সিমাম ছেলেরাই এসব চাপ খাচ্ছে। ইন্টারনেটে ছবি দেখে এত প্রেম আসেই বা কোথা থেকে? মানুষটাকে জানার জন্য কাছে থেকে মিশতে হবে তো; নাকি’?
তবে শিখরিণীর মতো এতো চরম ফেমিনিস্ট না হলেও চলবে। বরং জেনুইনের দিকে ঝুঁকি আমরা। নিজেকে আরও বেশি সুন্দর করে পেশ করার মজাটাই আলাদা। কিন্তু তাতে আমিত্বটুকু থাকুক। আপনার ফোটোম্যানিয়ার আজব ছবি দেখে অন্য কেউ ছবি হয়ে যাক, নানান সামাজিক সাইটের এহেন অসামাজিকতা একেবারেই কাম্য নয়। ভেবে দেখুন।
সূত্রঃবিডিআর্টিকেল

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


