অনেকগুলি বাড়ির মাঝে বাড়িটা। রাস্তা টা এদিকে অনেক ফাকা, তি্নটি লেন পরেই ওদের মুল আস্তানা। মুল্যবান কিছু ভিডিও টেপ নিয়ে পালিয়ে এসেছে সজীব। এতদিন সজীব এখানেই কাজ করত কিন্তু আর সম্ভব না। মানুষের এত বড় ক্ষতি সে করতে পারবেনা জেনেশুনে। তাই পালাবে এটি আগেই ঠিক করে ফেলেছিল। ওর পালানোর ব্যাপারটা এতক্ষনে হয়ত ওরা টের পেয়ে গেছে...দ্রুত এখান থেকে সরে যেতে হবে। নইলে কপালে খারাবি আছে। আচমকা ঠিক সামনে দিয়ে বেড়িয়ে গেল সেই মেরুন গাড়ি টা। এত তারাতারি টের পেয়ে গেল! একটু অবাকই হল সজীব। অনেক দিনের চেনা এই গাড়ি, ইঞ্জিনের মসৃন শব্দ আর বাঁক নেয়ার সময় টায়ারের ঘর্ষন এর শব্দটুকুও কানে এল তার। আরেকটু হলেই সামনে পড়ে গিয়েছিল, চট করে সরে এল গলির ভিতরে। জানালায় দেখা গেল সেই কাল চশমাকে। জামান সাহেব সারাক্ষন কাল ফ্রেমের চশমা পড়তেন বলে সবাই তাকে আড়ালে কাল চশমা বলে ডাকত। অফিসের প্রধান নির্বাহী এই জামান সাহেব। বড় করে শ্বাস ফেলল, শিড়দাড়া বেয়ে চিকন ঘাম নেমে গেল যেন। মেঘলা আকাশ ঠান্ডা ঠান্ডা একটা ভাব ছড়িয়ে আছে, মাঝে মাঝে উত্তরের বাতাসটা কাপন ধরিয়ে দেয়। জ্যাকেট টাকে আরো টেনে আনল গাঁয়ে। হ্যাট টা টেনে নামিয়ে আনল মুখের উপরে। দ্রুত পা চালাল সজীব এলোমেলো গলিপথে, মেইন রোডে এসেই ঢাকাগামী একটি বাসে উঠে পড়ল, বাসে ওঠার সময় খেয়াল করল উত্তরার ৯ নম্বর এর কাছাকাছি জায়গাটা। পেছনের একটি সিটে গা এলিয়ে দিল আপাতত কিছুটা নিশ্চিন্ত! ঘুম চলে এল চোখে...
যখন ঘুম ভাংল ততক্ষনে ২ ঘন্টা পেড়িয়ে গেছে । চোখ মেলে তো অবাক হওয়ার যোগাড়! এতক্ষনে মাত্র কারওয়ান বাজার আসতে পেরেছে। ঈদের এখনো বেশ কিছুদিন বাকি, ঢাকার রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষ। তিল ধারনের জায়গা নেই যেন। একদিকে ভাল হয়েছে পালিয়ে থাকার জন্য এর চেয়ে ভাল পরিবেশ আর হতে পারেনা। চিন্তা করল মনে মনে কমপক্ষে ঈদ এর ২ দিন আগে পর্যন্ত পালিয়ে থাকতে হবে। তাহলেই তাদের জারিজুরি খতম। তার উদ্দেশ্য সফল হবে। তখন এই টেপ অনেকটাই মুল্যহীন। কিন্তু কতদিন পারবে তার ঠিক নেই যে কোন সময় ওদের হাতে ধরা পরে যেতে পারে। এই আশংকা আছে। শক্ত নের্টয়ার্ক তাদের।
থাক ওসব আর ভাবতে মন চাইছেনা। পেটে যেন ইদুর দৌড়াচ্ছে দ্রুত কিছু বিড়াল ছেড়ে দিতে হবে, মানে খাবার দরকার।
স্টার কাবাবের সামনে নেমে গেল সজীব্। কাবাব আর পরটার অর্ডার দিল, খেয়ে দেয়ে যখন বের হল ততক্ষনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। পান্থপথ ধরে এগিয়ে চলেছে সজীব, মাথায় একটাই চিন্তা গা ঢাকা দিতে হবে, চোখে সতর্ক দৃষ্টি। ঢাকা ছেড়ে পালালেই মনে হয় ভাল হত। কিন্তু না ঢাকাতেই থাকা ভাল। পকেটে টেপগুলো আছে কিনা আরেকবার দেখে নিল, চিন্তা করেছে কালই ব্যাংক এর লকারে রেখে দিতে হবে টেপটি। প্রায় নির্ভেজালেই কিন্তু আতংকে কেটে গেল চারটি দিন, চার দিন তো নয় মনে হল যেন চার বছর! দূর থেকে কাউকে দেখলেই মনে হত তাকে ফলো করছে। সাথে সাথেই সতর্ক হয়ে যায় আরো। নিজেকে কেন যেন অনেক গুরুত্বপুর্ন মনে হচ্ছে সজীবের। আর মাত্র একদিন তারপরেই আর পালিয়ে থাকতে হবেনা...
অন্যদিকে কাল চশমার আস্তানাঃ
সেদিন না তার পরের দিন টের পেয়েছে তারা সজীব পালিয়েছে। পাগলের মত তারা খুজে চলেছে ছেলেটিকে। আতি পাতি করে ফেলেছে সম্ভাব্য পুরো ঢাকা। রাতের আধারে তার বাসায় হানা দিয়েও পাওয়া যায়নি হারানো ভিডিও টেপ বা অন্য কাওকে। মাষ্টার পিস টাই হাতছাড়া...! কোথাও কপিও রেখে যায়নি, ব্যাটা চাল্লু আছে। এই অফিসেই কাজ করত, ভিডিও এডিটিং আর ক্যামেরার অনেক কিছু জানা দক্ষ লোক সজীব। একটি ভিডিও টেপ নিয়ে পালিয়ে গেছে। এই ঈদ কে সামনে রেখে এটার মধ্যে অনেক টাকার ব্যবসা ছিল। মাথা খারাপ হওয়ার যোগার জামান সাহেবের। এখন কি হবে তাই ভাবছে বসে বসে। এত বছর এর ব্যবসা! প্রথম থেকেই সজীব ভাল মত নেয়নি বিষয়টা। কয়েকবার বলেও ছিল তাকে কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি কেউ। এও বলে ছিল এটা কোম্পানির ইমেজের সাথে যায়না। পরামর্শ দিয়েছিল আগে কি হয়েছে তা নয়, এখন থেকে এর থেকে বেরিয়ে এলেই তো হয়। সেদিন মুগ্ধ হয়েছিল জামান সাহেব। কিন্তু টাকা এমন জিনিস সব মুগ্ধতা কেড়ে নেয়। এমনিতে সজীব ছেলেটিকে পছন্দ করেন তিনি। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। আর মাত্র তিন ঘন্টা...
না হাল ছেড়ে দিল জামান সাহেব। বিকাল শেষ এর পথে। মোবাইল টা বেজে উঠল জামান সাহেব জানতেন এখুনি ফোন গুলো আসবে... এসে গেছে ফোন।
: টেপ কই তোমার ? আমার হাতে আজ সকালের/দুপুরের মধ্যে আসার কথা ছিল ? আজকের মধ্যে না পেলে আমার আর কিছুই করার থাকবেনা কিন্তু...। ক্ষতি যা হবার তোমারি হবে। তোমার জন্য কিন্তু আমি রিস্ক নিয়েছি, এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন অপঅর প্রান্তের বড় কর্তারা।
: আমতা আমতা করতে লাগল জামান সাহেব , সরি বস এবার হচ্ছেনা... অন্য সমস্যা হয়েছে। অন্য দু একটি কথা বলে ফোনগুলো রাখতে লাগল। কিন্তু ওপাশের মানুষগুলো যে অনেক অসন্তুষ্ট এটা স্পষ্ট বোঝা গেল। ঝিম মেরে রইল জামান সাহেব।
পরদিন সবাইকে অবাক করে সজীব হাজির হল জামান সাহেবের সামনে। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলে গেল, স্যার আমাকে ক্ষমা করেন আপনিও জানেন এই বাজে প্রোগ্রাম আমরা টেলিভিশনে দিলে মানুষের ঈদের ছুটিটাই মাটি হয়ে যেত! আর আমাদের হাউসের অনুষ্টান অবশ্যই পিক আওয়ারেই প্রচার হত প্রতিটি চ্যানেলে, এতে অনেক ভাল অনুষ্ঠান হয়ত আটকে যেত। প্লিজ় স্যার আসুন আমরা এই কাতুকাতু আর ভাড়ামি মার্কা অনুষ্ঠান না বানিয়ে ভাল অনুষ্ঠান বানাই আমরা। আমরা জানি আমরা পারবই...।
এই গল্পটি ৯ ই আগষ্ট ২০১২, দৈনিক আমার দেশের রম্য ম্যাগাজিন 'ভিমরুল' এ প্রকাশিত
ভিডিও রহস্য - সৈয়দ রাকিব ( এক খন্ডের ক্ষুদ্র গল্প )
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৯টি মন্তব্য ৫টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
বালুর নিচে সাম্রাজ্য

(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)
ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।
এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার।
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন
জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন
গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত এবং শরিয়া আইন হলো সকল পক্ষের সম্মতি বিশিষ্ট ইসলামী হুকুমতের আইন

সূরাঃ ৬ আনআম, ১১৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১৬। যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরন করে:... ...বাকিটুকু পড়ুন
গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন
মুহতারাম গোলাম আযমই প্রথম We Revolt বলেছিলেন !

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। দলটির দাবি, অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।