
এই বোধহয় পুলিশ এল— এই আতঙ্কই প্রতি মুহূর্তে তাড়া করছে গোয়ালতোেড়র বিভিন্ন গ্রামে এখনও থেকে যাওয়া অল্প ক’জন মানুষকে। ‘অল্প’, কেন না বেশির ভাগ মানুষই মাওবাদী আর পুলিশের আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছেন।
যৌথ বাহিনীর অভিযান নিয়ে সাধারণ মানুষের ভয় পাওয়ার কিছু নেই— জঙ্গলমহল জুেড় প্রচার করছে রাজ্য সরকার। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু ইতিমধ্যেই তিক্ত হতে শুরু করেছে। এক ভুক্তভোগীর খেদোক্তি, “পুলিশি সন্ত্রাস নিয়ে ক্ষোভ থেকেই এলাকা অশান্ত হয়েছে। শান্তি ফেরাতে নাকি অভিযান। অথচ ফের সন্ত্রাসই তো চলছে!”
ষাটোর্ধ্বো অনিলবরণ সাহার বাড়ি গোয়ালতোড়ের পিংবনিতে। স্থানীয় স্কুলে ইংরাজির শিক্ষক ছিলেন। কিছু দিন আগে অবসর নিয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে পুলিশের সঙ্গে পিংবনির কাছেই গুলির লড়াই হয় সন্দেহভাজন মাওবাদীদের। পুলিশের সেন্দহ হয়, অনিলবাবুর বাড়ি থেকেও গুলি চলেছে। বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। অনিলবাবুর কথায়, “আমি বয়স্ক মানুষ। স্কুলে পড়াতাম। এ সব জেনেও টানতে টানতে নিয়ে যায় ওরা। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে।” শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার না করেই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার অভিজ্ঞতা তাঁকে বলতে বাধ্য করছে, “এই বয়সে এ ভাবে বাঁচার চেয়ে মরে যাওয়াই শ্রেয়!”
অশোক কদমার বাড়িও পিংবনি অঞ্চলে। গরু-ছাগল নিয়ে এখনও ভিটেতে পড়ে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “এমনটা আগে দেখিনি। শুক্রবার বিকেলে পুলিশ এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়েছে। কোনও রকমে মাঠ ধরে দৌড়ে বেঁচেছি।” তার পর থেকেই, ‘এই বুঝি পুলিশ আসছে’র আতঙ্ক তাঁকে পেয়ে বসেছে। শনিবার পালিয়েই বেড়িয়েছেন। রবিবার বিকেল পর্যন্ত নতুন করে পুলিশি অভিযান না হওয়ায় সাহস করে বাড়ি ফিরেছিলেন। ভাত চিড়েয়ছিলেন উনুনে। রটে যায়, পুলিশ আসছে। রান্না ফেলেই আবার দৌড়।
গোয়ালতোড় ব্লকে গ্রামের পর গ্রামে সোমবার দেখা গিয়েছে একের পর বাড়ি তালাবন্ধ। অশোকই জানান, শুক্রবারের সেই পুলিশি অভিযানের পরে গ্রাম ছেড়ে যে যেখানে পেরেছেন চলে গিয়েছেন। তল্লাশির নামে অনেক ঘরবাড়িতে ভাঙচুর চালানো হেয়ছে বলেও অভিযোগ। গাছতলার সেলুনের আয়নাও পুলিশ ভেঙে দিয়েছে!
লালগড় লাগোয়া গ্রাম হরিহরপুর। রবিবার বিকেলে স্বপন সিংহ সাইকেলে লালগড় বাজারে যাচ্ছিলেন পুজোর চিড়ে-বাতাসা কিনতে। তাঁর অভিযোগ, সাইকেল থেকে নামিয়ে সিআরপিএফ জওয়ানরা দেহ তল্লাশি করে। তার পরে মারধর করে ছেড়ে দেয়। লালগেড়র পাথরডাঙা গ্রামের দুলাল মালেরও একই অভিজ্ঞতা। রবিবার ব্লক সদরে পশু চিকিৎসকের কাছে ছাগল নিয়ে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তাঁকেও সিআরপিএফ জওয়ানেরা মারধর করে। সহকর্মী নবকান্ত রায়ের সানেষ্ট্রাকে মৃত্যুর জন্যও জওয়ানরা দোষারোপ করেছেন লালগেড়র মানুষকেই। দুলালবাবুর কথায়, “ওরা বলে, তোদের জন্য নবকান্ত মরেছে। ভাগ!”
জনগণের কমিটির সম্পাদক সিদো সরেনের বক্তব্য, “গ্রামে গিয়ে মহিলাদেরও মারছে কেন্দ্রীয় বািহনীর জওয়ানেরা। পিংবনির গোবিন্দ দাঁ পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছেন।” তাঁর অভিযোগ, “গোয়ালতোড়ে সিপিএম-কে সঙ্গে নিয়ে অভিযানে নেমেছে পুলিশ। অন্তত একশো ক্যাডার রেয়ছে। সিজুয়াতেও পুলিশ-আধা সেনার সঙ্গে সিপিএমের লোকজন গ্রামে ঢুকে অত্যাচার চালাচ্ছে।” গোয়ালতোড়ে সিপিএমের অনেক সমর্থকের বাড়িতে বেআইনি অস্ত্র আছে অভিযোগ করে সেই সব বাড়িতেও অভিযানের দাবি করেছেন সিদো।
বেলপাহাড়ি ব্লকেও ক’দিন ধরে পুলিশ-সিআরপিএফ জওয়ানেরা অত্যাচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার সিয়ারঁবিধা, মাজুগোড়া, চাকাডোবায় সিআরপিএফ গিয়ে জনগণের কমিটির কেয়কটি চেকপোস্ট ভাঙে বলে অভিযোগ। শুক্রবার ফের অভিযান হয় চাকাডোবা বাজারে। দোকানপাট ভাঙচুর, ঘরে-ঘরে তল্লাশির নামে মারধরের ঘটনা ঘটে। প্রতিবাদে শনিবার কমিটি কেয়ক জায়গায় মিছিল করে। তার পরেই রবিবার ভোরে ফের অভিযান হয় বাঁশলাটা গ্রামে। বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে ‘মাওবাদী’ খোঁজার নামে ‘অকথ্য অত্যাচার’ চলে বলে অভিযোগ করেছেন জনগণের কমিটির স্থানীয় সংগঠক জগন্নাথ সর্দার। মহিলাদেরও টেনে-হিঁচেড় নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। খোকন হাঁসদা, রাদু সর্দার, মন্টু দাস নামে তিন জনকে মাওবাদীদের ‘লিঙ্কম্যান’ সন্দেহে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
অত্যাচারের এ সমস্ত অভিযোগই অবশ্য অস্বাকীর করেছেন সিআরপিএফের কম্যাণ্ড্যান্ট থেকে শুরু করে রাজ্য পুলিশের আইজি। পিংবনির সেই প্রবীণ শিক্ষকের সতর্কবাণী, “এক কথায় সমস্ত অভিযোগ খারিজ করার সংস্কৃতিই কিন্তু এখানে এই অশান্তি ডেকে এনেছে। প্রশাসন সে-দিকটা খেয়ালে রাখলেই ভাল হয়।”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


