বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি এখন এক আতঙ্কের নাম। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে উৎসবের পোশাক সবখানেই এই অদৃশ্য শক্তির কালো হাত প্রসারিত। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারের বিশাল সেন্টারে ‘নবীন ফ্যাশন’ এর স্বত্বাধিকারী এনামুল হাসান নবীন ওরফে নবীন হাশেমীর সাথে যা ঘটল, তা কেবল একজন উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক পরাজয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থা এবং ন্যায়বিচারের ওপর এক চরম চপেটাঘাত। যখন একজন তরুণ ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে চান, তখন তাকে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে সিন্ডিকেটের বলির পাঁঠা বানানো হয় এর চেয়ে বড় লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে?ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এনামুল হাসান নবীন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী নন তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা তরুন প্রবাসী উদ্যোক্তা। করোনাকালের কঠিন সময়ে বিদেশের মোহ ত্যাগ করে নাড়ির টানে দেশে ফিরেছিলেন আর্তমানবতার সেবা আর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে। তার ব্যবসায়িক দর্শন ছিল ভিন্ন। তিনি ব্যবসাকে কেবল মুনাফা নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতায় পরিনত করেছিলেন । তার কারখানায় কাজ করত হিজড়া জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী এবং মাদকাসক্তি থেকে ফিরে আসা অন্ধকার জীবনের মানুষেরা। অর্থাৎ, তার প্রতিটি পাঞ্জাবি বিক্রির পেছনে ছিল সমাজের প্রান্তিক মানুষের অন্নের সংস্থান। কিন্তু আমাদের ঘুণে ধরা সমাজ ও বাজার ব্যবস্থা সেই মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে ব্যর্থ হয়েছে।
ঈদ বিশ্ব মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় উৎসব আর বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ধর্মীয় ভাবে ঈদ ই সবচেয়ে বড় উৎসব, আর পাঞ্জাবি এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর পাঞ্জাবি পোশাক হিসেবে ও আমার সংস্কৃতির একটি অংশ। তাই এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী আমাদের ধর্মীয় ও সংস্কৃতিক আবেগকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিশাল সেন্টারের মতো বিপণি বিতানগুলোতে অলিখিত নিয়ম করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট উচ্চমূল্যের নিচে কোনো পোশাক বিক্রি করা যাবে না। নবীনের ‘অপরাধ’ ছিল তিনি এই অশুভ প্রথা ভেঙেছিলেন। তিনি ১৯৮০ টাকায় ছয়টি পাঞ্জাবি দেওয়ার অফার দিয়েছিলেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য ছিল এক পরম পাওয়া। কিন্তু যেখানে সাড়ে চার হাজার টাকার নিচে পাঞ্জাবি বিক্রি করা ‘নিষিদ্ধ’, সেখানে ৩০০ বা ৫০০ টাকায় পাঞ্জাবি বিক্রি করা সিন্ডিকেটের চোখে হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পাপ’। প্রতিবেশী দোকানদাররা এই মানবিক উদ্যোগকে রিলিফ দেওয়ার সাথে তুলনা করে যে বিরোধিতা করেছেন, তা তাদের চরম সংকীর্ণ মানসিকতা ও লুণ্ঠনকারী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো এই অশুভ প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্যের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা। যখন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নবীন ফ্যাশনের বিক্রিয় কেন্দ্র বন্ধ করতে চাইল, তখন পুলিশ নবীন ফ্যাশনের মালিক ও কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়ার বদলে উল্টো দোকান বন্ধ করতে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটি রাষ্ট্রের জন্য এক অশনি সংকেত। যদিও উচ্চ আদালত এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে তলব করেছেন এবং দোকান খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এটি বিচার বিভাগের প্রতি আমাদের আস্থা বাড়ালেও, নবীনের মতো একজন সংবেদনশীল মানুষের মনের ক্ষত কি তাতে সারবে? এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি ও দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ হেলাল উদ্দিনের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
নবীন হাশেমী সংবাদ সম্মেলনে যে আর্তনাদ করেছেন, তা প্রতিটি বিবেকবান নাগরিককে স্পর্শ করেছে। তিনি ভয়ে গাড়ির জানালার পর্দা নামিয়ে যাতায়াত করেছেন, পাছে তাকে কেউ গুলি করে মেরে ফেলে। স্বাধীন বাংলাদেশে একজন সৎ ব্যবসায়ীকে কেন খুনের আতঙ্কে থাকতে হবে? কেন তাকে হুমকির মুখে ফেসবুক পোস্টে লিখতে হবে যে, " সিংহের মতো বাঁচতে চাই, কিন্তু সিন্ডিকেটের গুলিতে সন্তানদের এতিম করতে চাই না " ? এই একটি বাক্য বাংলাদেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার দাপটের কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত করে দেয়। যখন সিন্ডিকেটের হোতারা নিজেদের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে হুমকি দেয়, তখন বুঝতে হবে ঘুণপোকা আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর গভীরে ঢুকে পড়েছে। নবীনের দেশত্যাগ কেবল একজন ব্যক্তির চলে যাওয়া নয়, এটি সেই সব তরুণ উদ্যোক্তার আত্মবিশ্বাসে কুঠারাঘাত, যারা বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে অর্জিত রেমিট্যান্স নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করতে চান। নবীনের এই চলে যাওয়া আমাদের জানান দিচ্ছে যে, এই দেশ বর্তমানে সৎ ও মানবিক ব্যবসায়ীদের জন্য এক অনিরাপদ চারণভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা হাতী ও পাতি নেতা আর অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্র এতটাই শক্তিশালী যে, তারা খোদ জনকল্যাণমুখী উদ্যোগকেও স্তব্ধ করে দিচ্ছে। নবীনের অবর্তমানে সেই তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রতিবন্ধী ও হিজড়া কর্মীদের কর্মসংস্থান আজ অনিশ্চিত। তাদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার অপরাধে আজ উদ্যোক্তাকেই দেশ ছাড়তে হলো।
সরকার বারবার সিন্ডিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কি? যখন একজন তরুন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সাশ্রয়ী দামে পণ্য বিক্রি করতে চান, তখন তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে " হিরো" বা বীরের মর্যাদা দেওয়া উচিত ছিল। অথচ আমরা দেখলাম উল্টো চিত্র। নবীনের দোকান বন্ধের মাধ্যমে সিন্ডিকেট কেবল তার ব্যবসাই বন্ধ করেনি, বরং সাধারণ ক্রেতাদের সস্তায় পণ্য পাওয়ার অধিকারকেও হরণ করেছে। যারা ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলার জন্য তাকে হুমকি দিয়েছে, তারা মূলত তাদের অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে চেয়েছে। আজ নবীন হাশেমী দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। হয়তো তিনি প্রবাসেও ব্যবসা করে আবার সফল হবেন, নিরাপদে থাকবেন। কিন্তু বাংলাদেশ কী হারালো? বাংলাদেশ হারালো একজন ইনসাফকামী উদ্যোক্তাকে, হারালো অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলকে। আজ যদি এই সিন্ডিকেটকে কঠোর হস্তে দমন করা না হয়, যদি নবীনের মতো তরুণ উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে কোনো সাহসী মানুষ এ দেশে বিনিয়োগ করার সাহস পাবে না। মেধা পাচারের পাশাপাশি এখন উদ্যোক্তা পাচার শুরু হওয়া একটি জাতির জন্য চরম সংকেত।
পরিশেষে বলতে চাই, সময় এসেছে বাজার সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলার। প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সিন্ডিকেটের দোসরদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নবীন ফ্যাশনের মতো উদ্যোগগুলোকে আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে। অন্যথায়, একের পর এক সৎ উদ্যোক্তা দেশ ছাড়বেন, আর সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে থাকবে একদল লুণ্ঠনকারী সিন্ডিকেটের কাছে। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই না যেখানে " ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রি করা " অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। রাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে নবীন হাশেমীর মতো উদ্যোক্তাদের ফিরিয়ে আনা এবং তাদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা। সিন্ডিকেটের জয় মানেই সাধারণ মানুষের পরাজয় আর এই পরাজয় ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




