somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইংরেজি শিখতে কেন থাইল্যান্ড যেতে হবে?

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইসলামি চিন্তাধারা অনুযায়ী জ্ঞান অর্জন প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরজ। এই জ্ঞান কেবল ধর্মীয় নয়, বরং মানুষের কল্যাণ ও সমাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান, ভাষা ও কারিগরি দক্ষতাও এর অন্তর্ভুক্ত। দর্শনের একটি শাশ্বত বাণী হলো জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাও। এই প্রবাদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো জ্ঞানের গুরুত্ব ও সীমানাহীনতা। একজন মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় বরং সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান, ভাষা এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জনও ইবাদততুল্য। বিশেষ করে একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করেন, তখন সেই দায়িত্ব সুচারুভাবে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করা তার নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব। তবে এই জ্ঞান অর্জনের সফরের পেছনে শর্ত থাকেমপ্রকৃত লক্ষ্য এবং আমানতদারিতা। যদি সেই সফরের আড়ালে প্রমোদ ভ্রমণের উদ্দেশ্য থাকে, তবে তা জ্ঞানের পবিত্রতাকেই কেবল ক্ষুণ্ণ করে না, বরং জনগণের আমানতের খেয়ানত হিসেবেও গণ্য হয়।

​সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি উদ্যোগ দেশজুড়ে কেবল বিস্ময় নয়, বরং তীব্র ক্ষোভ ও হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। দেশের সাড়ে তিনশ সরকারি কর্মকর্তাকে ইংরেজি ভাষা শেখানোর জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানোর একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে কাজ করবে বিয়াম ফাউন্ডেশন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে দেশে প্রশিক্ষণের প্রতি কর্মকর্তাদের অনীহা থাকায় তাদের উৎসাহ দিতেই এই বিদেশ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা কি কেবল প্রমোদ ভ্রমণের উৎসাহের ওপর নির্ভরশীল? যখন শুধু বাংলাদেশ ই নয় সমগ্র বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন দেশের সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের দাম মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন সাড়ে তিনশ কর্মকর্তার ইংরেজি শিখতে বিদেশ যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত বা নৈতিক? সাধারনত আমরা জানি ​একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হওয়া মানেই তাকে মেধার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়। প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা প্রতিটি স্তরেই ইংরেজি ভাষার ওপর গভীর দখল থাকা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে লিখিত পরীক্ষায় ২০০ নম্বরের ইংরেজি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই একজন ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এরপর চাকরিতে প্রবেশের পর বুনিয়াদি প্রশিক্ষণসহ দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাদের ইংরেজি চর্চা অব্যাহত থাকে। এই প্রকল্পে যাদের অংশগ্রহণ করার কথা তারা মূলত উপ-সচিব থেকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। অর্থাৎ তারা দীর্ঘদিন প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তারা অসংখ্য আন্তর্জাতিক চুক্তি, সরকারি নথি এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের সাথে পত্রালাপ সম্পন্ন করেছেন। ক্যারিয়ারের এই পড়ন্ত বিকেলে এসে যদি তাদের নতুন করে ইংরেজি ব্যাকরণ বা কথ্য ভাষা শিখতে হয়, তবে তা তাদের পূর্ববর্তী মেধা এবং বিসিএস পরীক্ষার মানকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কোনো সচিব যদি মনে করেন তাকে ইংরেজি শিখতে বিদেশে যেতে হবে, তবে তার সেই পদে থাকার নৈতিক যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

​সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো প্রশিক্ষণের স্থান নিয়ে। ইংরেজি শেখার জন্য থাইল্যান্ডকে বেছে নেওয়া আদৌ কোনো সাধারণ যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য কি? থাইল্যান্ড কোনো ইংরেজি ভাষাভাষী দেশ নয়। বরং বৈশ্বিক মানদণ্ডে ইংরেজি ভাষায় থাইল্যান্ডের মানুষের দক্ষতা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় অনেক নিচে। এমনকি আমাদের বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ইংরেজির মান থাইল্যান্ডের চেয়ে বহুগুণ উন্নত। আমাদের দেশের সাধারণ হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশীয় স্কুল-কলেজে পড়ে বিশ্বের নামী-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে দাপটের সাথে পড়াশোনা ও গবেষণা করছেন। যদি কর্মকর্তাদের ভাষাগত সত্যিই কোনো ঘাটতি থেকে থাকে, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার জন্য ভাষা শিক্ষার ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ সম্ভব। আর যদি একান্তই বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর প্রয়োজন হয় , তবে ব্রিটেন, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো কোনো ইংরেজিভাষী দেশে পাঠানো যেত। তা না করে থাইল্যান্ডের একটি বিশেষায়িত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি শিখতে যাওয়ার পরিকল্পনা কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং হাস্যকর। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি বিখ্যাত পর্যটন নগরী পাতায়া থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। পাতায়া বিশ্বজুড়ে কীসের জন্য বিখ্যাত, তা কারো অজানা নয়। ফলে এটি যে আসলে ইংরেজি শেখার আড়ালে একটি রিফ্রেশমেন্ট কোর্স বা আনন্দ ভ্রমণ, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

​অতীতেও আমরা এমন অদ্ভুত সফরের গল্প শুনেছি। পুকুর কাটা শিখতে, ঘাস কাটা দেখতে বা মোবাইল টয়লেট পরিচালনা শিখতে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের খবর আমাদের মাঝে হাসির খোরাক জুগিয়েছে। এমনকি ২০২০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য ১০০০ কর্মকর্তার বিদেশ সফরের প্রস্তাব এসেছিল। এই প্রশিক্ষণ সংস্কৃতি আসলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অপচয়ের এক বৈধ পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ আমলারা যখন ব্যয় সংকোচনের কথা বলেন, তখন তাদের নিজেদের এমন বিলাসিতা জনগণের সাথে এক চরম তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। ​বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ সঠিক যে, রাজনীতি এবং আমলাতন্ত্রের মধ্যে শুদ্ধাচারের ব্রত না আসা পর্যন্ত এই সংস্কৃতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় করার ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধন ও আমানতদারিতা থাকা জরুরি। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যদি দেশীয় প্রতিষ্ঠানে শিখতে লজ্জিত বোধ করেন, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি তাদের মেধায় নয়, বরং মানসিকতায়। আর সেই মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য পাতায়ার সন্নিকটে কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং প্রয়োজন কঠোর নৈতিকতার প্রশিক্ষণ। ​একটি উন্নয়নশীল দেশের আমলাতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত দেশপ্রেম ও মিতব্যয়িতা। অর্থনীতির এই নাজুক সময়ে এ ধরনের বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প দেশের ক্ষতকে আরও গভীর করবে। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই বিতর্কিত প্রকল্পটি বাতিল করা। জনগণের ট্যাক্সের টাকার প্রতিটি পয়সা যেন বিলাসিতার পরিবর্তে জনকল্যাণে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় শুদ্ধাচার। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন ঠিকই, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছতা ও যুক্তির ভিত্তিতে, প্রমোদ ভ্রমণের মোড়কে নয়।



সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৩
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের ওভারব্রীজ

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৪

বেশ অনেকদিন আগের কথা। আমি কোন এক দুর্ঘটনায় পা এ ব্যাথা পাই। হাসপাতালে ইমারজেন্সি চিকিৎসা নেই। কিন্তু সুস্থ হতে আরো অনেক দেরী। সম্ভবত চিটাগাং রোডে (নারায়ণগঞ্জ) এ রাস্তা পার হবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৈচিত্রে ভরা মহাবিশ্ব, তবে মানুষ কেন একই রকম হবে?

লিখেছেন মিশু মিলন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৩৯



এবার শেখরনগর কালীপূজার মেলায় গিয়ে সন্ধ্যার পর ভাগ্নি আর এক দাদার মেয়েকে বললাম, ‘চল, তোদের অন্য এক জীবন দেখাই।’
সরু গলি দিয়ে ওদেরকে নিয়ে গেলাম পিছনদিকে যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি দাঁড়ানো সম্ভব নয়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:১৫


ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন , তখন তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের ক্লান্ত অভিমান। একটা মুসলিম দেশ, কোটি কোটি মুসলিম মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহর সুন্নাতের পরিবর্তে রাসূলের (সা.) বিভিন্ন মতের অনুমোদন সংক্রান্ত হাদিস বাতিল হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৭



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ৪৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৪৩। পৃথিবীতে অহংকার প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে (অকল্যাণ)।কূট ষড়যন্ত্র এর আহলকে(এর সাথে সংযুক্ত সকল ব্যক্তি) পরিবেষ্ঠন করে। তবে কি এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।
ইউনূস ক্ষমতা দখল ছিল লুটের উদ্দেশ্যে। কেন শিশুদের টিকা দেয়া হয় নাই? তাদের দায়িত্ব ছিল টিকা পৌঁছে দেওয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×