somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোশাক শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির আন্দোলন,সংঘাতের নেপথ্যে কার স্বার্থ?

০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প শুধু দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিই নয় বরং এটি দেশেট প্রায় ৫০ লাখের অধিক শ্রমিকের পরিবারের জীবিকা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। অথচ এই শিল্পের প্রকৃত চালিকাশক্তি যেসব শ্রমিক, তাঁদের জীবনমান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আজও মালিকপক্ষের মুনাফার তুলনায় অনেক বেশি উপেক্ষিত। সম্প্রতি গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও রাজধানীর মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ নতুন করে দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান শ্রমিক অসন্তোষের এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সময় একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি এবং সেই দাবিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা এক বিষয় নয়। বরং এ দুটিকে এক করে দেখার চেষ্টা শ্রমিকদের অধিকার এবং দেশের স্বার্থ উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হবে।

বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ শ্রমিকদের দাবি, এই মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমান বাজারে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, শাকসবজি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয়ের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একজন শ্রমিকের নিজের এবং পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা প্রায়ই অসম্ভব । বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলে বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। ফলে একজন শ্রমিক মাসজুড়ে কঠোর পরিশ্রম করেও যদি পরিবারের সদস্যদের জন্য নূন্যতম খাবার, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে না পারেন, তাহলে তাঁর কাছ থেকে কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা ও মানসিক স্থিতিশীলতা আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত?

পোশাকশিল্পে মালিকপক্ষ ব্যবস্থাপক ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের বেতনের সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকের মজুরির ব্যবধানও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। একজন শ্রমিকের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা। অথচ সেই মুনাফার ন্যায্য অংশ শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে কতটা ব্যয় হচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। অতএব পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাজার মূল্যের সাথে তাল মিলিয়ে বৃদ্ধির দাবি নিয়ে আবেগের পরিবর্তে বাস্তব অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। এই দাবির পক্ষে শ্রমিকদের জীবন যাত্রার ব্যয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, কর্মঘণ্টা, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয় বরং এটি তাঁর শ্রমের স্বীকৃতি এবং ন্যায্য অধিকার।

তবে শ্রমিকদের এই যৌক্তিক দাবির আন্দোলন যখন সড়ক অবরোধ, সরকারি সম্পদে অগ্নিসংযোগ, কারখানা ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলা, কারখানায় হামলা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে উৎপাদনব্যবস্থা অচল করার দিকে এগিয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এই আন্দোলনের মধ্যে কি কোনো স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক গোষ্ঠী অনুপ্রবেশ করেছে? গত ১ নভেম্বর থেকে মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা নিছক শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের গাড়ি, পুলিশ বক্স ও কারখানার স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, মহাসড়ক অবরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ২ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দিনও সহিংসতা অব্যাহত ছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী ওই দিন ৫২৯ টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে চলে যান। ৩ নভেম্বর ও চার শতাধিক কারখানা বন্ধ থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সাধারণ শ্রমিকদের ন্যায্য ক্ষোভকে ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর আন্দোলনে অনুপ্রবেশ ও সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। ২ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও অভিযোগ করেছেন, নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন জোগানো হচ্ছে এবং কিছু শিল্পমালিকও অস্থিরতার সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা গোয়েন্দা সূত্রের দাবি একাই কারও অপরাধ প্রমাণ করে না।

এ প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান ঘটে এবং ফ্যাসিস্ট খুনি শাসক শেখ হাসিনা সপরিবারে দেশ থেকে পলায়ন করে বর্তমানে শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের একটি বড় অংশ পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে অবস্থান করছে এছাড়াও অনেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অবস্থান করছে আর একটি বিরাট অংশ দেশের বিভিন্ন স্হানে নানা জনের সহযোগিতায় আত্মগোপনে আছে। সেই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা, শ্রমজীবী মানুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকেরা অংশ নিয়েছিলেন। আন্দোলনের পর দেশের সাধারণ মানুষের দাবীর প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে দলটির নেতাকর্মীদের দেশের বাইরে অবস্থান করা অংশ ও দেশের ভিতরে আত্মগোপনে থাকা অংশ দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। সেই সাথে আগামী ডিসেম্বর পালাতক শেখ হাসিনা দেশে ফেরার যে আশ্বাস তার নেতাকর্মীদের দিয়ে আসছেন সেই আশ্বাস কে সামনে রেখেই পলাতক শেখ হাসিনার দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইবে এবং নিজেদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্নে বিএনপির ভেতরের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও এখন গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রতি কিছু বিএনপি নেতাকর্মীর অস্বাভাবিক সহানুভূতির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল পর্যবেক্ষণ ছিল, দীর্ঘ ষোলো বছর বিএনপি যখন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তখন বিরোধী শিবিরের মধ্যেও আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি অংশ ছিল কি না, তা নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। তাঁর সেই পর্যবেক্ষণ আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন তাৎপর্য বহন করছে। এরই মধ্যে গত ৩১ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জনাব মির্জা আব্বাস প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন, বিএনপির কিছু লোভী নেতাকর্মী অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। এটি নিছক বিরোধী দলের কোনো অভিযোগ নয় বরং ক্ষমতাসীন দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার নিজের দলের ভেতরের একটি সমস্যার ই প্রমান। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের পেছনে যদি বিএনপির কোনো নেতাকর্মী অর্থনৈতিক স্বার্থে সহযোগিতা নিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?

বিশেষ করে পোশাকশিল্পের মালিকানার সঙ্গে রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নাম আলোচনায় এসেছে। এসব প্রতিবেদনে বেক্সিমকো, সেপাল, এনভয়, রেনেসাঁ, হামিদ, ফেবিয়ান, তুষুকা, ওয়েল, নিপা, অ্যাক্সিস নিটওয়্যার, স্ট্যান্ডার্ড ও গিভেন্সি গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন গুলিতে অভিযোগ করা হয়েছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ এবং তাঁদের কেউ কেউ পলাতক বা কারাবন্দি। এমকি কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শ্রমিক অসন্তোষে উসকানি দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা দরকার কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকের রাজনৈতিক পরিচয় অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নাম থাকা মানেই সেই প্রতিষ্ঠান বা তার সব শ্রমিক অপরাধে জড়িত এমটি মনে করাও সঠিক হবে বলে মনে হয় না। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থায়ন বা উসকানির অভিযোগ থাকলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্হা গ্রহণ করতে হবে।

এখানে বিএনপির নেতৃত্বের দায়িত্বও অনেক বেশি।আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অপশাসনের ফলে গুম, হত্যা, হামলা, মামলা জেল -জুলুম সহ নানান নির্যাতন শিকারের পর জনগণ বিএনপির কাছে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করে। সেই দলের কোনো নেতাকর্মী যদি অর্থের বিনিময়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেন, ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য তাঁদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করেন পতিত ফ্যাসিস্টের দোসর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের পর এই অভিযোগের বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান তদন্ত ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অন্যথায় জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়বে।

চলমান শ্রমিক আন্দোলন মোকাবিলায় সরকার ও মালিকপক্ষের দায়িত্বও কম নয়। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর নতুন ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন সরকারের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকটের মধ্যে শ্রমিকদের শুধু কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। মজুরি বোর্ডকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিক প্রতিনিধি ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ আলোচনা করতে হবে। বকেয়া বেতন ও ওভারটাইম পরিশোধ, বিনা নোটিশে অন্যায় ভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ সহ শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত দাবীর নিষ্পত্তি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মালিকপক্ষকেও বুঝতে হবে কম মজুরির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো শিল্প টেকসই হতে পারে না। উৎপাদন খরচ কমানোর নামে শ্রমিকের জীবনমান সংকুচিত করা হলে তার ফল শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর পড়ে। আবার আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য আদায়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় কমানো এবং শিল্পের প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

পোশাকশিল্পে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তার ক্ষতি শুধু মালিক বা শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের রপ্তানি আদেশ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ব্যাংকিং খাত, পরিবহনব্যবস্থা, ক্ষুদ্র সরবরাহকারী এবং লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকতে পারেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটি বড় ঝুঁকি। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা যেমন দায়িত্বহীনতা, তেমনি আন্দোলনের নামে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরকে প্রশ্রয় দেওয়াও রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী।সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে যদি আগে থেকেই নভেম্বরজুড়ে সংঘাত-সহিংসতা এবং পালাতক শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার আশ্বাসকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পরিকল্পনার তথ্য থেকে থাকে, তাহলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল। শুধু ঘটনা ঘটার পর গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা যথেষ্ট নয়। কারা অর্থ দিচ্ছে, কারা উসকানি দিচ্ছে, কারা শ্রমিকদের সংগঠিত করে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের নামে নিরপরাধ শ্রমিক, শ্রমিক সংগঠনের নেতা বা কোন প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান হতে হবে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।

বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির আন্দোলনকে কোনো ভাবেই একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামিলীগের পুনর্বাসনের হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না সেই সাথে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামিলীগকে যারা পুনর্বাসনে সহযোগীতা করছে তাদের ও প্রতিহত করতে হবে আবার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অজুহাতে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারও কেড়ে নেওয়া যাবে না। শ্রমিকের ঘামেই পোশাকশিল্পের প্রবৃদ্ধি, মালিকের বিনিয়োগে শিল্পের সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্রের নীতিগত সহায়তায় এই খাতের আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। তাই এই তিন পক্ষের মধ্যে ন্যায্যতা, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। সর্বোপরি পোশাক শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নির্ধারণ করবে তথ্যভিত্তিক মজুরি বোর্ড শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র আর সহিংসতা ও নাশকতার বিচার করবে আইন। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা, বিএনপির কোনো সুবিধাবাদী নেতাকর্মী কিংবা কোনো শিল্পমালিক কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। শ্রমিকের ন্যায্য দাবিকে ব্যবহার করে যারা দেশের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা ধ্বংস করতে চায়, তাদের পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান যা ই হোক না কেন তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মালিকদের মুনাফার অংশীদার হিসেবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শ্রমিকের পেটে ক্ষুধা মনে অশান্তি রেখে শিল্পের সমৃদ্ধি কোন ভাবেই সম্ভব নয় আর দেশের অর্থনীতিকে জিম্মি করে কোনো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর রাজনীতিতে পুনর্বাসন ও ক্ষমতার স্বপ্নও বাস্তবায়িত হতে দেওয়া যায় না।


সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:০৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেকার গ্র্যাজুয়েটের ২০ হাজার, গার্মেন্টস শ্রমিকের ৩০ হাজার- অর্থনীতির এই বৈপরীত্যের জবাব কে দেবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

বেকার গ্র্যাজুয়েটের ২০ হাজার, গার্মেন্টস শ্রমিকের ৩০ হাজার- অর্থনীতির এই বৈপরীত্যের জবাব কে দেবে?

দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, সীমিত আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব- এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশে শিক্ষিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার চায়ের কাপে বিশ্বযুদ্ধ: একজন ঢাকাবাসীর একদিন

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৫


সকালে ঘুম ভেঙে চুলায় চায়ের পানি বসানোর আগে আমি কখনো ভাবিনি, এই নীল আগুনটার পেছনে আরব সাগর, আমেরিকার বন্দর আর একটা যুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা ভাবি, পৃথিবী অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করে

লিখেছেন মেহবুবা, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৪৮


তোমাকে শুধু একটিবার দেখতে বড় ইচ্ছে করে
ইচ্ছে ঘুড়ি উড়িয়ে দিলাম
বন্ধ চোখের অন্ধকারে তোমায় যেন দেখতে পেলাম
জড়িয়ে নিলে ইচ্ছে ঘুড়ি
আলতো হাতের মৃদু ঘায়ে ছিড়লো সূতো পথ হারাল
তোমার কাছে রয়ে গেল
দৃষ্টিপ্রদীপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না; কবীরা গুনাহ, জাহান্নাম ও আল্লাহর অসীম ক্ষমা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষন

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪৭

রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না; কবীরা গুনাহ, জাহান্নাম ও আল্লাহর অসীম ক্ষমা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষন

ছবি গুগল থেকে গৃহিত।

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

◆ ভূমিকা: এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আফগানিস্তানে একজন বেগম রোকেয়া কোনোদিন জন্মাবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৮


২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের চিহ্ন মুছে ফেলার এক অভিনব অভিযান শুরু হয়েছিল। শেখ হাসিনার ছবি, আওয়ামী লীগের কুশপুত্তলিকা, শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, কিছুই বাদ যায়নি। বড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×