আনন্দবাজার থেকে -
সোমবার কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় সংসদে বাজেট পেশ করার পরেই এই প্রশ্ন ঘুরে বেড়েয়েছে বাংলার শিক্ষা তথা মননের জগতে। এমন একটা নাম কি হতে পারত না, যাকে আম বাঙালি সহজেই নিজের বলে ভাবতে পারত?
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালেয়র শাখাকেন্দ্র গড়তে পিশ্চমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই মুর্শিদাবাদে জমি নির্দিষ্ট করেছে। উচ্চশিক্ষা দফতর সূত্রে খবর, এ খাতে রাজ্য সরকারের বিনিেয়াগ বলতে ওই জমি। বাকি খরচ সবই কেন্দ্রের। এ দিনের বাজেটে সেই শাখাকেন্দ্রের জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে অবস্থিত, একদা সেটা ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালেয়রই খাসতালুক। এখন কলকাতার দোরগোড়ায় আলিগড়কে উজিয়ে আনার কী দরকার ছিল?
প্রণববাবুর ব্যাখ্যা, “এটি আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালেয়র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক কমিটি ‘কোর্ট’-এর সিদ্ধান্ত। সেই অনুযায়ী পিশ্চমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ এবং কেরলের মাল্লাপুরমে দু’টি শাখাকেন্দ্র খোলার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হেয়ছে।”
এই উদ্যোগের নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারিগর সিপিএমের রাজ্যসভা সদস্য মইনুল হাসান। তিনিও মানছেন, যে বিশ্ববিদ্যালয় বাংলায় হচ্ছে, তার নামের সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতির মিল থাকলেই ভাল হত। তবে পাশাপাশি তিনি মুর্শিদাবাদে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালেয়র শাখাকেন্দ্র গড়ার সিদ্ধান্তের পশ্চাৎপটটিও ব্যাখ্যা করছেন। ওই বিশ্ববিদ্যালেয়র ‘কোর্ট’ সদস্য মইনুলের বক্তব্য, স্যার সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে যে আলিগড় আন্দোলন হয়েছিল, তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সংখ্যালঘুদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালেয়রও মূল লক্ষ্য তা-ই।
২০০৬ সালে সেই নীতিনির্ধারক কমিটির বৈঠকে স্থির হয়, সংখ্যালঘুদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে লক্ষ্যে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় নিজেকে আরও ছিড়েয় দেবে। কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রক আগেই তাদের এ প্রস্তাব দিয়েছিল। তা নিয়ে জাতীয় স্তরে আলোচনাও হয়। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র-সহ কেয়ক জায়গায় আলিগড় বিশ্ববিদ্যালেয়র শাখাকেন্দ্র গড়ার সিদ্ধান্ত।
কিন্তু আলিগেড়র নাম এবং তার ধাঁচ— কোনওটাই পছন্দ করছেন না অধ্যাপক ওসমান গণি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালেয় ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতির এই প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান স্পষ্টই বলছেন, “ওটা আলিগড়, এটা পশ্চিমবঙ্গ। ওটা কী করে বাঙালির প্রতিষ্ঠান হল?” তাঁর আরও প্রশ্ন, “আলিগড়ের ধাঁচকে পশ্চিমবঙ্গে টেনে আনতে হবে কেন?”
মইনুল বলেন, মুর্শিদাবাদে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালেয়র জন্য দীর্ঘ দিন ধরেই তাঁরা কেন্দ্রের কাছে দাবি জানিেয় আসছিলেন। তাঁর কথায়, “এনডিএ সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী মুরলীমনোহর জোশী জানিয়ে দিয়েছিলেন, রাজ্যে একটা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় (বিশ্বভারতী) রেয়ছে। আর একটা গড়ার কোনও পরিকল্পনা নেই।” তাই ২০০৬-এ যখন আলিগেড়র বেশ কেয়কটি শাখাকেন্দ্র গড়ার সিদ্ধান্ত হল, তখন স্বভাবতই তার একটা পিশ্চমবঙ্গে গড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। মুখ্যম0ী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজেই এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে চিঠি লিখেছিলেন বলে মইনুল জানান।
মইনুলের বক্তব্য: যেখানে একেবারেই হিচ্ছল না, েসখানে অন্তত কিছুটা তো হোক— এই ভাবনা থেকেই রাজ্য প্রস্তাব দিেয়ছিল। তিনি এ-ও জানাচ্ছেন, নামে শাখাকেন্দ্র হলেও মুর্শিদাবাদের প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটি কার্যত পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ই হবে।
কিন্তু এই ‘হওয়া’য় কোথাও যেন পূর্ণাঙ্গতার অভাব দেখছেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। যিনি বলছেন, “শুনে খটকা লেগেছে। অন্য শহরের নামে বিশ্ববিদ্যালয় কেন?” ব্যাপারটা যে বাঙালিয়ানায় ভাল মতোই ঠেস লাগায়, তা-ও বলছেন শীর্ষেন্দুবাবু। তাঁর প্রশ্ন, “একটা বাংলা নাম পাওয়া গেল না? মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ও তো হতে পারত!”
উষ্মা প্রকাশ করেছেন রাজ্য মন্ত্রিসভার এক সদস্যও। তাঁর কথায়, “ওখানে আলিগেড়র কী দরকার ছিল, বুঝতে পারছি না। শাখা যদি খুলতেই হয়, তবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালেয়র শাখা নয় কেন? কলকাতা কি আলিগেড়র চেয়ে কম নামী বিশ্ববিদ্যালয়?”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


