রাজনৈতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য ও তাত্ত্বিক বিরোধ কোনো নতুন বিষয় নয়। একটি গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক শক্তি বা সাধারণ মানুষ একমত হতে পারেন, আবার তীব্র দ্বিমত ও প্রতিবাদও জানাতে পারেন। আর এটাই হলো গনতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা মতাদর্শের প্রতিক্রিয়া যদি যুক্তি, বিতর্ক বা রাজপথের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বদলে শারীরিক হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, পথরোধ কিংবা প্রাণনাশের হুমকি এমন কি প্রাণনাশের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তবে তা কেবল নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ওপর আক্রমণ থাকে না বরং তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, আইনের শাসনের ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে দেখা দেয়। সম্প্রতি হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পূর্বঘোষিত জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি শেষে আরেক কর্মসূচিতে অংশগ্রহনের উদ্দেশ্যে ফেরার পথে দলটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে হামলা, নেতাকর্মীদের মারধর এবং গণমাধ্যমের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাকে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই হামলায় এনসিপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ও আতংকের বিষয় হলো হামলাকারীদের রডের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে এক চোখ হারিয়েছেন জাতীয় ছাত্রশক্তির নবীগঞ্জ উপজেলা সংগঠক আলিফ চৌধুরী চোখে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মধ্যযুগীয় হামলার পক্ষে একশ্রেণির মানুষকে অবান্তর সাফাই গাইতে দেখা যাচ্ছে। তাদের দাবি, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী যেহেতু বিএনপি বা তাদের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে কড়া বা অনভিপ্রেত সমালোচনা করেছেন, তাই তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর এই হামলা নাকি একধরনের প্রাপ্য শিক্ষা । কোনো সভ্য রাষ্ট্র কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চায় এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোনো নেতার বক্তব্যের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত থাকলে তার রাজনৈতিক জবাব রাজনৈতিক ভাষাতেই দিতে হয়। কিন্তু কোনো উসকানির অজুহাতে শারীরিক হামলা চালিয়ে মানুষকে রক্তাক্ত করা কখনোই মতের সঠিক জবাব হতে পারে না।
এখানে একটি নীতিগত ও ঐতিহাসিক সত্যের মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিগত প্রায় সতেরো বছর ধরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে তাঁর দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের অজস্র নেতা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে প্রতিনিয়ত অত্যন্ত নিকৃষ্ট, অশ্রাব্য ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, তাঁর কার্যালয়ের সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার মতো অমানবিক দৃশ্য দেশবাসী দেখেছে। তৎকালীন সময়ে বিরোধী দলের ওপর যখন একের পর এক হামলা, মামলা ও নিপীড়ন চালানো হচ্ছিল, তখন আজ যারা এনসিপি নেতাদের ওপর হামলার পক্ষে জাস্টিফিকেশন দাঁড় করাচ্ছেন, তাঁদের বড় অংশকে কিন্তু তখন ফ্যাসিবাদের সেই অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। আজ যখন চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের তরুণদের রক্তে এবং সমগ্র ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ত্যাগের বিনিময়ে এক ভয়াবহ স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে নতুন গনতান্ত্রিক পথে বাংলাদেশ হাটছে, তখন সেই অর্জনকে কাজে লাগিয়ে দেশে একটি সহনশীল ও মানবিক রাজনৈতিক চর্চা তৈরি করাই ছিল সকলের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন সহ রাজনীতি অঙ্গনের অনেকেই সেই দায়িত্ব পালনে আজ ব্যর্থ। তারা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য সম্পুর্ন অর্জনকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার পায়তারায় লিপ্ত। তারা এখন নিজেদের মহাপরাক্রমশালী ভাবতে বসেছে। ক্ষমতার লোভ, প্রতিশোধের স্পৃহা ও দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের কারণে একসময়ের নির্যাতিত বা মজলুম ব্যক্তি যখন নিজে ক্ষমতা পায়, তখন সে অনেক সময় নিজেই অত্যাচারী বা জুলুমবাজ জালিমে পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা একে শোষিতের শোষক হয়ে ওঠার মনোবৃত্তি বলে অভিহিত করেছেন।
বিখ্যাত ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী পাউলো ফ্রেইরি তাঁর কালজয়ী বই " পেডাগজি অফ দ্য অপপ্রেসড " এ এই মানসিকতা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, "শোষিতের ভেতরে শোষকের প্রতিচ্ছবি এত গভীরভাবে গেঁথে যায় যে, তাদের স্বাধীনতার প্রাথমিক আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় নিজেই একজন শোষক হয়ে ওঠার ইচ্ছায় রূপ নেয়।"
নিপীড়িত ব্যক্তি যখন মুক্তির কথা ভাবে, সে প্রায়শই নিপীড়নহীন একটি সমাজের স্বপ্ন না দেখে, বরং নিপীড়নকারীর জায়গায় নিজেকে বসানোর স্বপ্ন দেখে। কারণ তার কাছে ক্ষমতা মানেই হলো অন্যকে শাসন ও শোষণ করার অধিকার।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও জুলুমের কোনো বৈধতা নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অহংকার, সীমালঙ্ঘন ও জুলুম বর্জন করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। আল-কুরআনের ইতিহাস অনুযায়ী, ইবলিশ নিজের অহংকার ও আল্লাহর আদেশ অমান্য করার কারণে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। কিন্তু সে নিজের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত না হয়ে বরং কেয়ামত পর্যন্ত সময় চেয়ে নিয়ে আদম ও তাঁর সন্তানদের জান্নাতের শান্তির জীবন থেকে বিচ্যুত করে পথভ্রষ্ট করার ষড়যুদ্ধে মেতে ওঠে। জাতীয় রাজনীতিতেও আজ ঠিক একইভাবে বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের চক্রান্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্যাতন সহ্য করে যে শক্তিগুলো আজ দেশে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দায়িত্বে রয়েছে, তারা যদি অতীতের সেই একই মানবাধিকার লঙ্ঘন , দখলদারি ও নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা হবে ইবলিসীয় অহংকার ও আত্মঘাতী প্রতিশোধের শামিল। সম্প্রতি রাজনৈতিক মহলে এবং জনমনে আরও একটি চরম আশঙ্কাজনক বিষয় দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, তা হলো বিগত সময়ে চরম নিপীড়নকারী রাজনৈতিক শক্তি নিষিদ্ধ ও কোণঠাসা আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও সুবিধাবাদী অংশগুলোর সঙ্গে বিএনপির একশ্রেণির নেতাকর্মীদের একধরনের অঘোষিত নমনীয়তা, সুবিধাবাদী বোঝাপড়া বা সমঝোতার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে । দীর্ঘ সময় ধরে যে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল, তাদের দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করার বদলে যদি নিজেদের ভেতরে জায়গা দেওয়া হয় স্বার্থের বোঝাপড়া জায়গা তৈরি করা হয়, তা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের হাজারো শহীদের রক্তের সঙ্গে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা। ফ্যাসিবাদের দোসররা ভালো করেই জানে, তরুণ ছাত্র-জনতার ঐক্যের কারণেই তাদের ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। তাই তারা এখন ছদ্মবেশে বিএনপি, জামায়াত কিংবা এনসিপির মতো ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়, যাতে কোনো এক ফাঁকে তারা নতুন রূপ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের পুনর্বাসিত করতে পারে। আর এই ঘৃণ্য খেলায় অবুঝের মতো পা দিচ্ছে বিএনপির ভেতরের একশ্রেণির সুবিধাবাদী বেপরোয়া নেতাকর্মী। সম্প্রতি হবিগঞ্জে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে এনসিপির কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে কেবল রাজনীতিবিদ নয়, গাড়িচালক থেকে শুরু করে সংবাদকর্মীদের পর্যন্ত মারধর করা হয়েছে। এমনকি পরবর্তীতে হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও এবং পুলিশ শ্রীমঙ্গলের চা-কন্যা ভাস্কর্য এলাকা ও হবিগঞ্জের মিরপুরে ব্যারিকেড দিয়ে পথরোধ করা সত্ত্বেও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় বসে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পরবর্তীতে জানা যায়, ছাত্রদলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে পিটিয়ে লাইভ ভিডিও বানিয়ে তা ফেসবুকে পোস্ট করে বীরত্ব জাহির করছে। এই উন্মাদনা সরাসরি শেখ হাসিনার শাসনামলের সেই " হেলমেট বাহিনী " কিংবা ছাত্রলীগের তাণ্ডবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। সামান্য দলীয় পদ-পদবি, এলাকার প্রভাব বা বড় নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আওয়ামী লীগের আমলে যেভাবে প্রতিপক্ষের ওপর নির্যাতন চালিয়ে ভিডিও করা হতো, আজ একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে হবিগঞ্জের ছাত্রদল ও যুবদলের কিছু নেতাকর্মীদের মাঝে।
বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ ও দায়িত্বশীল নেতাদের প্রতি আজ একটি গভীর প্রশ্ন থেকে যায় এই তথাকথিত " বীরপুরুষত্ব " বাদীদের কাছ থেকে অতীতে বিএনপির ঠিক কী লাভ করেছিল ? যখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, যখন তাঁর বাসভবনের সামনে বালুর ট্রাক রেখে " মার্চ ফর ডেমোক্রেসি " পণ্ড করে দেওয়া হয়েছিল, কিংবা বেগম জিয়াকে একের পর এক সাজানো মামলায় পুরান ঢাকার নির্জন কারাগারে পাঠানো হয়েছিল, তখন এই কথিত " বীরপুরুষরা " কোথায় ছিলেন? ২০২৩ সালের ২৮শে অক্টোবর যখন লাখ লাখ সমর্থকের সমাবেশ মাত্র কয়েক মিনিটের পুলিশি অভিযানে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বা রিজভী আহমেদের মতো প্রবীণ নেতাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো তখন তো এই মাঠপর্যায়ের উগ্র শক্তির পরাক্রম দেখা যায়নি। অথচ চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী মুক্ত পরিবেশে, যেখানে একটি সভ্য ও সহনশীল বিরোধী দল হিসেবে নতুন তরুণদের সঙ্গে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা করার কথা, সেখানে হঠাৎ করে সবাই যেন একেকজন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট হয়ে উঠছেন। বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মারামারি, এনসিপির তরুণদের পথ আটকে রক্তপাত ঘটানো এবং জেলায় জেলায় দখলদারি ও চাঁদাবাজির যে মহামারি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত বিএনপির মত একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের সার্বিক রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে তলানিতে নিয়ে ঠেকাচ্ছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সরকার পরিচালনাকালে দলীয় নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণের কারণে একপর্যায়ে তদানীন্তন বিএনপি সরকারকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল আজকের প্রেক্ষাপটে সেই ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। বর্তমানে যদি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নিজ দলের নেতাকর্মীদের এই ঔদ্ধত্য ও মাফিয়া মানসিকতা কঠোর হাতে দমন না করেন, তবে অতীতের মতো আবারও দেশের সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ এই রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি বাংলাদেশকে অতীতে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। আজ যদি হবিগঞ্জের মতো একটি জেলা শহরে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালিয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে ১৪৪ ধারা জারি করিয়ে পুরো পৌরসভাকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়, তবে সেটি কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয় না। সেখানে পদযাত্রা শেষে স্বাভাবিকভাবে একটি দলের চলে যাওয়ার কথা ছিল, অথচ অনাবশ্যকভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বালুর ট্রাক, ট্রাক্টর ও পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে পুরো শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো হলো। আর প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও এখানে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। দীর্ঘ সতেরো বছরের দলীয়করণ ও চাটুকারিতার অভিজ্ঞতা থেকে পুলিশ ও সিভিল ব্যুরোক্রেসি এখনও পুরোপুরি বের হতে পারেনি। তারা নিরপেক্ষ পেশাদারিত্ব দেখানোর বদলে এখনও সরকারের বা শক্তিশালী রাজনৈতিক শিবিরের হুকুম তামিল করতেই বেশি ব্যস্ত। ফ্যাসিবাদের পতন হলেও প্রশাসনিক স্বভাব যদি অপরিবর্তিত থাকে, তবে চব্বিশের গনঅভ্যুত্থানে ১৪০০ শহীদের আত্মত্যাগ বৃথা হয়ে যাবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার, সবার জন্য সমান অধিকার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। একজন নাগরিকের প্রধান পরিচয় তিনি দেশের নাগরিক, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শ যা ই হোক না কেন, রাষ্ট্র ও আইনের চোখে তিনি সুরক্ষা পাওয়ার সমান হকদার। তাই হবিগঞ্জে সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আলিফ চৌধুরীদের ওপর হামলার প্রতিটি সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও ক্লিপ দেখে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে আত্মপর্যালোচনা করতে হবে আমরা কি সত্যিই চব্বিশের রক্তের বিনিময়ে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, নাকি পুরোনো স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের স্থানে নতুন এক ধরনের " আওয়ামীপনা " বা মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই? মুখে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে রাজপথে ভিন্নমতের ওপর লাঠি-রড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার এই বৈপরীত্য বন্ধ করতেই হবে। মতের রাজনৈতিক জবাব একমাত্র যুক্তিতেই দেওয়া সম্ভব, কোনো ধরনের শারীরিক হামলায় নয় এই সর্বজনীন সত্যকে ধারণ করাই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
