উত্তর ফাল্গুনে নিষাদের বুক বিষাদে ছেয়ে গেছে অনেকবার। কিন্তু, কবির ভাই বা ভাবির মুখে বিষাদের ছাপ দেখিনি কখনও! কাঠালের পাতা থেকে খসে পড়া; ঝরা মুক্তোর ছবি দেখেছি যে কতবার হিসাব মেলে না মোটেও অথচ দুজন মানুষ অথবা অতিমানুষ অথবা না, যাদের বুকের একদিকে যেমন দেখেছি আগ্নেয়গিরির গলিত লাভা, ঠিক আরেক দিকে নায়াগ্রার জলপ্রপাতের চেয়ে আরও গভীর, আরও নিদারুণ কান্না; কিন্তু, চোখের কোণের বালিকণা চোখের জলে সিক্ত হয়নি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তাই না গৌতম দা। কিন্তু এই-ই সত্য। কঠিন সত্য। যে ‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’। তপুর কথা বলতে পারি না, কিন্তু আমার নীরা ভাবি কাটিয়েছে অনেক নির্ঘুম রাত, রাত্রির পেয়ালায় আধারপান করে নিজেকে অবগুণ্ঠিত করেছে শাশ্বত সত্যের সম্মুখে, হৃদয়ের ক্ষগুলো ব্যথার বালিশ করে কতো তার নিশ্চিন্তের ঘুম, আকাশের বুক থেকে নিঃসীম ঝরে পড়া স্বপ্নের মতো। সত্যিই দাদা, প্রতিটি বৃষ্টির রাত নীরা ভাবির কান্নার জলে ভেজা, ঠিক যেন অশ্রুস্নান। নীরা ভাবি কাঁদতেও পারেন না, চোখের পাশে চোখ আছে যে! তবুও তিনি কাঁদেন। আমি নিশ্চিত জানি, মনে মনে। বৃষ্টির মধ্যে ভাবি কাঁদেন, ‘কান্নার ভেতরে আমি হাঁটি’, হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই অনেক দূর,
অ নে ক দূ র, অনন্ত নক্ষত্র বীথির পর যেখানে উত্তর কলোনীর মাঝের ফাঁকা মাঠ, তাতে সাজানো অনেকগুলো সাঁকো বানাবার চাঁই, যার একটিতে মাসিক পঞ্চাশ টাকা ভাড়ায় ঘর বেধেছে পথ হারা দুই পাখি। যার একজন আমার দেবতা আর একজন দেবী। সত্যিই। যেমন বাবুই পাখির বাসা দোলে কোন কোন গাছের ডালে, অনেকগুলো একই সাথে তেমনি দুলে ওঠে আমার মন এই মানুষ পাখির পান্থশালায়। দুপার্শ্বে চট ঝুলিয়ে লজ্জা নিবারণের দুর্বার প্রচেষ্টা, যদিও শতচ্ছিন্ন চটের ফাক দিয়ে ভেতরটা উঁকি দিয়েই থাকে, আর উঁকি দেয় নির্ঘুম রজনীর অবাধ জোছনারাশি, মুহূর্তেই এই ঘর হয়ে যায় সিদ্ধার্থের মতো গৃহত্যাগী জোছনার ঘর। আর এক সিদ্ধার্থ যেন ঠিক এই ঘরে বসে জাল বোনে মাকড়সার মতো, সারারাত ধরে। চারদিকে নীলিমায় জোছনায় মেশামেশি আর এক নির্ঘুম মাকড়সা প্রথিত জালের চূড়ায় বসে ছোটগল্পের যুক্তিতে শাণ দেয়। তারপর যখন পশ্চিম আকাশে দেখা দেয় শুকতারা সখিগণসহ, চাঁদ ডুবে যায়, সূর্যের নিঃসীম আগমন বার্তায় সেও স্বীয় জাল কেটে বেরিয়ে আসে আহারের খোঁজে। তাকে আসতেই হয়, পেট আছে যে।
২.
এক পা পঙ্গু কবির ভাইয়ের। তাই অনেকেই তাকে নুলা কবির বলে ডাকে। ফলে কাঠের একটিসহ আড়াইখানা পা নিয়ে কোন কঠিন শ্রমসাধ্য কাজ তিনি করতে পারেন না। বাটার মোড়ের এক অন্ধকার গলির মাঝে এমন একটি ঘরে তিনি কাগজের ঠোঙা বানানোর কাজ করেন যেখানে ভুল করেও কখনো সূর্যের আলো পৌঁছায় না। সেখানেই উদয়াস্ত পরিশ্রম করে প্রতিদিন ত্রিশ টাকা রোজগার করেন। যদিও পরিশ্রমের তুলনায় এ আয় কিছুই না। একজন ভিখারির প্রতিদিনের আয়ও তাঁর চেয়ে বেশি। তবুও ভিক্ষা করতে তিনি পারেন না বলে, এ কাজ তাকে করতেই হয়।
৩.
অনেক বড় ঘরের মেয়ে নীরা ভাবি। মেধাবীও। পড়তেন সরকারি কলেজে। সেখানেই প্রথম কলেজ ম্যাগাজিনে পড়েন কবির ভাই এর গল্প, সাথে সাথে প্রেমে পড়ে যান। আর তিনমাস না পেরুতেই কবির ভাইয়ের হাত ধরে ঘর ছাড়েন; এক তরুণ গল্পকারের গল্পের ভেলায় চেপে আকাশ পাড়ি দেওয়ার অবাধ অভীপ্সা নিয়ে। দুজনেই মেধাবী হওয়াতে কারও পরওয়া তাঁরা করেননি। বিয়ের পরই দুজন একটি ঘর ভাড়া করেন। কবির ভাই টিউশনি করতেন, তাতে দু’জনের বেশ চলে যেত। কিন্তু, একদিন টিউশনি করে ফেরার পথে কবির ভাই এর বাম পায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চলে যায়, তারপর...। লেখাপড়া আর কারোরই হয়নি। সংসারের হাল ধরতে হয়েছে নীরা ভাবিকেই। তিনি কাজ করেন রাস্তার মোড়ে কালুমিয়ার ভাতের দোকানে। সকাল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত কালুমিয়ার দোকানে থালা-বাসন, হাঁড়ি-পাতিল ধোওয়া থেকে সবকাজই তাকে করতে হয়। বিনিময়ে পান তিন বেলার খাবার। সেই খাবার দুজন ভাগ করে খান। যেদিন কবির ভাই দুপুরে খেতে আসেন না সেদিনের খাবার কারো কাছে কম দামে বিক্রি করেন নীরা ভাবি। তাতে যে টাকা আসে তা দিয়েই চলে কবির ভাইয়ের গল্প লেখার কাগজ-কলম কেনার দাম।
৪.
কবির ভাই অসুস্থ বেশ কিছুদিন থেকে। তাঁর বাম পায়ের কাটা জায়গায় আবার নতুন করে ঘা দেখা দিয়েছে, ঘায়ে পচনও ধরেছে। দুর্গন্ধে কাছে কেউ যেতে পারে না। ফলে ঠোঙা বানানোর কাজও তার চলে গেছে। এখন তিনি আর ঘর থেকে বেরুতে চান না। ফলে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে নীরা ভাবির জন্য। তারপরও তিনি প্রাণ দিয়ে কোনমতে চালিয়ে নিচ্ছেন। কবির ভাইয়ের জন্য যে ঔষধগুলো একামত্ম দরকারি তার সবগুলো কেনা সম্ভব হয় না। দুএকটা যা কিনে খাওয়ান তাতে ঘা সারার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর এদিকে সারাদিন ঘরে বসে থেকে গল্প লেখার দিকে যেন একটু বেশিই ঝোঁক কবির ভাইয়ের। এর কারণও আছে। তাঁর বিশ্বাস কোনদিক থেকে যেহেতু কোন রোজগারের পথ নাই, সেহেতু গল্প লিখে পত্রিকায় পাঠাতে পারলে কিছু টাকা পাওয়া যেতেও পারে। তাই তার এই শেষ চেষ্টা। কিন্তু গল্প লেখার কাগজ-কলম কেনা সম্ভব নয় নীরা ভাবির। তাঁর কাছে ঔষধটাই বেশি দরকারি। কিন্তু কবির ভাইয়ের এককথা ঔষধ নয় দারকার কাগজ কলম। এদিকে সপ্তাহ খানেক আগে যে গল্প তিনি পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন, তা নাকি ছাপা হয়েছে। নীরা ভাবি পত্রিকা কিনতে পারেননি, দেখে এসে খবর দিয়েছেন। ফলে অন্ধকারেও আশার আলো দেখেছেন কবির ভাই। এখন তাঁর কাগজ চাই। কলম চাই। ঐদিকে ঔষধের দোকানে বাকির পরিমাণ বেড়েই চলেছে, দোকানদার আর ধারে ঔষধ দিতে চায় না। এখন নীরা ভাবি ঔষধ নিতে গেলে নানা রকম অশুভ ইঙ্গিত করেন। টাকাগুলো তাড়াতাড়ি পরিশোধ করা দরকার। অথচ হাতে এক টাকাও নাই। কালুমিয়াও একশ টাকা ধার দিয়ে আর পারবে না বলে দিয়েছে। তার উপর কাগজ-কলমের জন্য কবির ভাইয়ের পীড়াপীড়িতে অসহ্য যন্ত্রণায় আছেন নীরা ভাবি। আমি বারবার সাধ্যমত সাহায্য করতে চেয়েছি তাদের, কিন্তু নীরা ভাবি সসম্ভ্রমে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বলেছেন, ‘তোমার সাহায্য নিলে কিছু সুখ পাই; কিন্তু অপমানের শেল বিধে বুকে, অপমানের সুখ চাই না ভাই’। এ কথা বলার সময় তার মুখে ঝুলে থাকে রহস্যময় হাসি। কষ্টক্লিষ্ট মুখের ছাঁদে দোলানো এই হাসি যেন স্মরণ করিয়ে দেয় তিনি কখনোই পরাজিত নন। পরাজয় বরণ করে তাঁর স্বস্তিও নেই। বরং জীবন যুদ্ধে আমরণ লড়াই করে যাবেন তিনি। শতচ্ছিন্ন ক্লান্ত শরীরে বাসা বেঁধেছে অনেক ব্যাধি, বাঁধুক তবুও মুখে ঝুলে থাকা রহস্যময় হাসিকে তিনি কখনোই খসে পড়তে দেননি, সে হাসি কষ্টের হাসি হলেও।
৫.
আজ দুবেলার নিজের অংশের ভাত বিক্রি করে যে দশ টাকা পেয়েছেন তা নিয়ে একটি ঔষধ আনতে দোকানে গিয়েছিলেন নীরা ভাবি। ঔষধ নিয়ে ফেরার পথে দেখেন রাস্তার উপর একটি কলম পড়ে আছে। কলমটা তিনি তুলে নেন। কলমে অর্ধেক পরিমাণ কালি আছে। ঐ কলম আর ঔষধ নিয়ে তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করেন তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। শতচ্ছিন্ন চটের ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের আলো নিয়ে এসেছে নতুন এক গল্পের বার্তাবহ। এখন যা কবির ভাইয়ের মাথার ভেতর ঘুরছে। নীরা ভাবির হাতে তাই কলম দেখে তিনি গল্প লেখার জন্য হন্যে হয়ে ওঠেন। কিন্তু, কলমের পর কাগজের পরিবর্তে ঔষধ দেখে মাথায় খুন চেপে যায় তাঁর, রাগ করে নীরা ভাবির কাছ থেকে ঔষধ নিয়ে ড্রেনে ফেলে দেন। আর এই প্রথম বারের মতো নীরা ভাবির সাথে তিনি অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেন, নীরা ভাবিকে বলেন বেরিয়ে যেতে।
৬.
তবুও নীরা ভাবির চোখে আমি দেখিনিতো কষ্টের ছাপ। প্রসন্ন পাপিয়া যেন এইমাত্র পেয়ে গেল জলবিন্দু বাণি। মুখে তাঁর তখনো ঝুলে আছে সেই রহস্যময় প্রাণান্তকর হাসি। আজন্ম লালিত সব ভালোবাসা এক ঢোকে পান করে শেষে কবির ভাইয়ের মাথায় রাখেন হাত; মাথার চুলে বিলি কেটে কি যেন বলতে গিয়ে এই প্রথম ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। অতঃপর হঠাৎই কি যেন ভেবে, বাইরে বেরিয়ে যান জোছনা গায়ে মেখে। ফিরে আসেন ঘণ্টা খানেক পর। তখন তাঁর হাতের মুঠোয় দুটি কড়কড়ে একশ টাকার নোট। নোটদুটো কবির ভাইয়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বলেন, ‘এই নাও যতখুশি কাগজ কেনো, কলম কেনো গল্প লেখো’। কবির ভাই প্রথম কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খান তারপর সামলে নিয়ে বলেন, ‘এতো টাকা তুমি কোথায় পেলে?’ নীরা ভাবি একটু সময় নিয়ে বলেন, ‘তোমাকে তো বলেছি, আমি যে দোকানে কাজ করি তার মালিক কালুমিয়ার অনেকদিন থেকে নজর আমার দিকে। দুশ টাকা চাইলাম আর রাজি হয়ে গেল।’ তখনও তার মুখ হাসি হাসি। কোন এক মহাব্রত সাঙ্গ করে, অথবা পূণ্যকর্ম পূণ্যস্নান শেষে প্রশান্তির হাসি। কবির ভাই দুহাতে মুঠো মুঠো চুল ছিড়ে ডুকরে ওঠেন, ‘এ তুমি কী করলে নীরা’! নীরা ভাবি তখনও প্রসণ্ণ ত্রিধামূর্তি। অনেকটা আদুরে গলায় বলেন, ‘আজ থেকে অনেকদিন আগে আমি যখন তোমায় ভালোবেসেছিলাম, তখন ঠিক যেন তোমাকে নয়, ভালোবেসেছিলাম একজন লেখককে। অথচ, আজ ঠিক বুঝতে পারি একজন লেখককে নয় তোমাকে আমার বেশি দরকার। আর তুমি সারাজীবনেও আমাকে ভালোবাসতে পারোনি গো, সব তোমার ছল, তুমি ভালোবেসেছো তোমার লেখাকে, তোমার সৃষ্টিকে। একি! তুমি কাঁদছ! ছি! তুমি না লেখক। অমন পাগলামী করেনা লক্ষীটিতোমার মাথায় গল্প আছে, কলমে কালি আছে। আমার শরীরে তো আর গল্প লিখতে পারবে না। তাই... আমি আজ হতে মিশে গেলাম শাশ্বত তারার মিছিলে।’
৭.
আপনারা দেখেছেন নিশ্চয়ই সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে এক নুলা পাগলা কোন মেয়ে দেখলেই তার দিকে আঙুল তুলে বলে ওঠে, ‘এ তুমি কী করলে নীরা!’ সেই পাগলটাই আমার কবির ভাই।
আচ্ছা পলাশ ভাই, আমার নীরা ভাবিকে সবাই অসতী বলে। সত্যি করে বলুন তো, দেবী কি কখনো অসতী হয়?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

