পহেলা বৈশাখ বাঙালীর নববর্ষ বরণের দিন। রবীঠাকুর নতুন বর্ষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। তিনি নববর্ষের প্রথম মাসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন নতুন বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে এজন্য। এখন নববর্ষ উদযাপনকেও স্বাগত জানায়, এর আগমনের অপেক্ষায় বসে থাকে গজে ওঠা নানান বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। আর এর জন্য তারা বেছে নেয় দেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বহুজাতিক কোম্পানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং লেজুড়বৃত্তির ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রত্যক্ষ মদদে এটি দেশের বৃহত্তর বাজারে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন বক্তা বাজার সৃষ্টি :
আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন বক্তা করা হতো যারা বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে নানান অবদান রাখতেন তাদেরকে। এখন পুরো পরিস্থিতিই পাল্টে গেছে। এখন সমাবর্তন বক্তা করা হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধান প্যাসকেল লেমির মতো ব্যক্তিকে। এই বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান কাজ হচ্ছে বিভিন্ন দেশে বাজার উদারীকরণের জন্য কাজ করা, বিদ্যাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কাজ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের কেনাবেঁচায় উদ্বুদ্ধ করে তোলা।এরই ফলশ্রুতিতে বিশ্ববিদ্যালয় আস্তে আস্তে তার মতাদর্শিক জায়গা থেকে সরে যাচ্ছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতাদর্শ হয়ে গেছে, বাজারের পক্ষে কাজ করা; নানান ধরণের পন্য, ডিগ্রি এবং মতাদর্শ ক্রয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের সম্মতি উৎপাদন করা। বিশ্ববিদ্যালয় তার এই কাজে পুরোপুরি সফল তা বলা যায়। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০৭ সালের একটি ঘটনায়। শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে গ্রামীণ ফোনের বিলবোর্ড স্থাপন নিয়ে আন্দোলন করেছে। ফলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তা ওঠিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। কিন্তু এখন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পুরো ক্যাম্পাস ছেয়ে গেছে বহুজাতিক কোম্পানির প্রচারণায়। এটা কিনলে ওঠা ফ্রি, আইটেম প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি নানান রকমের আয়োজন। আপনি পহেলা বৈশাখ উদযাপনের জন্য আসবেন আপনাকে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারবেন না। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মার্কেট এক্সিকউটিভরা দাড়িঁয়ে আছে আপনাকে শোনানোর জন্য, দেখানোর জন্য, আপনার মনোজগতে বসবাস করার জন্য।
আমরা সবাই ক্রেতা:
মল চত্বরে ইগলু কোম্পানির বেশ কারুকার্যময় একটি স্টল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এ যেন এন্টার্কটিকা মহাদেশের সত্যিকারের ইগলুদের বাসস্থান। এখানে দর্শকদের জন্য রাখা হয়েছে লটারির ব্যবস্থা। এই লটারির জন্য লাইন ধরে দাড়িঁয়ে আছে হাজার খানেক ক্রেতা। এদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আবার দূর থেকে আসা অনেক প্রদর্শনার্থীও আছে। লাইন মল চত্বর পেরিয়ে বাণিজ্য অনুষদের সামনে চলে গেছে। তপ্ত রোদে তারা সবাই অপেক্ষা করছে ক্রেতা হওয়ার জন্য।
পান্তা’র সেই স্বাদ কই?
পহেলা বৈশাখ সকালে জিয়া হলের মেসে পরিবেশন করা হয়েছে পান্তা-ইলিশ এবং আলু ভর্তা। সৌভাগ্যক্রমে গ্রামে বড় হওয়ার কারণে সকালের পান্তা ভাতের স্বাদটা ভালই জানা আছে। রাতের গরীর লোকজন রাতের রান্না করা ভাতে পানি দিয়ে তা সকালে খেয়ে কাজে যায়। সে পান্তা ভাতের অন্যরকম একটা স্বাদ আছে। কিন্তু আজ সকালে হলের মেসে যে পান্তা ইলিশ পরিবেশন করা হলো তাতে সত্যিকারের সেই পান্তা-ভাতের স্বাদ কই। হলে সকালে রান্না করা গরম ভাতে পানি দিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে। শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতায় উৎপাদিত কৃত্রিম পান্তা কেমন যেন গরম। এতে পানি দিলেও গ্রামের পান্তার সেই শীতল অনুভব করা যায় না।
এ কেমন গামছা?
বাংলায় গামছার একটা আলাদা ঐতিহ্য আছে। এই গামছা দিয়ে গ্রামের কৃষক, মজুর তপ্ত রোদে শরীর থেকে বের হওয়া লোনা পানি মুছতেন। ক্যাম্পাসে কয়েকজন্ তরুণকে দেখলাম গামছা মাথায় দিয়ে ঘোরাঘুরি করতে। কিন্তু তাদের মাথায় স্থান পেয়েছ গ্রামের কৃষকের কোন গামছা নয়; বাংলা লিংকের লোগো সংবলিত বড় কাপড়। এটাকেই তারা ব্যবহার করছে গামছা হিসেবে।
সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তার বাজার মতাদর্শের জায়গা থেকে সফলই বলা যায়। না হয় সবাই এমন খাই-খাই করবে কেন???????

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

